- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
এক মাসে ৮৯ শিশুর মৃত্যু ! তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আসতেই মালদহ মেডিক্যাল কলেজের সুপারকে সরাল স্বাস্থ্য ভবন
একদিনে ১০ শিশুর মৃত্যু ঘিরে শুরু হয়েছিল তোলপাড়। তিন সপ্তাহেই মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল ৬০। তদন্তে নেমে বিশেষজ্ঞ দল জানাল, গোটা আগস্টে মালদহ মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ৮৯ শিশুর। রিপোর্ট হাতে আসতেই হাসপাতালের সুপার, এমএসভিপি প্রসেনজিৎ বরকে সরিয়ে দিল স্বাস্থ্য দফতর।
মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একের পর এক শিশুমৃত্যু ঘিরে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত গড়াল প্রশাসনিক পদক্ষেপে। আগস্ট মাসে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে মোট ৮৯ শিশুর। সে পরিসংখ্যান সামনে আসার পরেই হাসপাতালের সুপার, এমএসভিপি প্রসেনজিৎ বরকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। প্রত্যেকটি শিশুর মৃত্যুর কারণ পৃথক ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত আগস্টের শুরুতে। একদিনে মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর সামনে আসে। তার পরের তিন সপ্তাহে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬০টিরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। সরকারি হাসপাতালে এত অল্প সময়ে এত শিশুর মৃত্যু কী ভাবে হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য ভবন। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হয় মালদহে। গত সপ্তাহে হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন ওই দলের সদস্যরা। চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, মৃত শিশুদের চিকিৎসার বিবরণ এবং হাসপাতালের পরিষেবা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার পর তাঁরা যে পরিসংখ্যান সামনে আনেন, তা আগের হিসাবের তুলনায় আরও উদ্বেগজনক। শুধু আগস্ট মাসেই ৮৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় বিশেষজ্ঞ দল।
তবে তদন্তে এমন কোনো নির্দিষ্ট কারণের কথা বলা হয়নি, যার জন্য সমস্ত মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করা যায়। বরং একাধিক চিকিৎসাগত কারণ উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞ দলের চেয়ারম্যান চিকিৎসক প্রলয় আচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত শিশুদের অনেকের ক্ষেত্রেই অপুষ্টি, জন্মের পর শ্বাসকষ্ট, হৃদ্রোগজনিত সমস্যা, জন্ডিস এবং অত্যন্ত কম ওজন নিয়ে জন্মানোর মতো জটিলতা ছিল। অর্থাৎ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই অনেক শিশুর শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সঙ্কটজনক। সে পরিস্থিতিতে চিকিৎসার পরও তাঁদের অনেককে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে হাসপাতালের পরিষেবা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক প্রশ্নের জায়গা খুঁজে পেয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা।
তদন্তকারী দলের পর্যবেক্ষণে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কথা উঠে এসেছে। হাসপাতালের পরিকাঠামো ও পরিষেবার ক্ষেত্রেও কিছু ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে। ফলে শিশুমৃত্যুর পিছনে শুধু রোগের জটিলতা নয়, রোগী রেফার, হাসপাতালে পৌঁছনো, চিকিৎসা পরিষেবা সহ বিভিন্ন স্তরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞ দলের চেয়ারম্যান প্রলয় জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা আলাদা করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানা গিয়েছে। চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে মৃত্যুর কারণের সঙ্গে হাসপাতালের পরিষেবার কোনও যোগ ছিল কি না, তাও দেখা হচ্ছে।
এর আগে এক দিনে ১০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে অবশ্য অন্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের দাবি ছিল, ওই দিন মৃত ১০ শিশুর মধ্যে ৮ জনই অন্য সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা বেসরকারি নার্সিংহোম থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রেফার হয়ে মালদহ মেডিক্যালে এসেছিল। হাসপাতালে জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। তবু সে ব্যাখ্যায় প্রশ্ন পুরোপুরি থামেনি। কারণ, পরে বিশেষজ্ঞ দলের তদন্তে গোটা আগস্ট মাসের ৮৯টি মৃত্যুর হিসাব সামনে এসেছে। ফলে শুধু নির্দিষ্ট একটি দিনের ঘটনা নয়, হাসপাতালের সামগ্রিক শিশু চিকিৎসা পরিষেবা এবং জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয় নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
এরই মধ্যে স্বাস্থ্য ভবনের রিপোর্টের ভিত্তিতে হাসপাতালের প্রশাসনিক স্তরে বদল ঘটানো হয়েছে। সুপার প্রসেনজিৎ বরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মালদহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায় এ বিষয়ে বলেন, ‘স্বাস্থ্য ভবনের রিপোর্ট এসেছে। কিছু রদবদল হয়েছে।’ শিশুমৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে তদন্ত যেমন চলছে, তেমনই বিশেষজ্ঞ দলের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টও রাজ্য সরকারের কাছে জমা পড়ার কথা। ফলে এখন নজর সে রিপোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপে। ৮৯ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসাগত জটিলতার পাশাপাশি যে পরিকাঠামোগত এবং প্রশাসনিক ঘাটতির কথা উঠে এসেছে, তা কতটা দ্রুত মেরামত করা যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন।
❤ Support Us






