- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- অক্টোবর ১৪, ২০২৬
লাঠির বদলে বাঁশি, ঘৃণার বদলে ভালোবাসা : গান্ধীর অহিংসার উত্তরাধিকারেই প্রতিবাদের নতুন ভাষা খুঁজছে দেশ?
লাঠির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর। মাথায় পুলিশের ডান্ডার দাগ। অথচ প্রতিশোধের ভাষা হিসাবে সেই তরুণ বেছে নিলেন অন্য এক ‘লাঠি’, সুর-মূর্ছনার অবলম্বন – বাঁশি। সে বাঁশিতেই বেজে উঠল ‘বৈষ্ণব জন তো’ — মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় ভজনগুলির অন্যতম। সুর থামিয়ে তরুণের ঘোষণা, ‘ঘৃণার জবাব ঘৃণা দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়েই দেওয়া হবে।’ দিল্লিতে রাহুল গান্ধীর পাশে দাঁড়িয়ে ওই তরুণের বাঁশি বাজানোর দৃশ্য তাই নিছক ভাইরাল ভিডিওর উপাদান নয়। পুলিশের ডান্ডার সামনে বাঁশি তুলে ধরার মধ্যে রয়েছে প্রতিবাদের এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। যে রাষ্ট্রের হাতে লাঠি, তার বিপরীতে নাগরিকের হাতে বাঁশি — এই দৃশ্য কি মনে করিয়ে দিচ্ছে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে? না কি আরও এক বার সামনে আনছে সেই চিরন্তন প্রশ্ন, ক্ষমতার হিংসার মোকাবিলা কেবল পাল্টা হিংসা দিয়েই সম্ভব?
নিগৃহীত পড়ুয়াদের পাশে নিয়ে দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করেছেন রাহুল গান্ধী। কারও একটা কানের শোনার ক্ষমতা চলে গিয়েছে, কেউ যৌন হেনস্তার শিকার, কারও মাথা ফেটেছে, হাত ভেঙেছে। বক্তৃতার শেষে এক তরুণকে সামনে এগিয়ে আসতে বলেন তিনি। ওই তরুণ জানান, জুলাই মাসে প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালীন তাঁর মাথায় পুলিশের ডান্ডার আঘাত লেগেছিল। রাহুল জানতে চান, তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি কী করেছিলেন। তরুণের উত্তর, অন্য একটি ‘ডান্ডা’ দিয়ে জবাব দিয়েছেন তিনি। তার পরেই বেরিয়ে আসে বাঁশি। তাতে ভেসে ওঠে ‘বৈষ্ণব জন তো’ গানের সুর। এ দৃশ্যের রাজনৈতিক অভিঘাত নিহিত রয়েছে ‘ডান্ডা’ শব্দটির দ্ব্যর্থতার মধ্যেই। ডান্ডা এখানে একই সঙ্গে আক্ষরিক অর্থে পুলিশের লাঠি আর ক্ষমতার প্রতীক। রাষ্ট্রের হাতে থাকা লাঠি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উপকরণ হতে পারে। কিন্তু সেই লাঠি যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদীদের শাসন, ভয় দেখানো কিংবা শারীরিক ভাবে হেনস্থা করার অভিযোগের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার অর্থ আর নিছক একটি অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার দৃশ্যমান ভাষা — যে ভাষায় নাগরিককে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, রাষ্ট্রের নির্দেশ অমান্য করার পরিণাম কী হতে পারে।
অন্যদিকে, তরুণের হাতে বাঁশি ক্ষমতার সে ভাষাকে অনুকরণ করে না কিছুতেই। বরং তার অর্থই বদলে দেয়। একই বাঁশের তৈরি একটি বস্তু আঘাতের উপকরণ, অন্য প্রেক্ষিতে সুরের বাহন। বস্তুটি নয়, তার ব্যবহার আর তাকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক অভিপ্রায়ই নির্ধারণ করে দেয় তার অর্থ। এই রূপান্তরেই নিহিত রয়েছে প্রতিবাদী তরুণের প্রতীকী জবাবের শক্তি। লাঠির আঘাত শরীরে ক্ষত তৈরি করতে পারে। কিন্তু সে আঘাতের জবাবে যদি আক্রান্ত মানুষটিও একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন, তা হলে হিংসার চক্র ভাঙা কঠিন। বাঁশির সুর সে চক্রের বাইরে দাঁড়ানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। অন্তত প্রতীকী অর্থে তো বটেই।
