Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬

‘যুদ্ধ নয়’ বলছেন আমেরিকা, উপসাগরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন! হরমুজে জাহাজ কমতেই বাড়ছে তেলের দুশ্চিন্তা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘যুদ্ধ নয়’ বলছেন আমেরিকা, উপসাগরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন! হরমুজে জাহাজ কমতেই বাড়ছে তেলের দুশ্চিন্তা

একদিকে ওয়াশিংটনের দাবি— ‘যুদ্ধ’ নয়। অন্যদিকে উপসাগরের আকাশে সাইরেনক্ষেপণাস্ত্রড্রোন। ৬ মাস পেরিয়ে  মাসে পা দেওয়া আমেরিকা-ইরান সংঘাত ফের নতুন করে উত্তপ্ত। বৃহস্পতিবার ভোরে কুয়েতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সে হামলা প্রতিহত করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। একই সময়ে বাহরাইন ও জর্ডানও ইরানের হামলা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। আর এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্য, ‘আমি এটাকে যুদ্ধ বলতে চাই না।’ তাঁর দাবিএই মুহূর্তে সক্রিয় ভাবে কোনো গুলিগোলা চলাচ্ছে না। কিন্তু ভ্যান্সের এই মন্তব্যের সঙ্গেই বাস্তব পরিস্থিতির বিস্তর ফারাক স্পষ্ট। ইরান যেমন উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছেতেমনই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

বৃহস্পতিবার ভোরে কুয়েতের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শনাক্ত হওয়ার পর সাইরেন বেজে ওঠে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবিতাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলা প্রতিহত করেছে। ঘটনাটিকে নির্লজ্জ ইরানি আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে কুয়েত। ইরানের সেনাবাহিনী অবশ্য জানিয়েছেতাদের লক্ষ্য ছিল কুয়েতের আহমদ আল-জাবের বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদ। অর্থাৎ কুয়েতকে সরাসরি লক্ষ্য করা নয়মার্কিন ঘাঁটিই ছিল হামলার উদ্দেশ্য— এমনটাই তেহরানের বক্তব্য। একই সময়ে বাহরাইন ও জর্ডানও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। ফলে ইরান-আমেরিকার সংঘাত আর দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই — উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলির মাটিতেও তার আঁচ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

ইরানের দাবিআমেরিকার সাম্প্রতিক হামলার জবাবেই এই পাল্টা আক্রমণ। রবিবার হরমুজ প্রণালীর একটি দ্বীপে ইরানের রকেট লঞ্চার ধ্বংস করার দাবি করেছিল আমেরিকা। ওয়াশিংটনের অভিযোগওই লঞ্চার ব্যবহার করে হরমুজে মাইন পাতা হতে পারে। তার পর থেকেই সংঘাত ফের তীব্র হয়েছে। এরই মধ্যে, হোয়াইট হাউসে সাংবাদিক বৈঠকে ভ্যান্সকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—  সংঘাত কবে শেষ হবেনভেম্বরে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই কি যুদ্ধ থামবেকোনো নির্দিষ্ট উত্তর দেননি তিনি। ভ্যান্সের বক্তব্যসংঘাতের অবসান অনেকটাই নির্ভর করছে ইরান কবে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করবে তার উপর। যত দিন তেহরান বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাবেতত দিন ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসবে না ওয়াশিংটন— স্পষ্ট করে দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। অর্থাৎ সংঘাতের শেষ কোথায়তার উত্তর ওয়াশিংটনের কাছেও স্পষ্ট নয়। অথচ রাজনৈতিক ভাবে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের জেরে আমেরিকায় জ্বালানির দাম বেড়েছেট্রাম্প প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ছে। নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সংঘাত রিপাবলিকানদের জন্য কতটা রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠবেতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাতের কেন্দ্রে ক্রমশ উঠে আসছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহণ করা হতো। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচলে সামান্য ব্যাঘাতও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’-এর তথ্য অনুযায়ীগত সপ্তাহে হরমুজ দিয়ে মাত্র ১০২টি জাহাজ যাতায়াত করেছে। অথচ সংঘাত শুরুর আগে দিনে ১৩০টিরও বেশি জাহাজ চলাচল করত। কেপলার-এর তথ্যেও একই ছবি। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৯৫টি জাহাজ হরমুজ পার হতো, আগস্টে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৫-তে। ওয়াশিংটনের অবশ্য দাবিমার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় তেল পরিবহণ এখনো চলছে। ভ্যান্স জানিয়েছেনবুধবার প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে নিরাপদে পার করানো হয়েছে। তাঁর দাবিইরানের উপর মার্কিন চাপ এবং নৌ-তৎপরতার ফলে তেহরানের হরমুজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ক্রমশ কমছে। তবু বাজারে উদ্বেগ কাটছে না। সংঘাত ফের বাড়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯৫ ডলারের উপরে উঠে গিয়েছে। হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহণ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তার প্রভাব যে শুধু পশ্চিম এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে নাতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আশঙ্কা বাড়ছে।

হরমুজকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সামরিক তৎপরতাও বাড়ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছেইরানের বিরুদ্ধে চলমান নৌ-অবরোধে এখনো পর্যন্ত ৮৭টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ বদলে দেওয়া হয়েছে। তিনটি জাহাজকে অচল করা হয়েছে এবং আরও দুটি জাহাজে উঠে তল্লাশি চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটনের যুক্তিইরান যাতে সমুদ্রপথকে ব্যবহার করে সামরিক তৎপরতা চালাতে না পারে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা যায়তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। তেহরানের কাছে অবশ্য হরমুজ এখনো অন্যতম প্রধান কৌশলগত অস্ত্র। ফলে জলপথটি ঘিরে দুপক্ষের টানাপড়েন যত বাড়ছেততই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। শুধু সামরিক পথেই ইরানকে চাপে রাখছে না আমেরিকা। তেহরানের অর্থনৈতিক সহযোগীদের উপরও নিষেধাজ্ঞা চাপানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন। আমেরিকার জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেনইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর দাবিএর ফলে ইরানের উপর ‘সর্বোচ্চ মাত্রার চাপ’ তৈরি হবে।

এই সংঘাতের মানবিক দিকটিও ফের সামনে এসেছে। মঙ্গলবার রাতে ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কুহেস্তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিস্ফোরণে চার জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জনের বেশিঅন্য একটি হিসাবে আহতের সংখ্যা ৬৮ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের অভিযোগআমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলে আঘাত হেনেছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্টও হতাহতের কথা জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে নিহতদের শেষকৃত্য হয়। ঘটনাটি নিয়ে ভ্যান্স বলেছেনআমেরিকা বিষয়টি তদন্ত করছে। তবে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্সের দাবি, ‘মার্কিন সেনাবাহিনী কখনো সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।’ ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডস অবশ্য হুঁশিয়ারি দিয়েছেনএ মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

ইরানের ভিতরের পরিস্থিতি নিয়েও কড়া মন্তব্য করেছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। বৃহস্পতিবার ইজরায়েলি সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেনইরানের শাসন ব্যবস্থা এখন টলমল’ করছে। তাঁর দাবিএই শাসকগোষ্ঠী আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল। ফলে এরা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করছে। ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া’-রও হুমকি দিয়েছেন তিনি। তবে ইরান সাম্প্রতিক সময়ে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি বড়ো ধরনের পাল্টা হামলা চালায়নি। বরং মার্কিন মিত্র কুয়েতবাহরাইনজর্ডানসংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিকেই লক্ষ্য করছে। নেতানিয়াহুর মতে, ইরান ইজরায়েলকে ভয় পায়, তাই আঘাত করবার সাহস পাচ্ছে না।

এদিকে, যুদ্ধের আবহেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালু রাখার চেষ্টা করছে তেহরান। ইরানের শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমি জানিয়েছেনস্কুলে সশরীরে ক্লাস চালু থাকবে। নতুন শিক্ষাবর্ষ যাতে নির্বিঘ্নে শুরু করা যায়তার প্রস্তুতি চলছে।  তবে দেশের একাংশে হামলা, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি আর নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে কতটা স্বাভাবিক ভাবে শিক্ষাব্যবস্থা চালানো সম্ভব হবেতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ফেব্রুয়ারির শেষে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় শুরু হয়েছিল সংঘাত। তার পর যুদ্ধবিরতিকূটনৈতিক তৎপরতাআবার উত্তেজনা— একের পর এক পর্যায় পেরিয়ে এখন পরিস্থিতি ফের অগ্নিগর্ভ। একদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ছড়িয়ে পড়ছে উপসাগরীয় অঞ্চলে। অন্যদিকে ইরানের বন্দর ও হরমুজকে ঘিরে মার্কিন নৌ-অবরোধ আরও শক্ত হচ্ছে। এর মধ্যেই তেলের দাম বাড়ছেজাহাজ চলাচল কমছে এবং সাধারণ মানুষের উপর যুদ্ধের চাপ বাড়ছে। ভ্যান্স অবশ্য এখনও একে যুদ্ধ’ বলতে নারাজ। কিন্তু কুয়েতের আকাশে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রহরমুজে কমে যাওয়া জাহাজইরানের মাটিতে মার্কিন হামলা এবং উপসাগর জুড়ে পাল্টা আক্রমণের যে ছবি তৈরি হয়েছেতাতে সংঘাতের অভিঘাত যে ক্রমশ আরও বিস্তৃত হচ্ছে— তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কম।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!