- বি। দে । শ
- জুলাই ৭, ২০২৬
ঢাকায় এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ সমাবেশে বিস্ফোরণ, আহত ৪। তারেক প্রশাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র জনসভায় বিস্ফোরণের ঘটনায় তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়াল। সোমবার রাতে ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে আয়োজিত সমাবেশ চলাকালীন আচমকাই বিস্ফোরণ ঘটে বলে অভিযোগ। ঘটনায় অন্তত ৪ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিস্ফোরণের পরই প্রশাসনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তোলে এনসিপি। দলটির দাবি, সভাস্থলের বিদ্যুৎ সংযোগ ইচ্ছাকৃত ভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে গভীর রাত পর্যন্ত সাভার মডেল থানার সামনে বিক্ষোভে সামিল হন নেতা-কর্মীরা। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার এবং প্রশাসনের ভূমিকার জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে দলের নেতারা।
২০২৪ সালের কোটা-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় এনে দিয়েছিল। সে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে গোটা জুলাই মাস জুড়ে দেশব্যাপী পদযাত্রা, জনসভা, পথসভা ও জনসংযোগ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে দলটি। তাদের দাবি, ‘জুলাই বিপ্লব’-এর মূল লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি এখনো অধরাই রয়ে গিয়েছে। সে দাবিকেই সামনে রেখে সোমবার ঢাকায় ‘জুলাই পদযাত্রা’ আয়োজন করা হয়েছিল।
সন্ধ্যায় পদযাত্রা শেষ হওয়ার পরে জনসভার আয়োজন হয়। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম-সহ শীর্ষ নেতৃত্ব। জেলা আহ্বায়ক নাবিদা তাসনিদ বক্তব্য রাখছিলেন। সে সময়েই মঞ্চের একেবারে সামনের দিকে প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তে সভাস্থল ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু হয়। উপস্থিত মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে সভাস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। হুড়োহুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম ‘প্রথম আলো’-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিস্ফোরণে আহত হন মহম্মদ শাহীন খন্দকার (৩০), মহম্মদ জসিম (২৬), মহম্মদ শাহাদাত হোসেন (৪০) এবং ইমরান হোসেন নামের ৪ ব্যক্তি। তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করে সাভারের বেসরকারি এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে আহতরা চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিস্ফোরণে ব্যবহৃত বিস্ফোরক থেকে ছিটকে আসা ধাতব টুকরোয় কয়েক জনের শরীরে গুরুতর আঘাত লাগে।
এ বিস্ফোরণকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ এনসিপি। দলের অভিযোগ, পুরো ঘটনাই সুপরিকল্পিত। দলের শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, সমাবেশ শুরু হওয়ার ঠিক আগে পরিকল্পিত ভাবে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। অন্ধকারের সুযোগ নিয়েই ককটেল বোমা ছোড়া হয়। তাঁর অভিযোগ, এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল দলের নেতৃত্ব এবং কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং জুলাই আন্দোলনের কর্মসূচিকে বানচাল করা। সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় নাহিদ লেখেন, ‘এনসিপির পদযাত্রায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ঠেকাতেই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। এ ধরনের হামলা করে জুলাই জাগরণ থামানো যাবে না।’ পরে ঘটনাস্থলে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি আরও কড়া ভাষায় বলেন, ‘আজকের এই বিস্ফোরণ ও বোমা হামলা প্রশাসনের সহযোগিতায় হয়েছে। সভা চলাকালীন কেন বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হলো, তার ব্যাখ্যা প্রশাসনকে দিতেই হবে। আমরা মনে করছি, আমাদের নেতৃত্বকে খুন করার উদ্দেশ্যেই এ হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।’
এ অভিযোগের পরেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শতাধিক নেতা-কর্মী সাভার মডেল থানার সামনে বিক্ষোভে সামিল হন। থানার সামনে দীর্ঘ সময় ধরে চলে অবস্থান ও স্লোগান। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এনসিপি স্পষ্ট জানিয়েছে, অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। জানা যাচ্ছে, বিস্ফোরণের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ। কী ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছিল, হামলার নেপথ্যে কারা রয়েছে, এটি পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক হামলা কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সংগঠন ঘটনার দায় স্বীকার করেনি। প্রশাসনের বিরুদ্ধেও এনসিপির গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো প্রতিক্রিয়াও মেলেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে এ বিস্ফোরণ বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন করে সংঘাতের মুখে ঠেলে দিল। বিস্ফোরণের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি একদিকে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক প্রচার চালাচ্ছে, অন্যদিকে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক ভাবে সরব হচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বর্তমান সরকারকে আক্রমণ করছে তাঁরা।
এনসিপির প্রচারে এখন মূলত দু-টি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমত, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকে তারা ‘স্বৈরাচারী’ বলে প্রতিষ্ঠিত করা। দ্বিতীয়ত, জুলাই আন্দোলনের দাবিগুলি বাস্তবায়িত না হওয়ায় বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধেও সমান আক্রমণ শানাচ্ছে। একই অভিযোগে সম্প্রতি মাঠে নেমেছে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামিও। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগের পতনের পরে যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। জামায়াত এবং এনসিপি— উভয়েই সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে দাবি করেছে, বর্তমান সরকারও জনরোষের মুখে পড়তে পারে, যেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার। তাঁদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে ‘পিছনের দরজা’ দিয়ে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বর্তমান প্রশাসন।
সোমবার রাতের বিস্ফোরণের পর রাজনৈতিক অভিযোগ আরও তীব্র হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, হামলার জন্য আওয়ামী লীগের বদলে সরাসরি বর্তমান প্রশাসনকেই দায়ী করেছে এনসিপি। দলের দাবি, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এমন হামলা সম্ভব নয়। অন্য দিকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কও। রবিবার বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে আইনি কোনো বাধা নেই। তিনি চাইলে দেশে ফিরে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারেন। তাঁর বক্তব্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তা হলে দলটির উপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নও বিবেচনায় আসতে পারে। বর্তমানে সেই বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে ট্রাইব্যুনালে বিচারপর্ব শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত বছর ১৭ নভেম্বর একটি মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য, আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ থাকলেও তাঁর তরফে এখনো কোনো আপিল করা হয়নি। দেশে ফিরে আদালতের নির্দেশ মেনেই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক ই-মেলে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। তাঁর দাবি, ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার জন্যই তিনি দেশে ফিরতে চান। মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, এটি কোনো নিরপেক্ষ বিচারই নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এখনো জনসমর্থন হারায়নি। ফলে, অতীতের মতোই তাঁর দল আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
❤ Support Us






