- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ২, ২০২৬
বিক্ষোভে মুখর দিল্লি-মুম্বাই ! রাজধানীতে আটক প্রথম সারির বাম নেতৃত্ব সহ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী, সিজেপির সভায় নাসিরুদ্দিন
এক দিকে নিষেধাজ্ঞা, অন্য দিকে ব্যারিকেড। কোথাও মিছিল আটকাতে পুলিশ, কোথাও বিক্ষোভকারীদের টেনে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রিজন ভ্যানে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রতিবাদে গান্ধী জয়ন্তীর সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দিল্লির রাজপথ। যন্তরমন্তরে জমায়েতের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। কিন্তু সে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই পথে নেমেছে সিপিআই(এম), আপ, এসএফআই, ডিওয়াইএফআই, আইসা সহ ছাত্র-যুব সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
দিল্লি পুলিশ সূত্রে খবর, দিনভর বিক্ষোভ ও মিছিল ঘিরে প্রায় ১১০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, পলিটব্যুরো সদস্য বৃন্দা কারাট, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা আপ নেত্রী আতিশী, আপ সাংসদ সঞ্জয় সিং, প্রাক্তন মন্ত্রী সৌরভ ভরদ্বাজ, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য, আইসা নেত্রী নেহা বোরা সহ একাধিক নেতা-কর্মী।
শুক্রবার গান্ধী জয়ন্তীর দিনেই দিল্লিতে এ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগের তদন্ত করতে হবে এবং ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত করতে হবে। পাশাপাশি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও তোলা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের একাংশের দাবি, ‘এসআইআর’ স্থগিত রেখে আগের ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নির্বাচন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তবে কর্মসূচির আগেই দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দিয়েছিল, অনুমতি ছাড়া কোনও জমায়েত করতে দেওয়া হবে না। জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার যুক্তিতে নয়াদিল্লির একাধিক এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারার অধীনে বিধিনিষেধ জারি করা হয়। যন্তরমন্তর ও তার সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ান। ব্যারিকেড বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যাতায়াত। বন্ধ রাখা হয় ১১টি মেট্রো স্টেশনও।
সকাল থেকেই অবশ্য সেই বাধার সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়ে যায় বিক্ষোভকারীদের। আম আদমি পার্টির কর্মী-সমর্থকেরা যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। আটক করা হয় সৌরভ ভরদ্বাজকে। পরে বিক্ষোভে যোগ দেন আতিশী এবং সঞ্জয় সিং। তাঁদেরও আটক করে পুলিশ। সঞ্জয় সিংয়ের অভিযোগ, সংসদে যাওয়ার পথে তাঁকে আটক করা হয়। এর পরেই পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে ধর্নায় বসে পড়েন তিনি। বিক্ষোভকারীদের মুখে ওঠে, ‘জ্ঞানেশ কুমার গদি ছাড়ো’ স্লোগান। শুধু আপ নয়, এ দিন দিল্লির রাস্তা জুড়ে ছিল বাম ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলিরও। সংগঠনগুলির দাবি, প্রায় দু–হাজার যুবকর্মী মিছিলে অংশ নেন। এআইকেএসের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সকাল ১১টা নাগাদ শুরু হয় সেই মিছিল। পুলিশের একাধিক ব্যারিকেড অতিক্রম করে যন্তর মন্তরের দিকে এগোন তাঁরা।
মিছিলে ছিলেন ডিওয়াইএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক হিমগ্নরাজ ভট্টাচার্য, সভাপতি তথা সাংসদ এ এ রহিম, এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য, সভাপতি আদর্শ এম সাজি-সহ একাধিক নেতা। মিছিল আটকাতে পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। মিছিল থেকে আটক হন সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি। প্রিজন ভ্যান থেকে বেবি বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার গণতন্ত্রের হত্যাকারী।’ তাঁর অভিযোগ, ‘অবৈধ কাজ করা মানুষদের গ্রেফতার না করে আমাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।’ তাঁর বক্তব্য, কোনো দমন-পীড়নই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলন থামাতে পারবে না। বৃন্দা কারাটেরও অভিযোগ, দিল্লির প্রতিটি রাস্তা এ দিন কার্যত প্রতিবাদের জায়গায় পরিণত হয়েছে। বাম নেতৃত্বের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার থেকে নাগরিকদের বঞ্চিত করা যায় না। গ্রেফতার হয়েছেন আইসা নেত্রী নেহা বোরাও।
বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজমাধ্যমে সরব হন বিরোধী দলের একাধিক নেতা। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র লেখেন, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জন্য অনুমতির প্রয়োজন নেই। আইসা নেত্রী নেহা বোরার আটকের প্রসঙ্গও তুলে দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। দিনভর আটক হওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান সামনে এসেছে। দুপুরের দিকে পুলিশ সূত্রে সাতশোর বেশি আটকের কথা জানা গেলেও পরে সে সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১১০০ হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। আটক হওয়া কয়েক জনকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। বিক্ষোভের সময় কয়েক জন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন বলেও পুলিশের তরফে দাবি করা হয়েছে। ‘এসআইআর’ নিয়ে বিরোধী দলগুলির আপত্তি অবশ্য নতুন নয়। ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের। তাঁদের বক্তব্য, নাম বাদ পড়লে নাগরিকের ভোটাধিকারই কার্যত প্রশ্নের মুখে পড়বে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি আরও জোরদার করা হয়েছে।
দিল্লির পাশাপাশি অন্য রাজ্যেও আন্দোলনের কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন। শুক্রবার মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচির ডাক দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সেখানেও পুলিশের অনুমতি না থাকায় ‘জেল ভরো’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনের তরফে জানানো হয়। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ের পরে কলকাতা, বেঙ্গালুরু এবং গোয়াতেও একই ধরনের কর্মসূচি হবে। চলতি মাসের শেষে দিল্লির যন্তরমন্তরে ফের আন্দোলনে নামার কথাও জানিয়েছেন তিনি। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালানোর ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।
ফলে, মুম্বইয়ের কর্মসূচিতেও রাজনৈতিক মহলের নজর ছিল। এদিন বিকেলে শিবাজি পার্কে গিয়ে অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে দেখা করেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমর্থন জানান তিনি বলে সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে। গীতিকার জাভেদ আখতার অবশ্য শিবাজি পার্কে রাজনৈতিক জমায়েতের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অসুবিধা, ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব এবং শব্দদূষণ নিয়ে ওঠা উদ্বেগের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, নাগরিকেরা তাঁদের অধিকার ও পরিবেশ নিয়ে সরব হচ্ছেন— সেটি ইতিবাচক। ভবিষ্যতে অন্য রাজনৈতিক দলও শিবাজি পার্কে সভা করলে স্থানীয়েরা একই ভাবে প্রতিবাদ করবেন, এমন আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, দিল্লির আন্দোলনকে আরও বড়ো পরিসরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও শুরু করেছে বিরোধী শিবির। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের তরফে দেশ জুড়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়েছে। ৬ অক্টোবর বিরোধী দলের সাংসদদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দফতর অভিমুখে পদযাত্রা এবং ৮ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন জেলায় পদযাত্রা ও জেলাশাসকের দফতরের সামনে বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে বলে বিরোধী দলগুলির তরফে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, এসআইআরকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন বনাম বিরোধীদের রাজনৈতিক সংঘাত ক্রমশ রাজপথে গড়াচ্ছে। এক দিকে পুলিশের যুক্তি— অনুমতিহীন জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করা এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের দাবি— ভোটার তালিকা ও ভোটাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নে প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। শুক্রবার দিল্লির রাজপথে দু’পক্ষের সেই অবস্থানেরই মুখোমুখি সংঘাত দেখা গেল। আটক, ব্যারিকেড, মিছিল আর স্লোগানে দিনভর সরগরম রইল যন্তরমন্তর ও তার আশপাশের এলাকা।
❤ Support Us