মহাত্মা গান্ধীর কথা উঠলে তাঁর হাতে ধরা লাঠির ছবিও বার বার ফিরে আসে। ধুতি পরা, হাতে লাঠি নিয়ে এগিয়ে চলা এক বৃদ্ধের অবয়ব ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত প্রতীক। অথচ সে লাঠি এবং গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে আপাতবিরোধ রয়েছে। যে মানুষটি অহিংসাকে রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন, তাঁর হাতেও ছিল লাঠি। গান্ধীর লাঠিকে নিছক অস্ত্র হিসাবে দেখলে তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য বোঝা সম্ভব নয়। দীর্ঘ পদযাত্রা, শারীরিক অবলম্বন আর অনিশ্চিত পথে চলার সঙ্গী হিসাবেও লাঠির ব্যবহার করা হয়। ১৯৩০ সালের ডান্ডি অভিযান তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। লবণ আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গান্ধীর নেতৃত্বে সবরমতী আশ্রম থেকে ডান্ডির উদ্দেশে যে পদযাত্রা শুরু হয়েছিল, তার শক্তি নিহিত ছিল সাম্রাজ্যবাদী আইনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য, সংগঠিত ও অহিংস অসহযোগে। ব্রিটিশ শাসনের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সেখানে অস্ত্রের প্রয়োজন হয়নি। প্রয়োজন হয়েছিল মানুষের অংশগ্রহণ, নৈতিক দৃঢ়তা আর অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার সংকল্পের।
গান্ধীর অহিংসা নিষ্ক্রিয় আত্মসমর্পণ নয়, তা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় রাজনৈতিক পদ্ধতি। লাঠির আঘাত সহ্য করা মানেই অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়; আঘাতের মুখেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা, আক্রমণকারীর মতো হয়ে না ওঠাই এ দর্শনের অন্যতম তাৎপর্য। এ কারণেই রাহুল গান্ধীর পাশে দাঁড়িয়ে তরুণের বাঁশি বাজানোর দৃশ্যের সঙ্গে গান্ধীর স্মৃতি জুড়ে যায়। ‘বৈষ্ণব জন তো’ গানটি গান্ধীর প্রিয় ভজনগুলির একটি। অন্যের দুঃখ অনুভব করা, সহমর্মিতা আর মানবিকতার যে নৈতিক বোধ গানটির সঙ্গে যুক্ত, তা অহিংস রাজনীতির চর্চাতেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পুলিশের ডান্ডার জবাবে বাঁশিতে ওই সুর তুলে তরুণ যেন প্রতিবাদের ভাষাকেই অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। সোচ্চারে জানান দিলেন, ‘ঘৃণার থেকে ভালোবাসা অনেকবেশি সংক্রামক’।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ‘এসআইআর’ বাতিলের দাবিতে দিল্লির চলমান আন্দোলন ঘিরে পড়ুয়াদের আটক করা, মারধরের যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রশ্ন তুলছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? নাগরিকের অসন্তোষকে কি প্রথমেই নিয়ন্ত্রণের সমস্যা হিসাবে দেখা হবে, না কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবে শোনার চেষ্টা করা হবে? গণতন্ত্রে পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু সে দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি যদি নাগরিকের মধ্যে ভয় তৈরি করে, প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত করে কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা নষ্ট করে, তা হলে আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
প্রতিবাদের ইতিহাসে অহিংসার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত আপত্তি, অহিংসা কি অত্যাচারীর সামনে আক্রান্তকে অসহায় করে তোলে? যে হাতে অস্ত্র, তার সামনে যে হাত খালি, তার প্রতিরোধের ক্ষমতা কতটা? যে রাষ্ট্রের হাতে পুলিশ, প্রশাসন, আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা আর বলপ্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, তার বিরুদ্ধে একজন নাগরিকের বাঁশি কতটা কার্যকর? ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০-তে গ্রেফতার হওয়ার আগে, ‘সিএএ-এনআরসি’-বিরোধী আন্দোলনের সময়ে এক বক্তৃতায় উমর খালিদ বলেছিলেন : ‘আমরা হিংসার জবাব হিংসা দিয়ে দেব না। ঘৃণার জবাব ঘৃণা দিয়ে দেব না। ওরা ঘৃণা ছড়ালে আমরা ভালবাসা ছড়িয়ে তার জবাব দেব’। এর পরেই তিনি বলেছিলেন, লাঠি দিয়ে আঘাত করা হলে তাঁরা তেরঙ্গা তুলে ধরবেন, গুলি চালানো হলে সংবিধান হাতে দাঁড়াবেন, আর জেলে পাঠানো হলে ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’ গাইতে গাইতে জেলে যাবেন। বক্তৃতায় তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকারের কথাও বলেছিলেন। সেই উওর আজ দীর্ঘদিন একপ্রকার বিনাবিচারে জেলবন্দি।
