Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ১৬, ২০২৬

১৭ বছরের লড়াই শেষে বিন্ধ্য ভেদ ! ভারতের দীর্ঘতম সেচ-সুড়ঙ্গে বইবে নর্মদার জল

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
১৭ বছরের লড়াই শেষে বিন্ধ্য ভেদ ! ভারতের দীর্ঘতম সেচ-সুড়ঙ্গে বইবে নর্মদার জল

মৈকাল পাহাড়ের কন্যা নর্মদা আর সোনভদ্রের বিচ্ছেদের গল্প ভারতীয় লোককথায় বহু শতাব্দী ধরে সুপরিচিত। একই উৎস থেকে জন্ম নিয়েও দুই নদী বয়ে গিয়েছে বিপরীত দিকে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিন্ধ্য পর্বতের কঠিন শিলাপ্রাচীর। প্রাকৃতিক সে বিভাজন এ বার মানুষের হাতের প্রকৌশলে বদলে গেল। ১৭ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষাঅগণিত বাধাবিপদ  আর প্রযুক্তিগত লড়াই পেরিয়ে সম্পূর্ণ হলো ভারতের দীর্ঘতম সেচ-জল সুড়ঙ্গ। প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ভূগর্ভস্থ পথ দিয়ে আগামী দিনে নর্মদার জল পৌঁছবে সোন অববাহিকার তৃষ্ণার্ত কৃষিজমিতে।

মুহূর্তটি তাই শুধু নির্মাণকাজের সাফল্য নয়মধ্য ভারতের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এদিন, ঠিক ৩টা ৩০ মিনিটে টানেল বোরিং মেশিন আঘাত করল শেষ শিলাস্তরে। মুহূর্তের মধ্যে ফেটে গেল পাথরের দেওয়াল। উড়ল ধুলো। আর তার পরেই দেখা গেল অপর প্রান্ত থেকে আসা আলোর সরু রেখা। ৬.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উজানের সুড়ঙ্গ এসে মিশল ৫.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ভাটির সুড়ঙ্গের সঙ্গে। ১১.৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পথটি তখন একটানা জলপথ।

মধ্যপ্রদেশের স্লিমানাবাদ অঞ্চলের  দৃশ্য আবেগে ভরা। বছরের পর বছর ধরে একই প্রকল্পে কাজ করলেও অনেক প্রকৌশলী ও শ্রমিক একে অপরকে শুধুই রেডিও বার্তামানচিত্র বা পরিমাপের তথ্যের মাধ্যমে চিনতেন। প্রথম বার তাঁরা মুখোমুখি হলেন পাহাড়ের অন্তরে। সুড়ঙ্গজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো  করতালি। ধুলো-মাখা মুখে ফুটে উঠল স্বস্তির হাসি। কেউ ছুঁয়ে দেখলেন যন্ত্রকেউ স্পর্শ করলেন ভাঙা শিলাপ্রাচীর। যেন নিশ্চিত হতে চাইলেনদীর্ঘ ১৭ বছরের বিন্ধ্য ভেদের স্বপ্ন সত্যিই বাস্তব হয়েছে কি না!

বার্গি ডাইভারশন প্রকল্প’-এর এই সুড়ঙ্গকে ভারতের সেচ পরিকাঠামোর অন্যতম বৃহৎ প্রকৌশল সাফল্য বলেই মনে করা হচ্ছে। নর্মদা ও সোন উপত্যকার মধ্যে অবস্থিত বিন্ধ্য পর্বতের যে অংশটি এ প্রকল্পের পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলতার উচ্চতা আশপাশের ভূমি থেকে প্রায় ৪০ মিটার বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতেপাহাড় কেটে খোলা পথে জল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ৪ কোটি ঘনমিটারেরও বেশি মাটি ও পাথর সরাতে হতো। বিপুল ব্যয়পরিবেশগত ক্ষতি এবং উচ্চ ভূগর্ভস্থ জলস্তরের কারণে সে পথ কার্যত অসম্ভব ছিল। ফলে প্রকৌশলীদের সামনে একমাত্র পথ ছিল পাহাড়ের বুক চিরে সুড়ঙ্গ তৈরি করা।

