Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

রাজ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গি, সাত দিনে পাঁচশোর বেশি আক্রান্ত, স্বচ্ছতা অভিযানে জোর মুখ্যমন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
রাজ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গি, সাত দিনে পাঁচশোর বেশি আক্রান্ত, স্বচ্ছতা অভিযানে জোর মুখ্যমন্ত্রীর

রাজ্য থেকে এখনো বিদায় নেয়নি বর্ষা। এরই মধ্যে ডেঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত সাত দিনে নতুন করে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর। ফলে চলতি বছরে রাজ্যে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজার পেরিয়ে গিয়েছে। প্রশাসনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সন্ধান মিলেছে মুর্শিদাবাদে। ফলে পুজোর আগে ডেঙ্গু মোকাবিলায় নতুন করে সতর্ক হচ্ছে প্রশাসন। স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের বক্তব্য, গত ২ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধের জন্য ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোটোকল’ বা ‘এসওপি’ প্রকাশের পর থেকেই নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষার পাশাপাশি ডেঙ্গির উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই বাড়তি নজরদারির জেরেই গত সাত দিনে ৫০০-র বেশি নতুন আক্রান্তের সন্ধান মিলেছে বলে স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি।

চলতি বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, এপ্রিলের পর থেকেই ধাপে ধাপে বেড়েছে আক্রান্তের সংখ্যা। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭৭০। ৩১ জুলাই তা বেড়ে দাঁড়ায় ১,৯৪৬-এ। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছয় ৩,৯৬৬-তে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সে সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজার ছাড়িয়েছে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি এ বার পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতার উপরেও জোর দিচ্ছে স্বাস্থ্য দফতর। আধিকারিকদের দাবি, চলতি বছরে যে আক্রান্তের সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা যাচাই করা এবং নির্ভরযোগ্য। কোনো আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে দেখানো হচ্ছে না। এমনকি ডেঙ্গি আক্রান্তকে ‘অজানা জ্বর’ হিসাবেও দেখানো হচ্ছে না বলে দাবি স্বাস্থ্য দফতরের।মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো রোগীর ডেঙ্গি ধরা পড়লে তা ডেঙ্গি হিসাবেই রিপোর্ট করতে হবে। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে প্রকৃত চিত্রই প্রতিফলিত হচ্ছে বলে দাবি প্রশাসনের।

জেলা-ভিত্তিক পরিসংখ্যানে উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে মুর্শিদাবাদ। চলতি বছরে এ পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৮৭০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু গত সাত দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৯৬ জন। অর্থাৎ সামগ্রিক আক্রান্তের সংখ্যা এবং সাম্প্রতিক সংক্রমণ— দুই ক্ষেত্রেই জেলার পরিস্থিতি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কলকাতা। চলতি বছরে শহরে এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৪০২। গত এক সপ্তাহে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৬২ জন। ফলে কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক এলাকায় ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪৬। মালদহে ৩৩১, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩২৪ এবং নদিয়ায় ৩১৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। নদিয়ায় গত সাত দিনে নতুন করে ৪১ জনের শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। এ ছাড়াও হুগলি, হাওড়া এবং দুই বর্ধমানের পরিস্থিতির উপরেও নজর রাখছে প্রশাসন। হুগলিতে এখনো পর্যন্ত আক্রান্ত ২৯৩ জন, হাওড়ায় ২৭৬ জন। পূর্ব বর্ধমানে ২৩৩ এবং পশ্চিম বর্ধমানে ১৪০ জন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন।

আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেই মশার আঁতুড়ঘর ধ্বংস এবং পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দিয়েছে রাজ্য সরকার। ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২২টি জেলার ১২৮টি পুরসভায় ১,৬০০-র বেশি ওয়ার্ডে চালানো হয় তিন দিনের ‘স্বচ্ছতা সংকল্প অভিযান’। পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের উদ্যোগে এই বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গির প্রতিরোধ অভিযান চালানো হয়। সমাজমাধ্যমে সে অভিযানের খতিয়ান প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ৩ দিনে রাজ্য জুড়ে ২৭,৩৭৮টি সম্ভাব্য মশার আঁতুড়ঘর চিহ্নিত করে পরিষ্কার ও স্প্রে করা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল জমা জল ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রজননস্থল থেকে মশার লার্ভা ধ্বংস করা এবং নতুন করে মশার বংশবৃদ্ধির সুযোগ বন্ধ করা। অভিযানে ৬,০৬৫টি অবরুদ্ধ নর্দমা পরিষ্কার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনা জমে থাকা ১,৬০৮টি জায়গা থেকে জঞ্জালের স্তূপ সরানো হয়েছে। রাস্তার ধারে আবর্জনা ফেলার আরও ৪,৫১১টি জায়গা পরিষ্কার করা হয়েছে।