প্রশ্নগুলি অমূলক নয়। বিশেষত যখন প্রতিবাদীরা আটক হন, তাঁদের উপর বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে, কিংবা তাঁদের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে আসে, তখন কেবল নৈতিক আবেদন দিয়ে ক্ষমতার কাঠামো বদলে দেওয়া যায় না। কিন্তু অহিংসাকে দুর্বলতার সমার্থক ধরে নেওয়াও ভুল। অহিংস প্রতিরোধের শক্তি অনেক সময় নিহিত থাকে ক্ষমতার নির্দেশ মেনে চলতে অস্বীকার করা, জনসমর্থন সংগঠিত করা, অন্যায়ের সাক্ষ্য নথিবদ্ধ করা আর রাষ্ট্রের আচরণকে বৃহত্তর সমাজের সামনে দৃশ্যমান করে তোলার মধ্যে। বাঁশির সুর পুলিশের লাঠি থামিয়ে দিতে পারে কি না, তার উত্তর বাস্তব রাজনীতির ময়দানেই মিলবে। কিন্তু সে সুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলতে পারে — প্রতিবাদ দমনের জন্য বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠলে, আক্রান্ত মানুষটির প্রতিক্রিয়া কি কেবল প্রতিশোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? না কি তিনি এমন একটি ভাষা তৈরি করতে পারবেন, যা আক্রমণকারীর ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহমর্মিতাও অর্জন করবে?
ইতিহাসে অহিংস আন্দোলনের সাফল্য কখনওই শুধু তার নৈতিক সৌন্দর্যের উপর নির্ভর করেনি। তার সঙ্গে যুক্ত থেকেছে জনসংগঠন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক সমর্থন এবং ক্ষমতাসীনদের উপর চাপ তৈরির কৌশল। মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহও এমনই রাজনৈতিক অনুশীলন। রাজনৈতিক সংঘাতের সময়ে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা সহজ। রাগ, অপমান আর আঘাতের অভিজ্ঞতা মানুষকে পাল্টা আঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু সহমর্মিতার ভাষা সেই সহজ প্রতিক্রিয়াকে প্রশ্ন করে। তা মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আর অন্য মানুষকে ঘৃণা করা এক বিষয় নয়। যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তার সমালোচনা করেও মানবিকতার দাবি বজায় রাখা সম্ভব। নিরন্তর ভালোবাসার কথা বলার অর্থ অন্যায়কে ক্ষমা করে দেওয়া নয়। অহিংস প্রতিবাদের গভীরতর অর্থ — ন্যায়বিচারের দাবি বজায় রেখেও প্রতিশোধের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা। অপরাধের অভিযোগের তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করার দাবি অহিংসার সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে পাল্টা হিংসা প্রায়ই প্রতিবাদের মূল দাবিকে আড়াল করে দেয়। তখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে সংঘর্ষ, ভাঙচুর কিংবা আঘাতের ঘটনা; যে অন্যায়ের অভিযোগে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা পিছনের সারিতে চলে যেতে পারে। আজকের ভারতে এ পার্থক্য বারবার মনে করানো ভীষণ জরুরি। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি অহিংস আন্দোলন স্বয়ংক্রিয় ভাবে সফল হবে, কিংবা ক্ষমতাসীনরা সব সময় নৈতিক যুক্তির কাছে নতি স্বীকার করবেন। অহিংসারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা, সংগঠনের স্থায়িত্ব আর রাজনৈতিক চাপ তৈরির কার্যকর কৌশল প্রয়োজন। প্রতীকী প্রতিবাদ তখনই বৃহত্তর তাৎপর্য পায়, যখন তা বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়। সে বিচারে বাঁশির সুর একটি সূচনা হতে পারে।
❤ Support Us




