Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৯, ২০২৬

ধর্মীয় বৈষম্যে মহানগরের কলোনিতে পানীয় জল বন্ধের অভিযোগ, রাষ্ট্রপুঞ্জের দ্বারস্থ সাংসদ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ধর্মীয় বৈষম্যে মহানগরের কলোনিতে পানীয় জল বন্ধের অভিযোগ, রাষ্ট্রপুঞ্জের দ্বারস্থ সাংসদ

কলকাতার বুকে পানীয় জলের সঙ্কটে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। অভিযোগ, গত ২৯ জুলাই থেকে উত্তর কলকাতার জ্যোতিনগর কলোনিতে বন্ধ সরকারি পাইপলাইনের জল সরবরাহ। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। পরে বিদ্যুৎ ফিরলেও জলের সমস্যা মেটেনি। দিনের পর দিন শুকনো কলের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এ পরিস্থিতিতে জল সরবরাহ বন্ধ থাকার পিছনে ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরের দ্বারস্থ হলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। তাঁর দাবি, কলোনির বাসিন্দারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং বিজেপির তথাকথিত ভোটব্যাঙ্কের অংশ নন বলেই পরিকল্পিত ভাবে তাঁদের পানীয় জল থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এখনো স্পষ্ট নয়।

কাশীপুর-বেলগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত জ্যোতিনগর কলোনির জলসঙ্কট নিয়ে এর আগে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সামিরুল। এ বার সমস্যাটিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ হিসাবে তুলে ধরে রাষ্ট্রপুঞ্জের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি। সমাজমাধ্যমে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরে পাঠানো চিঠির প্রতিলিপি প্রকাশ করে নিজের অভিযোগের কথা জানিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ। সামিরুলের অভিযোগ, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের সরকারি পানীয় জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই এলাকার মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ই তাঁদের প্রতি এমন আচরণের কারণ। যদিও জল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পিছনে প্রশাসনিক বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি পুরসভার তরফে।

রাষ্ট্রপুঞ্জে পাঠানো চিঠিতে সামিরুল উল্লেখ করেছেন, কলকাতার মতো শহরে একটি জনবহুল এলাকার প্রায় পাঁচ হাজার বাসিন্দাকে দীর্ঘদিন ধরে পানীয় জলের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। সরকারি পাইপলাইনের জল না মেলায় দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জলের ব্যবস্থা করাই তাঁদের কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে জল সরবরাহের চেষ্টা করছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রয়োজন মেটানোর পক্ষে সে ব্যবস্থা যে যথেষ্ট নয়, চিঠিতে সে কথাও জানিয়েছেন সাংসদ। জলের অভাবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন শিশু ও প্রবীণেরা, দাবি তাঁর। পানীয় জলের পাশাপাশি রান্না, পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবারের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের জন্যও পর্যাপ্ত জলের প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত জল না পাওয়ায় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। নিরাপদ পানীয় জলের অভাবে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সামিরুল।

তাঁর অভিযোগ, বিষয়টি কেবল একটি এলাকার পুর পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যা নয়। নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের কাছে বার বার আবেদন জানিয়েও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তা হলে তার দায় এড়ানো যায় না। চিঠিতে সামিরুলের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একাধিক বার আবেদন জানানো সত্ত্বেও স্থায়ী সমাধানের কোনও ব্যবস্থা হয়নি। চিঠিতে ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ। তাঁর দাবি, কলোনির বাসিন্দারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। বিজেপির তথাকথিত ভোটব্যাঙ্কের অংশ নন বলেই তাঁদের পানীয় জল সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। সামিরুলের মতে, এ অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

কলকাতার মতো মহানগরে পানীয় জল সরবরাহের মতো একটি মৌলিক নাগরিক পরিষেবা দীর্ঘদিন ব্যাহত থাকার অভিযোগ স্বাভাবিক ভাবেই প্রশাসনিক দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্ন তুলেছে। জল সরবরাহ কেন বন্ধ, কোন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে ওই পরিষেবা চালু রাখা এবং তা পুনরায় চালু করার জন্য কী পদক্ষেপ করা হয়েছে — এ প্রশ্নগুলির উত্তর জরুরি বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। সামিরুলের বক্তব্য, নিরাপদ পানীয় জল পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। ধর্ম, পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে কোনো নাগরিককে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। তাঁর অভিযোগ, জ্যোতিনগরের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে সেই অধিকারই খর্ব করা হচ্ছে।জ্যোতিনগর কলোনির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আর্জি জানিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরে চিঠি পাঠিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ। সেখানে মূলত চারটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।

প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় নিয়মিত পানীয় জল সরবরাহ বন্ধ থাকার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখার আর্জি জানিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের কাছে অবিলম্বে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন। তৃতীয়ত, সরকারি পাইপলাইনের মাধ্যমে স্থায়ী জল সরবরাহ পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। চতুর্থত, জলসঙ্কটের কারণে বিশেষত শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। চিঠিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংক্রান্ত নির্দেশিকার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। সামিরুলের বক্তব্য, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানীয় জল পাওয়া মানুষের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। জল কোনো দান বা অনুগ্রহ নয়, বরং মানুষের জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান। সে কারণে জ্যোতিনগরের সমস্যাকে সাধারণ পরিকাঠামোগত ত্রুটি হিসাবে না দেখে জরুরি মানবিক সঙ্কটের দৃষ্টিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন তিনি।

জ্যোতিনগর কলোনির জল সরবরাহ বন্ধ থাকার অভিযোগ নিয়ে তৃণমূল সাংসদের এ পদক্ষেপে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেল। এর আগে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের করেছিলেন তিনি। এবার রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরে চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।  তবে এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান কবে হবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা। ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে সাময়িক জল সরবরাহের ব্যবস্থা দিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন কত দিন মেটানো সম্ভব, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং নিয়মিত পাইপলাইনের জল ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!