পুর এলাকার সাধারণ নিকাশি ব্যবস্থা ও আবর্জনা পরিষ্কারের পাশাপাশি পরিবহণ দফতরের বাস ও ট্রাম ডিপো, ওয়ার্কশপ এবং গ্যারাজগুলিতেও বিশেষ সাফাই চালানো হয়। সেখানে পড়ে থাকা বাতিল যন্ত্রাংশ, পুরনো টায়ার এবং জমে থাকা জল সরানোর উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। কারণ, পরিত্যক্ত টায়ার বা বিভিন্ন সামগ্রীর মধ্যে জমে থাকা বৃষ্টির জল ডেঙ্গির মশার অন্যতম প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে।  শুধু রাস্তা বা নর্দমা পরিষ্কারের মধ্যেই এ অভিযান সীমাবদ্ধ ছিল না। বাজার-হাট থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতর এবং হাসপাতাল— সবকিছুকেই আনা হয়েছিল বিশেষ সাফাই কর্মসূচির আওতায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১,১০৬টি বাজার ও হাট, ১,৩০৪টি স্কুল ও কলেজ, ৫৪৪টি সরকারি অফিস এবং ৩১৫টি হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার করা হয়েছে। ডেঙ্গি প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ৩৫ হাজারের বেশি তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগমূলক প্রচারসামগ্রী বিলি করা হয়েছে। সরকারি কর্মীদের পাশাপাশি এই অভিযানে সামিল হয়েছিল ১১৮টি স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন। প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল, ডেঙ্গি প্রতিরোধকে শুধুমাত্র সরকারি দফতর বা পুরসভার দায়িত্বে আটকে না রেখে নাগরিকদেরও এর সঙ্গে যুক্ত করা।

বর্ষা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হলে বিভিন্ন জায়গায় জল জমে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সে জমা জলেই ডেঙ্গির প্রধান বাহক  এডিস মশার বংশবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তাই কোথাও জল জমে রয়েছে কি না, নিকাশি ব্যবস্থা ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, আবর্জনা নিয়মিত সরানো হচ্ছে কি না— এখন সে দিকেই বাড়তি নজর প্রশাসনের। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বা ওষুধের ব্যবস্থা করলেই হবে না। মশার জন্ম ও বংশবৃদ্ধি আটকানোই রোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। শহরাঞ্চলের ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত নিকাশি, জমে থাকা আবর্জনা এবং জল জমার মতো পরিস্থিতি থাকলে স্থানীয় ভাবে তৈরি হওয়া মশার আঁতুড়ঘর দ্রুত বৃহত্তর সংক্রমণের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ২০২৩ সালে রাজ্যে ব্যাপকহারে ডেঙ্গি সংক্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে কারণে এ বারও সংক্রমণ বাড়ার আগেই উৎসস্থলে আঘাত করতে চাইছে প্রশাসন। আক্রান্ত হওয়ার পরে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ ছড়ানোর সম্ভাব্য উৎসগুলিকে চিহ্নিত করে তা নির্মূল করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

৩ দিনের বিশেষ অভিযান শেষ হলেও পরিচ্ছন্নতার কাজ যেন থেমে না যায়, সে বার্তাও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, শুধু সরকারি উদ্যোগে কিছু দিনের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা চালালেই হবে না। প্রতিটি পাড়া, রাস্তা, নর্দমা আর জনবহুল এলাকার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব সাধারণ মানুষকেও নিতে হবে। সমাজমাধ্যমে অভিযানের খতিয়ান তুলে ধরে শুভেন্দু বলেন, পরিচ্ছন্ন পশ্চিমবঙ্গ গড়ার সংকল্পকে গণআন্দোলনে পরিণত করতে হবে। তাঁর কথায়, নিজেদের সুস্থ রাখতে এবং পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে এই স্বচ্ছতা অভিযানকে সর্বাত্মক জনআন্দোলনে পরিণত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষকে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এখনো অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছয়নি বলেই জানিয়েছেন তিনি।  তবে পুজোর আগে সংক্রমণের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং বর্ষা পুরোপুরি না কাটায় ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না প্রশাসন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!