- বি। দে । শ
- জুলাই ৭, ২০২৬
শান্তি ফিরবে গাজায় ? প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা হামাসের, সিদ্ধান্তে সন্দিহান ইজরায়েল
প্রায় ৩ বছর ধরে যুদ্ধ, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী ভূখণ্ড গাজা, লক্ষ লক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষের অনিশ্চিত জীবন— এ আবহেই বড়ো পদক্ষেপের ঘোষণা করল হামাস। সোমবার, সসস্ত্র সংগঠনটি জানাল, গাজায় তাদের দীর্ঘদিনের ‘ডি ফ্যাক্টো’ বা কার্যত সরকার ভেঙে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক দায়িত্ব মার্কিন-সমর্থিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের একটি কমিটির হাতে তুলে দিতেও তারা প্রস্তুত। হামাসের দাবি, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় গৃহীত রাজনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়নের স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত।
এদিন, সাংবাদিক বৈঠকে হামাসের ‘গভর্নমেন্ট মিডিয়া অফিস’-এর প্রধান ইসমাইল আল-তাওয়াবতা জানান, সরকারের জরুরি বিষয়ক কমিটির প্রধান মহম্মদ আল-ফাররা আনুষ্ঠানিক ভাবে পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর সুপারিশেই বর্তমান প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। আল-তাওয়াবতার বক্তব্য, ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ গাজা (এনসিএজি)-র হাতে প্রশাসনিক ও সরকারি দায়িত্ব নির্বিঘ্নে তুলে দেওয়ার জন্যই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতা অনুযায়ী প্রশাসনিক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সহজ করাই এর মূল উদ্দেশ্য।’ তবে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হলেও মন্ত্রকগুলির কাজ বন্ধ হবে না। সরকারি কর্মচারীরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করবেন এবং হামাসের নিয়োগ করা কর্মীদেরও বহাল রাখা হবে।
এখানেই শেষ নয়। হামাস স্পষ্ট করে দিয়েছে, গাজার যে অংশ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব আপাতত তাদের হাতেই থাকবে। অর্থাৎ প্রশাসনিক ক্ষমতা ছাড়ার ইঙ্গিত মিললেও সামরিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ থেকে আপাতত সরে আসার কোনো ঘোষণা তারা করেনি। আর এই বিষয়টিকেই সামনে এনে হামাসের ঘোষণাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ ইজরায়েল। সে দেশের বিদেশমন্ত্রী গিডিয়ন সারের বক্তব্য, এটি বাস্তব পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করার রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। তাঁর দাবি, অস্ত্র হাতে রেখে প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা অর্থহীন। হামাস যদি নিরস্ত্র না হয়, তা হলে যে কোনো বেসামরিক সরকার কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণেই চলবে।
হামাসের পাল্টা অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি চুক্তির একাধিক শর্ত ইজরায়েলই লঙ্ঘন করেছে। চুক্তি অনুযায়ী ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও বাস্তবে উল্টোটাই ঘটেছে বলে দাবি তাদের। বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা ইজরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, ওই অঞ্চল ‘নিরাপত্তা বলয়’ হিসেবে বজায় রাখা হবে, সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। ফলে, হামাসও নিজেদের অবস্থান বদলায়নি। তাদের বক্তব্য, ইজরায়েল যত দিন গাজায় সামরিক অভিযান চালাবে, তত দিন তারা নিরস্ত্র হবে না। ফলে চুক্তির দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপ কার্যকর করা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হামাস ও ইজরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী গাজায় একটি নিরপেক্ষ, টেকনোক্র্যাট-নেতৃত্বাধীন অসামরিক প্রশাসন গঠন। যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা পুনর্গঠনের পরিকল্পনার লক্ষ্যেই ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ গাজা’ (এনসিএজি)। হামাসের সাম্প্রতিক ঘোষণা সে শান্তি-রূপরেখা বাস্তবায়নের দিকেই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
কমিটির চেয়ারম্যান আলি শা’আথ জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলেই তাঁদের ১৫ সদস্যের দল দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, একটি কার্যকর প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে একটিই কর্তৃপক্ষ, একটিই আইন, একটিই বৈধ সশস্ত্র শক্তি থাকতে হবে। যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের তৈরি ‘বোর্ড অব পিস’ অবশ্য হামাসের ঘোষণাকে স্বাগত জানাতে তাড়াহুড়ো করেনি। বোর্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা ঘোষণার বিষয়টি নথিভুক্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু মূল্যায়নের ভিত্তি হবে প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ। গাজার মানুষের প্রয়োজন মেটাতে কথার চেয়ে কাজের গুরুত্ব অনেক বেশি বলেই মত তাদের।
গাজার রাজনৈতিক ইতিহাসেও হামাসের এই সিদ্ধান্তের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচনে জয়লাভ করার পর উপত্যকায় নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে হামাস। পরের বছর, ২০০৭-এ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন ‘ফাতাহ’র বাহিনীকে পরাজিত করে তারা ওই অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়। সে সময় থেকেই কার্যত হামাসের শাসনাধীন হয়ে পড়ে উপকূলবর্তী ভূখণ্ডটি। অন্যদিকে, ইয়াসির আরাফতের প্রতিষ্ঠিত ‘ফাতাহ’-নেতৃত্বাধীন ‘ফিলস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’ (পিএলও)-র নিয়ন্ত্রণে থেকে যায় পশ্চিম তীর বা ‘ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক’। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ এখনো ওই অঞ্চল পরিচালনা করছে।
ফলে প্রায় ১৯ বছর পর গাজ়ার প্রশাসনিক ক্ষমতা ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে হামাস যে ঘোষণা করেছে, তা যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তবে একই সঙ্গে তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা এলেও হামাস এখনো নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে অবস্থান বদলায়নি। ফলে গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বাধা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এই টানাপড়েনের মধ্যেই সোমবারও নতুন করে প্রাণহানির খবর এসেছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকায় একটি আবাসনে ইজরায়েলি বিমান হামলায় এক দম্পতির মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি, খান ইউনিসে বাস্তুচ্যুতদের একটি তাবু এবং একটি গাড়িতে পৃথক হামলায় আরও ২ জন নিহত হয়েছেন। অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলেও দাবি চিকিৎসকদের। প্রথম হামলার বিষয়ে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সেখানে হামাসের সশস্ত্র কমান্ডার ফাদি আশুর দাগমাশকে লক্ষ্য করেই অভিযান চালানো হয়েছিল। তিনি নিহত হয়েছেন। তবে অন্য দুটি হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি তাঁরা।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরু থেকে গাজায় ৭০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন প্রায় ২ লক্ষ। প্রায় ২০ লক্ষ বাসিন্দার অধিকাংশই ঘরছাড়া। বহু মানুষ এখনো তাঁবু কিংবা আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলির মতে, খাদ্য, পানীয় জল, চিকিৎসা, বাসস্থানের সঙ্কট এ মুহূর্তে তীব্র। এমন পরিস্থিতিতে হামাসের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, বাস্তবে গাজার মানুষের দুর্ভোগ কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় কাটেনি। কারণ যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ, নিরস্ত্রীকরণ, সেনা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের প্রশ্নে এখনো হামাস ও তেল আভিভের অবস্থানের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গিয়েছে।
❤ Support Us






