Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ১৩, ২০২৬

নিরাপত্তার প্রশ্ন, ভারতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু না করার দাবি স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নিরাপত্তার প্রশ্ন, ভারতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু না করার দাবি স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের

ভারতে বাণিজ্যিকভাবে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করার ক্ষেত্রে নতুন করে বাধার মুখে পড়তে পারে ইলন মাস্কের সংস্থা স্টারলিঙ্ক। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সঙ্গে যুক্ত সংগঠন স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ (এসজেএম) মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে, ভারতে স্টারলিঙ্ককে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। সংগঠনটির যুক্তি, স্টারলিঙ্কের উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তির কারণে ইন্টারনেট পরিষেবার উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কার্যকর করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন এক সময়ে এই দাবি উঠেছে, যখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনকে একাধিক পদক্ষেপ করতে হচ্ছে।

স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের জাতীয় সহ-আহ্বায়ক অশ্বিনী মহাজন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, বর্তমানে ভারত বিভিন্ন ধরনের আইনশৃঙ্খলাজনিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতিতে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে গুজব এবং দেশবিরোধী বয়ান ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি তাঁর। মহাজনের বক্তব্য, বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ, দাঙ্গা, বিক্ষোভ এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনেক সময় ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ বা সীমিত করা প্রয়োজন হয়। সেই কারণেই স্টারলিঙ্ককে ভারতে পরিষেবা চালুর অনুমতি না দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছে সংগঠনটি।

স্টারলিঙ্ককে ঘিরে এই বিতর্কের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে ইলন মাস্কের সাম্প্রতিক মন্তব্যে। ভারতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু করতে দেরি হওয়া নিয়ে রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানিকে প্রকাশ্যে নিশানা করেছিলেন মাস্ক। প্রথমে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ‘প্রভাবশালী ব্যবসায়ী’ নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশের পথে বাধা সৃষ্টি করছেন। পরে সমাজমাধ্যম এক্সে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আম্বানিই কি ভারতের প্রকৃত বস?” মাস্কের এই অভিযোগ খারিজ করে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, দেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামো ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন। কোনও সংস্থার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা ভিত্তিহীন এবং ভুল ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত বলেও জানিয়েছে সরকার।

কেন্দ্রের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, স্টারলিঙ্ক, রিলায়্যান্স জিও এবং ভারতী গোষ্ঠীর সমর্থনপুষ্ট ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব—এই তিন সংস্থাই প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পেয়েছে। তবে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু করার আগে প্রত্যেককেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। সেই শর্তগুলি মেনে চলার বিষয়টি যাচাই করার পরেই স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরুর পরবর্তী ধাপে এগোনো সম্ভব। যোগাযোগ মন্ত্রকের বক্তব্য, তিনটি সংস্থারই নিরাপত্তা সংক্রান্ত মূল্যায়ন চলছে এবং নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার বিচারে তারা মোটামুটি একই পর্যায়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় যোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াও জানিয়েছেন, নিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক্তিয়ারভুক্ত।

স্টারলিঙ্কের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। সংগঠনটির দাবি, প্রচলিত টেলিকম নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে সরকার নির্দিষ্ট এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ বা সীমিত করার নির্দেশ দিতে পারে। সেই নির্দেশ কার্যকর করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও তদন্তকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে সহযোগিতাও করে থাকে প্রচলিত টেলিকম সংস্থাগুলি। কিন্তু স্টারলিঙ্কের স্যাটেলাইট-ভিত্তিক নেটওয়ার্কের কাঠামো তুলনামূলকভাবে জটিল। সংগঠনটির বক্তব্য, স্টারলিঙ্কের উপগ্রহগুলি পরস্পরের সঙ্গে লেজার লিঙ্কের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে। ফলে কোনও তথ্য সরাসরি নিকটবর্তী গ্রাউন্ড স্টেশনে না পৌঁছে এক উপগ্রহ থেকে অন্য উপগ্রহে ঘুরে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। এই প্রযুক্তি ভারতের অভ্যন্তরে ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের উপর নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা এসজেএমের।

সংগঠনটির দাবি, ভারত থেকে উৎপন্ন ইন্টারনেট ট্র্যাফিক যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ গেটওয়ে এড়িয়ে বিদেশি পরিকাঠামোর মাধ্যমে চলাচল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, জাতীয় নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতিতে সরকার নির্দেশ দিলে স্টারলিঙ্ককে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় নির্ভুলভাবে পরিষেবা সীমিত বা বন্ধ করার সক্ষমতাও দেখাতে হবে। এসজেএমের অভিযোগ, স্টারলিঙ্ক এখনও এই শর্ত পূরণের বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এমনকি সংস্থাটির প্রযুক্তিগত কাঠামোর কারণে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। তবে এগুলি স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের উত্থাপিত আশঙ্কা ও দাবি; স্টারলিঙ্কের প্রযুক্তি সম্পর্কে সংগঠনটির বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।

