- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬
যাদবপুরের দেওয়ালে ফের ‘হোয়াইট ওয়াশ’! কার অনুমতিতে মাঝরাতে ক্যাম্পাসে পুলিশ-পুরকর্মী ? উঠছে প্রশ্ন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। সাদা রঙের প্রলেপ দিয়ে আবারও মুছে দেওয়া হল ক্যাম্পাসের একাধিক দেওয়াললিখন ও স্লোগান। অভিযোগ, মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশ ও কলকাতা পুরসভার কর্মী পরিচয়ে কয়েক জন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকে এই ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করেন। রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ ৪ নম্বর গেট দিয়ে তাঁদের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেখা যায় বলে দাবি পড়ুয়াদের একাংশের। ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, মাঝরাতে কার অনুমতিতে পুলিশ ও পুরসভার কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করলেন? কার নির্দেশেই বা মুছে দেওয়া হলো দেওয়াললিখন?
পড়ুয়াদের একাংশের দাবি, ওই ব্যক্তিরা নিজেদের কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পুরসভার কর্মী বলে পরিচয় দেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াললিখন ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করতে পুরসভার কর্মীরা এসেছেন। তাঁদের নিরাপত্তা দিতে সঙ্গে রয়েছে পুলিশ। খবর ছড়িয়ে পড়ে হস্টেলগুলিতেও। তবে মাঝরাতে পড়ুয়ারা সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসে বেরোতে পারেননি বলে জানা যাচ্ছে। পরে দেওয়াল মুছতে আসা ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ছেড়ে চলে গেলে পড়ুয়ারা বাইরে বেরোন। তখনই তাঁদের নজরে আসে, ক্যাম্পাসের বেশ কিছু দেওয়াল সাদা রঙে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ঝাপসা হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন স্লোগান আর দেওয়াললিখন। এমনকি সোমবার লেখা কার্ল মার্ক্সের উক্তিটিও সাদা রঙের প্রলেপে ঢেকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে রেভেলিউশনারি স্টুডেন্টস ফ্রন্ট (আরএসএফ)-এর যাদবপুর ইউনিট। সংগঠনের ইউনিট সেক্রেটারি ইন্দ্রানুজ রায়ের দাবি, রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ তাঁর কাছে ক্যাম্পাসে পুলিশ ও পুরসভার কর্মীদের প্রবেশের খবর আসে। তাঁর বক্তব্য, কলকাতা পুলিশ ও কলকাতা পুরসভার লোক বলে পরিচয় দিয়ে কয়েক জন ৪ নম্বর গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিলেন। তাঁরা জানিয়েছিলেন, পুরসভার কর্মীরা দেওয়াললিখন মুছে ফেলতে এসেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ রয়েছে। ইন্দ্রানুজের আরও অভিযোগ, খবর পাওয়ার পর তিনি হস্টেলে থাকা পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সে সময় পড়ুয়াদের হস্টেল থেকে বেরোতে দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি তাঁর। তবে গভীর রাতে কর্তৃপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।
এর পরে পড়ুয়ারা যখন ক্যাম্পাসে বেরোতে পারেন, তখন তাঁরা দেখেন, একাধিক দেওয়াল ইতিমধ্যেই সাদা রঙে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। সেই দেওয়ালের ছবিও তাঁরা মাঝরাতে তুলে পাঠান ইন্দ্রানুজকে। সমাজমাধ্যমে সেসব ছবি পোস্ট করে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আইন অনুযায়ী পুলিশ দিনের বেলাতেও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকতে চাইলে উপাচার্য বা রেজিস্ট্রারের আগাম অনুমতি প্রয়োজন। তা হলে গভীর রাতে পুলিশ কী ভাবে ক্যাম্পাসে ঢুকল? কার অনুমতিতে তারা ঢুকেছিল? একই সঙ্গে পুরসভার কর্মীদের প্রবেশের বিষয়টিও স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। এ অভিযোগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সেলিমবক্স মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে মঙ্গলবার গভীর রাতে ঠিক কার অনুমতিতে পুলিশ ও পুরসভার কর্মীরা ক্যাম্পাসে ঢুকেছিলেন, কার নির্দেশেই দেওয়াললিখন মুছে ফেলা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
