Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুলাই ১৬, ২০২৬

অনশন ভাঙলে ‘ভুল বার্তা’ যাবে, অনড় সোনম ওয়াংচুক। ২০ জুলাই ‘সংসদ চলো’-তে যোগ দেওয়ার আহ্বান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অনশন ভাঙলে ‘ভুল বার্তা’ যাবে, অনড় সোনম ওয়াংচুক। ২০ জুলাই ‘সংসদ চলো’-তে যোগ দেওয়ার আহ্বান

শরীর ভেঙে পড়ছেওজন কমেছে প্রায় ৯ কেজিচিকিৎসকেরা ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। তবু অনশনের ১৯তম দিনেও মনোবল টলেনি। উল্টে তাঁকে অনশন ভাঙার আবেদন না জানিয়ে আন্দোলনকে আরও বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার ডাক দিলেন তিনি। অনশন ভাঙলে দেশবাসী ও সরকারের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছবে। মনে হবেজবাবদিহির কোনও প্রয়োজন নেই— প্রতিবাদীরা কিছু দিন বসে থেকে শেষ পর্যন্ত উঠে চলে যায়। তাই রাজনৈতিক নেতাসমর্থক এমনকি আদালতের পরোক্ষ হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও অনির্দিষ্টকালের অনশন থেকে সরে আসতে নারাজ সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক।

বুধবার গভীর রাতে সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেনসরকার এখনো পর্যন্ত আন্দোলনের দাবিগুলি নিয়ে সরকারের তরফে কোনো ইতিবাচক সাড়া না দেওয়ায় অনশন প্রত্যাহারের প্রশ্নই উঠছে না। বার্তায় ওয়াংচুক বলেন, ‘আমার শরীর ভাল নয়। তবে খুব খারাপও নয়। এমন অবস্থা নয় যে দুচার দিনের মধ্যেই মরে যাব। চিকিৎসা পরীক্ষাগুলির রিপোর্ট এখনো পর্যন্ত আশঙ্কাজনক নয়। দুর্বলতা রয়েছেপেশিশক্তি কমছেকিন্তু আমি এখনো লড়াই চালিয়ে যেতে পারব।’

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেনসরকারের কাছ থেকে কোনো সদর্থক সাড়া না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর অবস্থান বদলানোর প্রশ্নই নেই। ওয়াংচুক বলেছেন, গত কয়েক দিনে হাজার হাজার মানুষ তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন। বহু প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাও ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তাঁকে জোর করে খাওয়ানোর নির্দেশ চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু সে সব আবেদন তাঁর অবস্থান বদলাতে পারেনি। তবে নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ একেবারে উড়িয়ে দিতে চাননি ওয়াংচুক। তিনি জানাননিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে, তবে চিকিৎসকদের রিপোর্টে আপাতত কোনো তাৎক্ষণিক বিপদের ইঙ্গিত মেলেনি। হৃদ্‌যন্ত্র ও শরীরের মূল কার্যক্ষমতা এখনও ঠিক আছে।

অনশন প্রত্যাহারের পরিবর্তে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি নতুন আহ্বান জানিয়েছেন। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র ডাকা ২০ জুলাইয়ের চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যায় যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তিনি। ওয়াংচুকের মতেবিষয়টি সংসদের সামনে তুলে ধরাই এখন আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ। তাঁর বক্তব্য, ‘হাজার হাজার মানুষ ২০ জুলাই আসুন। আমরা একসঙ্গে এই বিষয়টি সংসদের হাতে তুলে দেব। তখনই মনে করববিষয়টি সঠিক জায়গায় পৌঁছেছে।’ ‘জাতীয় শিক্ষা নীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্কুলকলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কাছেও আবেদন জানিয়েছেন২০ জুলাইকে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার দিন’ হিসেবে পালন করতে। তাঁর মতেছাত্রছাত্রীরা ওই দিন গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক বিজ্ঞানের বাস্তব পাঠ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাবে।

অন্যদিকেওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। বুধবার ককরোচ জনতা পার্টির প্রকাশিত মেডিক্যাল বুলেটিনে বলা হয়েছেতাঁর শারীরিক অবস্থা এখন অত্যন্ত দুর্বল। গত ২৪ ঘণ্টায় তাঁর ওজন আরও ৪০০ গ্রাম কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭.১৫ কেজিতে। অনশন শুরু হওয়ার আগে তাঁর ওজন ছিল প্রায় ৬৬ কেজি। অর্থাৎ গত তিন সপ্তাহে তিনি হারিয়েছেন প্রায় ৯ কেজি ওজন। চিকিৎসকদের রিপোর্ট অনুযায়ীতাঁর রক্তচাপ ১০৫/৭৬ মিলিমিটার পারদরক্তে শর্করার মাত্রা ৮০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৭ শতাংশ। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেনতিনি এখনো সচেতন এবং মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছেন। তবে দ্রুত ওজন কমা, দীর্ঘ অনশনের কারণে তাঁকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। শুধু ওয়াংচুক ননতাঁর সঙ্গে অনশনে বসা ছাত্রনেতাদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-র ৬ জন নেতা-নেত্রী ওয়াংচুকের সঙ্গে অনশন শুরু করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিন জনকে ইতিমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নেহাইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মণীশ এবং অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আমিন এখনো অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেনতাঁদের শরীরে কিটোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছেযা দীর্ঘ উপবাসের গুরুতর ইঙ্গিত।

