- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার, জেলায় জেলায় ‘সিএম শ্রী ইনস্টিটিউট’ : শিক্ষক দিবসে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
গত জমানায় শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘অনেক ভুল’ হয়েছে। সেসব ভুল শুধরে শিক্ষাকে ফের রাজ্যের অগ্রাধিকারের জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুধু স্কুলের পঠনপাঠন নয়, শিক্ষক নিয়োগ থেকে পরিকাঠামো, খেলাধুলা থেকে শরীরচর্চা, মোবাইলের ব্যবহার থেকে ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবোধ— শিক্ষার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানালেন তিনি।
শনিবার নিউটাউনের কনভেনশন সেন্টারে বিদ্যাসাগর শিক্ষক সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই তাঁর মন্তব্য, ‘আমরা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক ভুল করে ফেলেছি।’ সেই সঙ্গে অতীতের কিছু সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তাঁর বার্তা, হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুই ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষক দিবসের মঞ্চে প্রথমেই ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণকে স্মরণ করেন শুভেন্দু অধিকারী। শিক্ষক দিবস পালনের সঙ্গে রাধাকৃষ্ণণের জন্মদিনের যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা-ভাবনার প্রসঙ্গও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিদ্যাসাগরের নারীশিক্ষা প্রসারে ভূমিকা ও তাঁর রচনা ও সামাজিক সংস্কারের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বিদ্যাসাগরের শিক্ষা-ভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক। বিবেকানন্দের শিক্ষা-দর্শনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, শুধু পুঁথিগত শিক্ষায় আটকে থাকলে চলবে না। এমন শিক্ষার প্রয়োজন, যা পড়ুয়ার অন্তর্নিহিত শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটায়। অর্থাৎ পরীক্ষার নম্বরের বাইরে ছাত্রছাত্রীর সামগ্রিক বিকাশই হওয়া উচিত শিক্ষার লক্ষ্য—ইঙ্গিত তাঁর। শিক্ষাব্যবস্থায় খেলাধুলা ও শরীরচর্চার গুরুত্ব নিয়েও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। ব্রতচারীর মতো শরীরচর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে স্কুলে এনসিসি তুলে দিয়ে ‘জয় হিন্দ বাহিনী’ চালুর সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন। তাঁর কথায়, এনসিসি তুলে দেওয়া ‘ভীষণ ক্ষতি’। স্কুলগুলিতে ফের এনসিসি চালুর প্রয়োজন রয়েছে।
নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের উদাহরণ দিয়ে শুভেন্দু বলেন, মাধ্যমিকের ফলের নিরিখে মেদিনীপুর দীর্ঘদিন ধরে ভাল ফল করে এসেছে। ময়নার বিভিন্ন পুরনো স্কুলের পরিকাঠামোর কথাও তুলে ধরেন তিনি। বড়ো মাঠ, প্রার্থনাগৃহ, পুকুর, শান্ত পরিবেশ— এক সময় স্কুল মানেই যে সামগ্রিক শিক্ষার পরিসর ছিল, তার উদাহরণ হিসেবে সেই পরিকাঠামোর কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে স্কুলে রবীন্দ্রচর্চা, বিবেকানন্দ ও বিদ্যাসাগরের স্মৃতি, বিভিন্ন শারীরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কথাও। তাঁর অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে এই সবকিছুরই অবহেলা হয়েছে। এখন সেগুলি ফিরিয়ে আনা দরকার।
ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, স্কুলপড়ুয়াদের উপর মোবাইলের প্রভাব ‘ভয়ঙ্কর’। এই বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলেও রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গুজরাতের উদাহরণ দিয়ে শুভেন্দু বলেন, সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের মোবাইল ব্যবহারে কড়াকড়ি রয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের সংস্কার না করলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। তবে একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন তিনি। কিছু বিষয়ে রাজনীতির লোকেদের না ঢোকাই উচিত বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুধু বই-খাতা আর ক্লাসরুম নয়, স্কুলের সামগ্রিক পরিবেশ বদলের পক্ষেও সওয়াল করেন শুভেন্দু। তাঁর প্রস্তাব, প্রতিটি স্কুলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত পানীয় জল, বিদ্যুৎ, পাখা এবং ছাত্রীদের জন্য পৃথক শৌচালয় থাকা প্রয়োজন। মিড-ডে মিলের রান্নায় গ্যাস ব্যবহারের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। স্কুলে সংগীতচর্চার পরিসর তৈরির কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তবলা, সেতার, হারমোনিয়াম, খঞ্জনি, একতারার মতো বাদ্যযন্ত্র স্কুলে রাখার প্রস্তাব দেন তিনি। লাইব্রেরি এবং খেলার মাঠ সাজানোর উপরও জোর দেন। তাঁর কথায়, বিদ্যালয়ের পরিবেশ এমন হওয়া দরকার, যেখানে ঢুকলেই পড়ুয়ার মনে একটি সুস্থ ও সুন্দর আবহ তৈরি হয়। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির পরিবেশকে এ ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার উপরও এদিন জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘শিক্ষক’ শব্দটির যে সামাজিক মর্যাদা ছিল, তা অনেকটাই ক্ষুণ্ণ হয়েছে। সে মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমানোর পক্ষেও সওয়াল করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ছাত্রছাত্রীদের পড়াবেন শিক্ষক, না কি সারাদিন মিড-ডে মিলের হিসাব করবেন? সে কারণে শিক্ষাকর্মী নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। ল্যাবরেটরির জন্য কর্মী, ঘণ্টা বাজানোর কর্মী-সহ বিভিন্ন সহায়ক কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনের কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে এ দিন কার্যত রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, আগামী দিনে শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও পরীক্ষাই হবে একমাত্র বিচার্য। কোনো রকম অন্য প্রভাব থাকবে না।
মৌখিক পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর রাখার বিরোধিতা করে তিনি জানান, মৌখিকের নম্বর পাঁচের বেশি হওয়া উচিত নয়। শিক্ষক নিয়োগে সংরক্ষণ বিধি মেনেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথাও বলেন তিনি। আদালতের নির্দেশ মেনেই নিয়োগ করা হবে বলে আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে অতীতের অনিয়ম থেকেও শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। এসএসসি-র মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের উপর জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, তালিকা প্রকাশ করতে হবে। শুধু মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে নিয়োগের মতো ব্যবস্থা চলবে না।
এদিন রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামোর মানোন্নয়ন নিয়েও বড়ো ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় আপাতত দু-টি করে ‘সিএম শ্রী ইনস্টিটিউট’ তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি। ‘জওহর নবোদয় বিদ্যালয়’-এর আদলে এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে পড়ুয়া ভর্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এগুলিকে ‘মডেল স্কুল’ হিসাবেও গড়ে তোলা হবে বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, স্কুলগুলিতে থাকবে উন্নত মানের শিক্ষক, আধুনিক ডিজিটাল ল্যাবরেটরি এবং স্মার্ট বোর্ড। কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের ধাঁচে প্রতিটি জেলায় আপাতত দু’টি করে এমন প্রতিষ্ঠান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় রাজ্যকে আনার কথাও এ দিন ফের তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে আরও অর্থ আসবে, পরিকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে। এর আগে রাজ্যের স্কুলগুলির ডিজিটাল শিক্ষায় জোর এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পে অংশগ্রহণের বিষয়টিও সরকার জানিয়েছিল।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার প্রসঙ্গও এ দিন এড়াননি মুখ্যমন্ত্রী। ডিএ এবং বকেয়া পাওনা নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপড়েনের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, আদালতের বিষয়গুলি আদালতের নির্দেশ মেনেই এগোবে। সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পদক্ষেপ করার আশ্বাসও দেন তিনি। শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নে ছাত্রছাত্রীদের পাশে ‘সমগ্র শিক্ষা মিশন’-এর মাধ্যমে সহযোগিতার কথাও বলেন শুভেন্দু। সব মিলিয়ে শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলের মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। স্কুলে ফিরতে হবে শরীরচর্চা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে; ফিরিয়ে আনতে হবে শিক্ষকের মর্যাদা; আর নিয়োগে প্রতিষ্ঠা করতে হবে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তি। সে লক্ষ্যেই রাজ্যের স্কুলশিক্ষাকে নতুন করে সাজানোর দাবি করলেন তিনি।
❤ Support Us