যাদবপুরে দেওয়াললিখন মুছে ফেলার ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশের পর রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসের একাধিক দেওয়াল থেকে ছাত্রছাত্রীদের লেখা স্লোগান সাদা রঙের প্রলেপ দিয়ে মুছে দিয়েছিল। সে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই ফের দেওয়ালে ফিরে আসে রাজনৈতিক স্লোগান। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে লেখা হয়েছিল কার্ল মার্ক্সের একটি উক্তি— ‘আমাদের সময় যখন আসবে তখন আমরা বৈপ্লবিক শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করব না।’ পরে এসএফআইয়ের তরফেও দেওয়াললিখন কর্মসূচি নেওয়া হয়। ফলে ফের বিভিন্ন স্লোগান ও রাজনৈতিক বক্তব্যে ভরে ওঠে ক্যাম্পাসের দেওয়াল। তার পরের রাতেই আবার দেওয়াল ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করার অভিযোগ সামনে এল। অর্থাৎ, কয়েক দিনের ব্যবধানেই দ্বিতীয় বার সাদা রঙে ঢেকে দেওয়া হল যাদবপুরের দেওয়াললিখন। এক দিকে দেওয়াললিখন ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর, অন্যদিকে মতপ্রকাশের অধিকার— দুইয়ের টানাপড়েনে ফের উত্তপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর।
ঘটনাচক্রে মঙ্গলবার সকালেই দেওয়াললিখন, গ্রাফিতি এবং পোস্টার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পক্ষের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছিলেন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা এবং মর্যাদা বজায় রাখার জন্য পড়ুয়া, শিক্ষক, গবেষক, আধিকারিক এবং কর্মীদের কাছে আবেদন জানান তিনি। একই সঙ্গে যাদবপুরের দীর্ঘদিনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ঐতিহ্যের কথাও উল্লেখ করেন উপাচার্য। তাঁর বক্তব্য, তিনি যত্রতত্র দেওয়াললিখনের পক্ষে নন। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও যাতে খর্ব না হয়, সে দিকে নজর রাখা হবে। সে কারণেই ক্যাম্পাসের কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করে সেখানে দেওয়াললিখন ও গ্রাফিতির সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যত্রতত্র নয়, নির্দিষ্ট জায়গাতেই রাজনৈতিক বা অন্য ধরনের বক্তব্য লেখার অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের।
তবে সে লেখার বিষয়বস্তু নিয়েও সতর্ক করেছেন উপাচার্য। তাঁর বার্তা, নির্দিষ্ট জায়গায় দেওয়াললিখন বা গ্রাফিতি করা গেলেও সেখানে উস্কানিমূলক, কুরুচিকর কিংবা জাতীয় ঐক্য ও সংহতির পরিপন্থী কোনো বক্তব্য লেখা যাবে না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুভূতি ও মর্যাদায় আঘাত করে এমন বিষয়ও এড়াতে হবে। কোনো ধরনের দেওয়াললিখনের মাধ্যমে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। ফলে পড়ুয়াদের একাংশের প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি দেওয়াললিখন মুছে ফেলার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? নিয়ে থাকলে সে সিদ্ধান্তের লিখিত নির্দেশ কোথায়? পুলিশ ও পুরসভার কর্মীদের ক্যাম্পাসে ঢোকার অনুমতি কে দিয়েছিলেন? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন ছিল কি না? আর যদি অনুমতি না থাকে, তা হলে রাতের অন্ধকারে তাঁরা কী ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করলেন?
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর না মেলা পর্যন্ত বিতর্ক থামার সম্ভাবনা কম। কারণ, যাদবপুরে দেওয়াল শুধু দেওয়াল নয়— দীর্ঘদিন ধরেই তা রাজনৈতিক বক্তব্য, ছাত্র আন্দোলন এবং মতপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। সে দেওয়ালকে ঘিরেই এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবি। যাদবপুরে দেওয়াললিখন নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত কয়েক দিন আগের সংঘর্ষকে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপি এবং বাম ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের পর থেকেই ক্যাম্পাসের দেওয়াললিখন নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র হয়। বিজেপি এবং এবিভিপির তরফে অভিযোগ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেওয়ালে ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান লেখা হয়েছে। এর পরেই রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ‘বিতর্কিত’ দেওয়াললিখনগুলি চুনকাম করে মুছে ফেলা হয়। কিন্তু সে পদক্ষেপের পরেই ফের দেওয়ালে লেখা শুরু করেন বাম ও অতিবাম ছাত্র সংগঠনের সদস্যেরা।
❤ Support Us







