Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুলাই ৭, ২০২৬

শ্রীলঙ্কার জেলে দাঙ্গা ! মৃত ২৭, আহত শতাধিক। তদন্তের নির্দেশ সরকারের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
শ্রীলঙ্কার জেলে দাঙ্গা ! মৃত ২৭, আহত শতাধিক। তদন্তের নির্দেশ সরকারের

শ্রীলঙ্কার পশ্চিমাঞ্চলের নেগোম্বো কারাগারে টানা দুদিনের ভয়াবহ সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৭। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন  জন কারারক্ষী এবং ২০ জন বন্দি। আহত হয়েছেন ১০০-রও বেশি বন্দি ও কারা কর্মী। তাঁদের অনেকের শরীরে গুলি, গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। অন্তত ১০ জনের জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে শ্রীলঙ্কার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির নেতৃত্বে  সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার।  

কর্তৃপক্ষের দাবিরবিবার নেগোম্বো কারাগারের দুই বন্দি গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। প্রথমে তা সীমিত পরিসরে থাকলেও সোমবার সকালে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কারা দফতরের মুখপাত্র এ.সি. গজনায়েকে জানিয়েছেনসকালেই দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ বাধে। কারা কর্মীরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলে বন্দিরা তাঁদের উপর হামলা চালায় কারাগার ভেঙে পালানোর চেষ্টা করে। সংঘর্ষের সময় বন্দিদের একাংশ কারারক্ষীদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছিল বলেও সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে। পরে কারা কর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বন্দিদের গোলাগুলি শুরু হয়। সে সংঘর্ষেই  জন কারারক্ষী  ১৯ জন বন্দির মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার সকালে আরও এক বন্দির মৃত্যু হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৭-এ পৌঁছায়। দাঙ্গার সময় প্রায় ৭০০ জন বন্দিকে নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েক জন বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। কারা দফতর জানিয়েছেপরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ধাপে ধাপে আরও বন্দিকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরের কাজ চলছে।

আহতদের প্রথমে নেগোম্বো জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে গুরুতর আহতদের একাংশকে কলম্বোর ন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেবহু আহতের শরীরে গুলির ক্ষত রয়েছে। অন্যদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতগভীর কাটা এবং গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এখনও ২৩ জন কারারক্ষী এবং ৫৪ জন বন্দি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কারাগারে সংঘর্ষ চলাকালীন সংলগ্ন মহিলা বন্দিশালার কয়েক জন বন্দি ছাদে উঠে মুক্তির দাবি জানান। পরে ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ায় কয়েক জন মহিলা বন্দিও আহত হন।

দাঙ্গার সময় কারাগারের বাইরে বন্দিদের আত্মীয়-স্বজনের ভিড় জমে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ব্যারিকেড তৈরি করে। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা দমনকারী পুলিশবিশেষ বাহিনী এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এমনকি সেনাবাহিনীবিমানবাহিনীকেও যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয় বলে জানা যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর সাঁজোয়া যান-সহ সেনা সদস্যদের কারাগারের চারপাশে অবস্থান নিতে দেখা যায়। কারা দফতরের মুখপাত্র গজনায়েকে জানিয়েছেনঘটনার নেপথ্যে কারাগারের অভ্যন্তরে মাদক পাচার চক্রের প্রভাব থাকতে পারে। তদন্তের স্বার্থে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি। তবে সরকারি সূত্রের দাবিকারাগারের অভ্যন্তরে সক্রিয় মাদক সরবরাহ চক্রকে কেন্দ্র করেই দুই বন্দি গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। মঙ্গলবার কুখ্যাত অপরাধী কাটুভেল্লেগোদা সুরেশকে উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন বুসা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণাকারাগারের অভ্যন্তরে মাদক সরবরাহ চক্রের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রই এই সংঘর্ষের অন্যতম প্রধান কারণ।

শ্রীলঙ্কার কারা বিষয়ক মন্ত্রী হর্ষণ নানায়াক্কারা সংসদে জানিয়েছেনঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। তাঁর কথায়তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে কারা প্রশাসনের কোনো গাফিলতি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী কি না। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেনকারাগারের পরিস্থিতি এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধীরা। বিরোধী সাংসদ অজিত পি. পেরেরার অভিযোগপরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলেও সরকার সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে জরুরি আলোচনার দাবি জানিয়ে সংসদের স্পিকারের কাছে আবেদন করেছে।

মঙ্গলবার নেগোম্বোর ম্যাজিস্ট্রেট শিরানি পেরেরা কারাগার পরিদর্শন করে ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত শুরু করেছেন। একই সঙ্গে শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিরাও কারাগারটি পরিদর্শন করেন। সংঘর্ষের সময় কারাগারটিতে প্রায় ১,৮০০ বন্দি ছিলেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। যদিও কারা দফতরের অন্য পরিসংখ্যান অনুযায়ীনেগোম্বো কারাগারের ধারণক্ষমতার তুলনায় সেখানে প্রায় ২,৪০০ বন্দি রাখা হয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলিতে অতিরিক্ত ভিড় অন্যতম সমস্যা হয়ে উঠেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ীরবিবার পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন কারাগারে মোট ৪১,২৫০ জন বন্দি রয়েছেন, যা মোট ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ। বিশেষজ্ঞদের মতেএই অস্বাভাবিক ভিড় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল করে দিচ্ছে এবং কারাগারের ভিতরে অপরাধচক্রের বিস্তারেও ভূমিকা রাখছে।

শ্রীলঙ্কায় এর আগেও একাধিক প্রাণঘাতী কারাগার দাঙ্গার নজির রয়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কোভিড-১৯ অতিমারির সময় একটি কারাগারে সংঘর্ষে ১১ জন বন্দির মৃত্যু এবং ১১৭ জন আহত হন। তারও আগে ২০১২ সালে কলম্বোর একটি কারাগারে দাঙ্গায় ২৭ জন নিহত হয়েছিলেন। তবে নেগোম্বোর সাম্প্রতিক এ ঘটনা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ কারাগার দাঙ্গাগুলির অন্যতম বলে মনে করা হচ্ছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!