শুনতে যত সহজবাস্তবে কাজটি তার বহু গুণ কঠিন। রাইট ব্যাঙ্ক মেন ক্যানাল’-এর ১০৪ কিলোমিটার থেকে ১১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত অংশে ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি প্রায় প্রতি কয়েক মিটার অন্তর বদলে গিয়েছে। কোথাও শক্ত মার্বেলকোথাও চুনাপাথরকোথাও ভঙ্গুর ডলোমাইটআবার কোথাও পাতলা স্লেটের স্তর। বহু জায়গায় চুনাপাথরের ক্ষয়ের ফলে তৈরি হয়েছিল বিশাল ভূগর্ভস্থ গহ্বর। প্রকৌশলীদের প্রতিটি অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গেই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সবচেয়ে বড়ো সমস্যা ছিল ভূগর্ভস্থ জলের প্রবল চাপ। অনেক সময় প্রতি মিনিটে ১৮ হাজার থেকে ২৫ হাজার লিটার জল সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সুড়ঙ্গের ছাদ ছুয়েছে জলস্তর। কোথাও সিঙ্কহোলের আশঙ্কাকোথাও বা হঠাৎ পাথর ধসে পড়ার সম্ভাবনা। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন আর অতিশয় কঠিন শিলাস্তরযা বারবার স্তব্ধ করেছে টানেল বোরিং মেশিনের দাঁত

উজানের দিকে কাজ করছিল আমেরিকার তৈরি রবিন্স টানেল বোরিং মেশিন। একাধিক বার সেটি শিলাস্তরে আটকে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ভেঙে যায়। বহুবার কাজ থেমে যায়। মেরামতির পর আবার শুরু হয় খনন। শেষ পর্যন্ত প্রকৌশলীরা বুঝতে পারেনএকদিক থেকে অগ্রসর হয়ে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। তখন ভাটির দিক থেকেও আর একটি ফ্রন্ট খোলা হয়। সেখানে মোতায়েন করা হয় জার্মানির এইচকে টানেল বোরিং মেশিন। দুই প্রান্ত থেকে দুই দল এগোতে শুরু করে। মাঝখানে ছিল প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ কঠিন শিলা। প্রকল্পের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল  দুই সুড়ঙ্গকে পাহাড়ের অভ্যন্তরে একই বিন্দুতে এনে মিলিয়ে দেওয়া। সামান্যতম ভুলও বহু বছরের শ্রমকে ব্যর্থ করে দিতে পারত। তাই প্রতিদিন অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে মাপা হয়েছে গভীরতাঢাল আর দিকনির্দেশ।

 প্রকল্পের ইতিহাস শুধুই প্রকৌশলের নয়মানুষের অধ্যবসায়েরও। যখন কাজ শুরু হয়েছিলতখন জন্ম নেওয়া শিশুরা আজ প্রাপ্তবয়স্ক। সুড়ঙ্গের মুখে প্রথম দিন কাজ শুরু করা অনেক শ্রমিক অবসর গ্রহণের বয়সের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন। কেউ কেউ বেঁচেও নেই। প্রকল্প চলাকালীন বদলেছে একাধিক ঠিকাদারবদলেছে প্রশাসনিক নেতৃত্ববদলেছে প্রযুক্তি। কিন্তু পাহাড়ের নীচে কাজ থামেনি। এবার দীর্ঘ অপেক্ষার ফল ভোগ করবেন মধ্যপ্রদেশের হাজার হাজার কৃষক। বার্গি ডাইভারশন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে জবলপুরকাটনিমাইহারসাটনারেওয়া এবং পান্না জেলার প্রায় ১,৪৫০টি গ্রাম উপকৃত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ২ লক্ষ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ পৌঁছবে। শুধুমাত্র স্লিমানাবাদ সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত এলাকার পরিমাণ প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজার হেক্টর।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশাএ জল পৌঁছলে অঞ্চলের কৃষি-অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। এক ফসলি জমি বদলে যাবে দু-তিন ফসলিতে। ডালশস্যতৈলবীজশাকসবজি ও উদ্যানচাষের সম্প্রসারণ ঘটবে। পশুপালন ও গ্রামীণ শিল্পও নতুন গতি পাবে। কৃষিকাজের অনিশ্চয়তা কমলে কাজের সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি দেওয়ার প্রবণতাও কমবে। শুধু সেচ নয়এ প্রকল্পের মাধ্যমে জবলপুর ও কাটনি শহরে পানীয় জল এবং শিল্পক্ষেত্রেও জল সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে পাহাড়ের বুকের নীচে তৈরি এই সুড়ঙ্গ ভবিষ্যতে কৃষিনগরজীবন এবং শিল্প— তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চলেছে। তবে এ প্রকল্পের যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে জল প্রবাহিত হওয়ার পর সেটিকে খাল এবং আটটি অ্যাকুয়েডাক্ট’ বা জলপ্রণালী পেরিয়ে কৃষকের জমিতে পৌঁছতে হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!