ভারতের ইন্টারনেট ট্র্যাফিক বিদেশি পরিকাঠামোর মধ্য দিয়ে চলাচল করলে আইনসম্মত নজরদারি, তথ্য আটকানো এবং তদন্তকারী সংস্থার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলেও দাবি করেছে এসজেএম। তাদের আশঙ্কা, প্রচলিত টেলিকম নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনাল বিদ্রোহী গোষ্ঠী, চোরাকারবারি এবং অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তিদের কাজে লাগতে পারে। সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, সংবেদনশীল এলাকায় অনুমোদনহীন স্টারলিঙ্ক টার্মিনালের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে এবং বিভিন্ন তদন্তের সময় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি স্টারলিঙ্কের সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। এই দাবিগুলির সমর্থনে সংগঠনটি তার বিবৃতিতে বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরেছে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।

এই বিতর্কের মধ্যেই দেশীয় টেলিকম এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তির বিকাশে আরও জোর দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। সংগঠনটির মতে, স্টারলিঙ্ককে ভারতে পরিষেবা চালুর অনুমতি না দিলে দেশীয় সংস্থাগুলির জন্য স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা গড়ে তোলার সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় দ্রুত এবং সাশ্রয়ী ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। অশ্বিনী মহাজনের বক্তব্য, দেশীয় স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করতে কিছুটা সময় বেশি লাগলেও, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্টারলিঙ্কের তুলনায় অনেক কম খরচে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

এর আগে ভারতে পঞ্চম প্রজন্মের (৫জি) টেলিকম পরিষেবা চালুর প্রস্তুতির সময় চিনা টেলিকম সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী সংস্থা হুয়াওয়ে এবং জেডটিই-র বিরুদ্ধেও আপত্তি জানিয়েছিল স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ। সংগঠনটির দাবি, সে ক্ষেত্রেও তাদের আপত্তির মূল কারণ ছিল জাতীয় নিরাপত্তা। স্টারলিঙ্কের ক্ষেত্রেও একই ধরনের যুক্তি তুলে ধরে সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশের যোগাযোগ পরিকাঠামোর উপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কের প্রসঙ্গও টেনে এনেছে এসজেএম। সংগঠনটির বক্তব্য, আমেরিকা যদি জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে ভারতীয় পণ্যের আমদানির উপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে বা হস্তশিল্পের মতো ভারতীয় পণ্যের প্রবেশে বাধা দেয়, তা হলে ভারতও নিজের প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের ভিত্তিতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা আটকে দেওয়ার অধিকার রাখে। মহাজনের কথায়, স্টারলিঙ্ককে ভারতে পরিষেবা চালুর অনুমতি না দেওয়া হলে তা আমেরিকার মতো বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেবে যে, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতও নিজের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে পারে।

অন্যদিকে, রিলায়্যান্স জিও এবং ভারতী এয়ারটেলের মতো সংস্থারও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবসায় স্বার্থ রয়েছে। ভারতের প্রচলিত টেলিকম বাজারে এই দুই সংস্থারই উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। জিও-র স্যাটেলাইট উদ্যোগ রয়েছে এসইএস-এর সঙ্গে, অন্যদিকে ভারতী গোষ্ঠী ইউটেলস্যাটের অন্যতম প্রধান শেয়ারহোল্ডার। ইউটেলস্যাটের অধীনেই পরিচালিত হয় ওয়ানওয়েব। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই দুই ভারতীয় টেলিকম সংস্থাই গত বছর ভারতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা বিপণন ও বিতরণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে স্পেসএক্সের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। ফলে একদিকে দেশীয় সংস্থাগুলির স্যাটেলাইট ব্যবসায়িক স্বার্থ, অন্যদিকে স্টারলিঙ্কের সম্ভাব্য প্রবেশ—দুইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

স্বদেশি জাগরণ মঞ্চের বক্তব্য, নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে ইলন মাস্ক প্রকাশ্যে মন্তব্য করে সরকারের উপর জনমত ও রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছেন। সংগঠনটির অভিযোগ, স্টারলিঙ্ক হয়তো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্তগুলি পূরণ করতে প্রস্তুত নয়, অথবা সংস্থাটির প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে সেই শর্তগুলি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই কারণেই মাস্ক লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে জনচাপ তৈরির চেষ্টা করছেন, অথবা এই পরিস্থিতিতে হতাশা থেকেই এমন মন্তব্য করছেন বলে মনে করছে এসজেএম। সব মিলিয়ে, ভারতে স্টারলিঙ্কের বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু করার প্রশ্নটি এখন শুধু লাইসেন্স বা স্পেকট্রাম বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাতীয় নিরাপত্তা, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ, টেলিকম বাজারের প্রতিযোগিতা এবং ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক—একাধিক বিষয়কে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। তবে স্টারলিঙ্কের চূড়ান্ত প্রবেশাধিকার নির্ভর করবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণ এবং সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার উপর।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!