- দে । শ
- আগস্ট ১৪, ২০২৬
‘এটা আমার আর পড়ুয়াদের বিষয়, আপনারা নাক গলাচ্ছেন কেন?’ নালসার-কাণ্ডে বার কাউন্সিলকে ক্ষুব্ধ বার্তা প্রধান বিচারপতির
পড়ুয়াদের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির কথোপকথনের ঘটনায় বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া বা ‘বিসিআই’য়ের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কোথায়? নালসার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের পড়ুয়াদের আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্তি ঘিরে বিতর্কে শুক্রবার এই প্রশ্নই তুললেন শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। শুধু মৌখিক অসন্তোষ প্রকাশ নয়, ‘বিসিআই’ কিংবা কোনো রাজ্য বার কাউন্সিল যেন নালসারের পড়ুয়া বা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না করে, সে নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ লিগ্যাল স্টাডিজ় অ্যান্ড রিসার্চ’, সংক্ষেপে ‘নালসা’-র বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের স্নাতকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়ুয়াদের একাংশ আপত্তি জানিয়েছিলেন। সে আপত্তি শেষ পর্যন্ত এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, তাঁদের পেশাগত জীবনের প্রথম ধাপ—আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্তি—নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এবার বার কাউন্সিলের সে সিদ্ধান্ত ঘিরেই প্রশ্ন তুললেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৩ জুলাই। ‘নালসার’-এর ২০২৬ ব্যাচের পড়ুয়াদের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, অধ্যাপক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ই-মেল পাঠিয়ে সমাবর্তনে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানান। চারশোরও বেশি পড়ুয়া ওই প্রতিবাদপত্রে সই করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁদের বক্তব্যে সাম্প্রতিক কয়েকটি বিচারবিভাগীয় ঘটনা নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছিল। বিশেষ করে ২০ জুলাই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র নেতৃত্বে সংসদ অভিযানের সময় আন্দোলনকারীদের উপরে কথিত পুলিশি অত্যাচার সংক্রান্ত শুনানির বিষয়টি নিয়ে পড়ুয়াদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিলেন।
এরপরই, প্রধান বিচারপতিকে সমাবর্তনে আমন্ত্রণ জানানোর বিরোধিতায় প্রচারে কারা সক্রিয় ছিলেন, তা জানতে চেয়েছিল বার কাউন্সিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে রিপোর্ট চেয়েছিলেন ‘বিসিআই’য়ের চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র। অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট পড়ুয়াদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার ‘বিসিআই’য়ের তরফে এমন একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়, যা নিয়ে দেশ জুড়ে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। সেই নির্দেশিকায় দেশের সমস্ত রাজ্য বার কাউন্সিলকে জানানো হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ‘নালসার’-এর ২০২৬ সালের কোনো স্নাতককে আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্ত করা যাবে না। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন পড়ুয়ার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে কার্যত গোটা ব্যাচের আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্তির পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে যাঁরা আইনজীবী হিসাবে পেশাজীবন শুরু করার অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের সামনে আচমকাই তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
‘বিসিআই’য়ের এ সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। কয়েক জন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জন্য গোটা ব্যাচকে কেন একই শাস্তির মুখে পড়তে হবে, তা নিয়েও আপত্তি ওঠে। সমাজমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। প্রতিবাদে সরব হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপিও। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ বিসিআইয়ের সিদ্ধান্তের পরে সমাজমাধ্যমে কটাক্ষ করে লেখেন, ‘সমস্ত আইনি আরশোলা যদি একসঙ্গে জড়ো হয়, কী হবে?’ বিসিআই চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্রকে নিশানা করে তাঁর আরও মন্তব্য, ‘মনন রাজ্যসভার সাংসদপদ পাওয়ার ঋণ শোধ করছেন!’ প্রসঙ্গত, মনন বিহার থেকে নির্বাচিত বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ। বিতর্ক যত তীব্র হয়েছে, বিসিআইও তত দ্রুত নিজের অবস্থান বদল করেছে। প্রথম নির্দেশ জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানানো হয়, আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ‘নালসা’-র স্নাতকদের আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্ত হওয়ার পথে আর কোনো বাধা থাকছে না। সংশোধিত নির্দেশিকায় বিসিআইয়ের বক্তব্য, গোটা ব্যাচের ‘বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ’ পড়ুয়াই নির্দোষ। কয়েক জনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অসদাচরণের অভিযোগ থাকলেও তার জন্য গোটা ব্যাচকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।
তবে তার আগের নির্দেশিকায় অন্য সুর শোনা গিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রধান বিচারপতিকে সমাবর্তনের প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানানোর বিরোধিতায় কারা প্রচার চালিয়েছিলেন, তাঁদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পরে ১৯ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানিয়েছিল ‘বিসিআই’। অর্থাৎ, অভিযোগ খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ‘নালসার’-এর ২০২৬ সালের স্নাতকদের আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তই ছিল প্রথম অবস্থান। সে সিদ্ধান্ত অবশ্য আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ‘বিসিআই’য়ের প্রথম নির্দেশিকা প্রত্যাহার হয়ে যাওয়ার পরেও মামলা প্রত্যাহার হয়নি। বরং শুক্রবার জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি শুনানির জন্য ওঠে সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা।
শুনানির শুরু থেকেই বার কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায়, ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ ও তাঁদের মতপ্রকাশের ঘটনায় কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন হস্তক্ষেপ আদালত ভাল ভাবে দেখছে না। তাঁর মন্তব্য, ‘পড়ুয়াদের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। কেন তাঁদের আটকানো হবে?’ এর পরেই আরও কড়া ভাষায় প্রধান বিচারপতি জানান, ‘এটা আমার আর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেকার ব্যাপার। এখানে বার কাউন্সিলের ভূমিকা কী? তারা অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করেছে।’ প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যের মধ্যেই মামলার মূল প্রশ্নটি যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারেন কি না, প্রতিবাদ করার অধিকার তাঁদের রয়েছে কি না এবং সেই প্রতিবাদের জন্য তাঁদের পেশাগত ভবিষ্যৎকে কোনও ভাবে প্রভাবিত করা যায় কি না—এ প্রশ্নগুলিই সামনে চলে আসে।
শুধু ‘বিসিআই’য়ের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেও থামেনি শীর্ষ আদালত। ‘নালসার’-এর পড়ুয়া কিংবা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে ‘বিসিআই’ বা কোনো ‘রাজ্য বার কাউন্সিল’ যেন কোনোপ্রকার শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না করে, সে নির্দেশও দিয়েছে সুপ্রিম বেঞ্চ। ফলে আপাতত নালসারের পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো পেশাগত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ বন্ধ থাকল। শুনানিতে ‘বিসিআই’য়ের হয়ে সওয়াল করা আইনজীবী আদালতকে জানান, বিতর্কিত নির্দেশিকাটি ইতিমধ্যেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যে নির্দেশের ফলে স্নাতক পড়ুয়াদের আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে গিয়েছিল, তা আর কার্যকর নেই। সে বক্তব্যের পরে সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি দু-সপ্তাহ পরে ফের শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে, ‘বিসিআই’ নির্দেশিকা প্রত্যাহার করলেও ঘটনার অভিঘাত এখানেই শেষ হচ্ছে না।
❤ Support Us





