- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
কমিশনের ‘হেফাজতে’ জোড়াফুল ! উপনির্বাচনে প্রতীকহীন দুই তৃণমূল শিবির
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে আপাতত থাকল না তৃণমূলের পরিচিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক। ২৮ বছর আগে যে প্রতীক নিজে হাতে এঁকেছিলেন মমতা, আসন্ন উপনির্বাচনের জন্য সেই প্রতীক পেল না বিক্ষুব্ধ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও। দীর্ঘ টানাপড়েন ও স্নায়ুযুদ্ধের পর বৃহস্পতিবার রাতে নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশে জানিয়ে দিল, আপাতত ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি কোনো পক্ষকেই দেওয়া হচ্ছে না। প্রতীকটি কমিশনের হেফাজতেই থাকবে।
কমিশন স্পষ্ট করেছে, এ সিদ্ধান্ত তৃণমূলের দলীয় নিয়ন্ত্রণ বা প্রতীকের মালিকানা নিয়ে চূড়ান্ত রায় নয়। দলের আসল নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, ‘আসল তৃণমূল’ কোন গোষ্ঠী, দলীয় তহবিলের অধিকার কার — সহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করে পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি কমিশনের সিন্দুকেই থাকবে।
আগামী ৬ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হওয়ার কথা। ইতিমধ্যেই দুই শিবির তাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে এবং মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমাও বুধবার শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন দুই পক্ষকেই আলাদা নাম ও আলাদা প্রতীকে নির্বাচনে লড়তে হবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, আপাতত কোনো পক্ষকেই ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটিও কোনো শিবির ব্যবহার করতে পারবে না। দুই পক্ষকে নিজেদের জন্য পৃথক নাম বেছে নিতে হবে। চাইলে সেই নামের সঙ্গে ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’-এর সঙ্গে সম্পর্কের উল্লেখ রাখা যেতে পারে। তবে ভাবে, জোড়াফুল প্রতীকও ব্যবহার করা যাবে না। উপনির্বাচনের জন্য কমিশনের সংরক্ষিত প্রতীকের তালিকা থেকে দুই শিবিরকে পৃথক পৃথক প্রতীক বেছে নিতে হবে।
১৯৯৮ সালে তৃণমূলের রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ২০২৬ সালে এসে ২৮ বছর পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে এমন ভোট হতে চলেছে, যেখানে তৃণমূলের পরিচিত জোড়াফুল প্রতীক থাকছে না। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর দলীয় নিয়ন্ত্রণ ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সঙ্গে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর সংঘাত আরও তীব্র হয়। মমতার নির্ধারিত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে সরিয়ে বিদ্রোহীরা পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করে ঋতব্রতকে সেই পদে বসায়। শুধু পরিষদীয় দলেই নয়, দলীয় সংগঠনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনার দাবি ওঠে। মমতাকে সরিয়ে নতুন জাতীয় কর্মসমিতি তৈরি করে ঋতব্রত শিবির। সেই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায়কে।
গত জুনে দলীয় ভাঙা-গড়ার এই পর্বে মমতা শিবিরের হয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তিনিও পরবর্তী সময়ে ঋতব্রতদের শিবিরে যোগ দেন। তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ এবং জোড়াফুল প্রতীকের অধিকার নিয়ে দুই শিবিরের সঙ্গে একাধিক বার বৈঠক করেছে নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার দ্বিতীয় দফায় দিল্লির নির্বাচন সদনে দুই পক্ষকে তলব করা হয়েছিল। বৈঠক শেষে ঋতব্রত শিবিরের নেতারা জানিয়েছিলেন, তাঁরা জোড়াফুল প্রতীক পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। তবে শেষ সিদ্ধান্ত যে কমিশনেরই, সেটিও তাঁরা স্পষ্ট করেছিলেন।
অন্য দিকে, কলকাতায় ঋতব্রত তৃণমূলের মুখপাত্র ঋজু দত্ত দাবি করেছিলেন, অন্তত একটি বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে আপাতত জোড়াফুল প্রতীক থাকবে না। কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশে সেই অবস্থানই কার্যত স্পষ্ট হলো। দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই টানাপড়েনের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা করে। তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, ভোটের আগে জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে অন্তত একটি অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত কমিশনকে নিতেই হবে। বৃহস্পতিবার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন সেই সিদ্ধান্তই জানিয়ে দিল। উপনির্বাচনের জন্য দুই শিবিরই ইতিমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে। রেজিনগরে কালীঘাট তৃণমূলের হয়ে লড়বেন রবিউল আলম চৌধুরী।
অন্য দিকে, রেজিনগরে ঋতব্রত শিবিরের প্রার্থী শেখ সফিউদ্দিন জামান। নন্দীগ্রামে ওই শিবিরের প্রার্থী মহম্মদ এহেতাশ মুল হক। এখন মূল প্রশ্ন, তাঁরা কোন প্রতীকে ভোটে লড়বেন এবং তাঁদের দলের নামই বা কী হবে। কমিশনের নির্দেশের পর কালীঘাট শিবিরের একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা তাৎক্ষণিক ভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে চাননি। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কুণাল ঘোষ — সকলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ বিষয়ে যা বলার, শুক্রবার দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলবেন। তবে বৃহস্পতিবার রাতে মমতার ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, নেত্রী মনে করছেন কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের ‘ষড়যন্ত্রের’ ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি অবশ্য মমতা শিবিরের বক্তব্য।
অন্যদিকে, ঋতব্রত শিবিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা আখরুজ্জামান কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁরা আশা করেছিলেন জোড়াফুল প্রতীক তাঁদের দেওয়া হবে। কিন্তু উপনির্বাচনের সময়সীমা অত্যন্ত কম হওয়ায় এবং ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করার তাড়া থাকায় কমিশন আপাতত অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে। আখরুজ্জামানের দাবি, দলের জেলা সভাপতি থেকে শুরু করে জেলা স্তরের নেতৃত্ব তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন। সেই কারণেই ভবিষ্যতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে জোড়াফুল প্রতীক তাঁদের শিবিরের হাতেই আসবে বলে তাঁরা আশাবাদী। তবে আপাতত কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে তৃণমূলের কোনো শিবিরই জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখন কমিশনের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা।
❤ Support Us






