- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ১৭, ২০২৬
তারাপীঠের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন
তারাপীঠে হোটেল ‘বিদেশিনী’-তে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাত । নিহতদের প্রত্যেকেই পুণ্যার্থী বলে জানা গিয়েছে । সোমবার ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ তারাপীঠ থানার অদূরে, মন্দিরের কাছেই অবস্থিত ওই হোটেলে আগুন লাগে । ঘটনার পর হোটেলমালিক কল্যাণ পালকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে ।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে দমকলের প্রাথমিক অনুমান, শর্ট সার্কিট । তবে হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, অগ্নিনিরাপত্তার সমস্ত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বেরোনোর পথ পর্যাপ্ত ও নিরাপদ ছিল কি না — তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও প্রশাসন ।
শ্রাবণ মাসের শেষ সোমবার তারাপীঠে পুজো দিতে উত্তর ২৪ পরগনা থেকে আলিপুরদুয়ার-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে বহু পুণ্যার্থী এসেছিলেন । তাঁদের অনেকেই ওই হোটেলে ছিলেন। ভোরের দিকে অধিকাংশ আবাসিক যখন গভীর ঘুমে, তখন আচমকাই বিস্ফোরণের মতো শব্দ এবং চিৎকার-চেঁচামেচিতে তাঁদের ঘুম ভেঙে যায় ।
অনেকে কী ঘটেছে দেখতে ঘরের দরজা খুলতেই সামনে দেখতে পান আগুনের লেলিহান শিখা । আতঙ্কে তাঁরা আবার দরজা বন্ধ করে দেন। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে কারণ কয়েকটি ঘরে জানলা ছিল না । ফলে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বহু মানুষ ঘরের ভিতরেই আটকে পড়েন । বাইরে আগুন এবং ভিতরে ধোঁয়ার মধ্যে দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয় ।
আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় হোটেলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় । ফলে চারদিক অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় আবাসিকদের নিরাপদে বেরোনোর পথ খুঁজে পেতে আরও সমস্যা হয় ।
আবাসিকদের একাংশের অভিযোগ, হোটেলের পিছনের দিকে থাকা একটি বেরোনোর দরজা বন্ধ ছিল । ফলে তাঁরা সেই পথ দিয়ে বেরোতে পারেননি । তবে হোটেলমালিক কল্যাণ পাল দাবি করেছেন, পিছনের দিকে বেরোনোর দরজা ছিল । তাঁর বক্তব্য, আগুন লাগার পর কর্মীরা দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় হোটেলের ভিতর অন্ধকার হয়ে যায় । ফলে অনেক আবাসিক পিছনের দরজাটি খুঁজে পাননি ।
তাঁদের অনেকেই সামনের রিসেপশনের দিক দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করেন । কিন্তু সেই সময় রিসেপশনের দিকেই আগুন জ্বলছিল । ফলে বাইরে বেরোতে গিয়ে কয়েক জন আগুনের মধ্যে পড়ে যান এবং অনেকে ঝলসে যান । আবাসিকদের অভিযোগ, পিছনের দরজা বন্ধ ছিল কি না, সেই বিষয়টি এখন তদন্ত করে দেখছে পুলিশ ।
পুলিশ ও দমকলের যৌথ তৎপরতায় হোটেল থেকে মোট ২২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে । তাঁদের মধ্যে ন’জনকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করেন দমকলকর্মীরা । আহত ও অসুস্থদের রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ।
অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে । এখনও দু’জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগে বীরভূমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নীলেশ শ্রীকান্ত গায়কোয়াড় জানিয়েছিলেন, ১২ থেকে ১৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল । তাঁদের কাছ থেকেও ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে ।
অগ্নিকাণ্ডে এখনও পর্যন্ত সাত জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে । মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়াও চলছে ।
দমকলের ওসি নীলাদ্রি মজুমদার জানিয়েছেন, আগুন মূলত হোটেলের একতলা ও দোতলায় ছড়িয়েছিল । তিনতলায় সরাসরি আগুন না থাকলেও সেখানে প্রচুর ধোঁয়া জমে যায় । পাঁচতলা পর্যন্ত ধোঁয়া পৌঁছে গিয়েছিল বলে আবাসিকদের দাবি ।
দমকল আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, হোটেলে প্রয়োজনীয় দু’টি সিঁড়ি এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল । কিন্তু সিঁড়ির জানলা এবং অন্যান্য জায়গার জানলা বন্ধ থাকায় ধোঁয়া বাইরে বেরোতে পারেনি । ফলে ধোঁয়ায় বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন ।
হোটেলমালিক কল্যাণ পালের দাবি, ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ বিদ্যুৎ সরবরাহের এনসিবি হঠাৎ ফেটে যায় এবং সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত । রাতপাহারার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন । তাঁর দাবি, তত ক্ষণে হোটেলের ফাইবারের অন্দরসজ্জায় আগুন ধরে যাওয়ায় তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে । বাইরে বৃষ্টি থাকায় উদ্ধারকাজেও কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে ।
এই ভয়াবহ ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কোচবিহারের দিনহাটা থেকে তারাপীঠে পুজো দিতে আসা দেবাদৃতা দত্ত । তিনি হোটেলের দোতলায় ছিলেন । তাঁর কথায়, ঘুমের মধ্যে বাইরে চিৎকার শুনে দরজা খুলতেই প্রচণ্ড আগুন ও ধোঁয়া দেখতে পান । এরপর বারান্দা দিয়ে একটি পাইপের সাহায্যে কোনও রকমে নীচে নেমে প্রাণে বাঁচেন তাঁরা ।
দেবাদৃতার বক্তব্য, হোটেলে বারান্দা না থাকলে ঘরের ভিতরেই দমবন্ধ হয়ে তাঁদের মৃত্যু হতে পারত ।
ঘটনার পর হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রামপুরহাটের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা । তাঁর দাবি, কয়েক জনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক । এত মানুষের জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি ।
তাঁর বক্তব্য, হোটেলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আদৌ যথাযথ ছিল কি না, তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন । তাঁর আশঙ্কা, যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের ‘জতুগৃহ’-এর মতো ভবন ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে ।
অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলমালিকের গ্রেফতারির পাশাপাশি তদন্তে একাধিক বিষয় সামনে এসেছে। শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ম মেনে তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল কি না, জরুরি সময়ে বেরোনোর পথগুলি কার্যকর ছিল কি না এবং পিছনের দরজা আদৌ বন্ধ ছিল কি না — সবই খতিয়ে দেখছে পুলিশ ।
একই সঙ্গে হোটেলের জানলা কেন বন্ধ ছিল, ধোঁয়া বেরোনোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না এবং আবাসিকদের জরুরি নির্গমনপথ সম্পর্কে যথাযথভাবে জানানো হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে ।
তারাপীঠের মতো পুণ্যার্থীতে ভরা এলাকায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ইতিমধ্যেই শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে । কী কারণে এত দ্রুত আগুন ছড়াল এবং নিরাপত্তার কোথায় গাফিলতি ছিল, তদন্ত শেষ হলেই তার স্পষ্ট উত্তর মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে ।
❤ Support Us