উদ্বেগের আঁচ লেগেছে আদালতেও। দিল্লি হাই কোর্টে দায়ের হওয়া এক জনস্বার্থ মামলায় দাবি করা হয়েছিলদীর্ঘ অনশনের জেরে তাঁর স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি হচ্ছে, সরকার পরিস্থিতির প্রতি উদাসীন। আবেদনকারী আইনজীবী আর কে সাইনি আদালতের কাছে অনুরোধ করেনওয়াংচুককে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হোকএমনকি প্রয়োজনে জোরপূর্বক পুষ্টি সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হোক। বৃহস্পতিবার, মামলার শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লি হাই কোর্টকে আশ্বাস দিয়েছেওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা প্রতিদিন সরকারি চিকিৎসকদের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রধান বিচারপতি ডি কে উপাধ্যায় ও বিচারপতি তেজস কারিয়ার বেঞ্চের সামনে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা জানানচিকিৎসকদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সব রকম চিকিৎসা হস্তক্ষেপ করা হবে।

শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘প্রতিটি জীবন মূল্যবান। চিকিৎসকদের রিপোর্ট অনুযায়ী অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’ আদালতও পর্যবেক্ষণে জানায়যে কোনও নাগরিকের জীবন রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব এবং সেই লক্ষ্যে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহল থেকেও ওয়াংচুকের প্রতি অনশন ভাঙার আহ্বান জোরদার হয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর একটি খোলা চিঠিতে তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রের কাছে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বানও জানিয়েছেন। থারুর লিখেছেন, জাতীয় স্তরের পরীক্ষাগুলিতে প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা। ওয়াংচুককে উদ্দেশ করে থারুরের আবেদন, ‘আপনি দেশের বিবেককে জাগিয়ে তুলেছেন। অনশনের উদ্দেশ্য সেটাই। আগামী দীর্ঘ পথচলার জন্য ভারত আপনার কণ্ঠস্বরকে প্রয়োজন।’

উল্লেখ্যনিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও কথিত অনিয়মের দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ১৯ দিন ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন শুরু করেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। আন্দোলনের সমর্থনে ১,৮০০-রও বেশি শিল্পীলেখকঅধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন বলেও আন্দোলনকারীদের দাবি। বিক্ষোভ শুরুর এক সপ্তাহ পর অনশনে বসেন ওয়াংচুক। প্রথম দিকে এ আন্দোলন ঘিরে সাধারণ মানুষের সাড়া তুলনামূলক কম থাকলেও গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি বদলেছে। জুলাইয়ের তীব্র গরম উপেক্ষা করে যন্তর মন্তরে প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে।

ছাত্রছাত্রীঅভিভাবকশিক্ষকশিক্ষাবিদ  সাধারণ মানুষ এসে তাঁর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছেন। প্রশ্নফাঁসের জেরে দেশ জুড়ে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের অন্যতম দেহরাদূনের রিয়া কুমারী থাপার পরিবারের সদস্যেরাও বুধবার ফোন করে অনশনরত শিক্ষাবিদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।

ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোও স্বামীর অবস্থানের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘তরুণদের হতাশাসমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভের কথা জানার পর সোনম মনে করেছেনএ লড়াইয়ের পাশে দাঁড়ানো তাঁর দায়িত্ব। তিনি চান দেশের প্রতিটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নিক।’ গীতাঞ্জলির অভিযোগপ্রশ্নফাঁস  পরীক্ষায় অনিয়মের কারণে বহু ছাত্রছাত্রী চরম হতাশায় ভুগেছেনএমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। তাই এই ইস্যুতে সরকারের নীরবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আন্দোলনকারীদের ক্ষোভও এ জায়গায়। তাঁদের অভিযোগআন্দোলন শুরুর পর প্রায় তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো প্রতিনিধি এ পর্যন্ত সরাসরি ওয়াংচুকের সঙ্গে আলোচনায় বসেননি। বিরোধী শিবির থেকে সমর্থনের বার্তা এলেও কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী বা মল্লিকার্জুন খাড়্গেকে যন্তর মন্তরের অনশনমঞ্চে দেখা যায়নি বলেও আন্দোলনকারীদের একাংশের আক্ষেপ।

এ পরিস্থিতিতে আন্দোলনের পরবর্তী লক্ষ্য এখন ২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর দিন সংসদ চলো’ কর্মসূচি। সিজেপি-র দাবিইতিমধ্যেই ১ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অনশনের ১৯তম দিনেও তাই শরীরের দুর্বলতাকে উপেক্ষা করে ওয়াংচুকের বার্তা একটাই— লড়াই এখনো শেষ হয়নি


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!