- দে । শ
- অক্টোবর ২৮, ২০২৬
দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন ?
দুর্গাপুজোর প্রিভিউ পাস ও ডোনার কার্ড বিক্রিকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের মধ্যেই নতুন মোড়। বুধবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) সিজিও কমপ্লেক্সের দফতরে হাজিরা দিতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে। প্রায় চার ঘণ্টা পর দফতর থেকে বেরিয়ে আসতেই তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় কলকাতা পুলিশ। সূত্রের খবর, তাঁকে লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
পুজোর পাস বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগে কলকাতা পুলিশের পাশাপাশি তদন্ত করছে ইডিও। এদিন, ইডির তলবে হাজিরা দিতে সিজিও কমপ্লেক্সে পৌঁছেছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী। দুপুর থেকেই কমপ্লেক্সের ভিতরে ও বাইরে পুলিশকর্মীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কলকাতা ও বিধাননগর পুলিশের আধিকারিকদের আনাগোনা নজরে পড়ে। ফলে ইন্দ্রনীলকে গ্রেফতার করা হতে পারে কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। প্রায় চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি যখন ইডির দফতর থেকে বেরিয়ে আসেন, তখনই পুলিশ তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। সূত্রের দাবি, পুজোর পাস বিক্রি সংক্রান্ত মামলাতেই তাঁকে লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে অভিযোগের সূত্র দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো দেখার জন্য পাস বিক্রি। অভিযোগ, ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে কলকাতার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপ ঘুরে দেখার পাস বিক্রি করা হয়েছিল। সে ব্যবসায় বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হলেও তার কতটা সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটিগুলির কাছে পৌঁছেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমে সে ঘটনায় বউবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করেন এক ব্যক্তি। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে কলকাতা পুলিশ। পরে আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে মামলার তদন্তে নামে ইডি।
দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কলকাতায় প্রিভিউ পাস বিক্রির চল নতুন নয়। মহালয়ার পর কয়েক দিন ধরে শহরের একাধিক পুজোমণ্ডপ ঘুরে দেখার সুযোগ মিলত ওই পাসের মাধ্যমে। কিন্তু সে ব্যবস্থাকে ঘিরেই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাস বিক্রির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছিল। ২০২২ সালে প্রায় ১৯ হাজার পাস বিক্রি হয়। পরের বছর, ২০২৩ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ হাজারে। ২০২৪ সালে বিক্রি হওয়া পাসের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬১ হাজার। অর্থাৎ, মাত্র দু-বছরের ব্যবধানে বিক্রির পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি হয়ে যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পাসগুলির দামও ছিল কয়েক হাজার টাকা। ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে প্রিভিউ শো দেখার জন্য বিক্রি হওয়া পাসের দাম শুরু হতো ১,৭৪৯ টাকা থেকে। সর্বোচ্চ দাম ছিল ৫,৪৯৯ টাকা। কলকাতার প্রায় ২৪টি পুজোমণ্ডপ ঘুরে দেখার জন্য এই পাস ব্যবহার করা যেত বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, ইউনেস্কোর সঙ্গে অংশীদারির কথা প্রচার করে পাস বিক্রির পরিসর বাড়ানো হয়েছিল। সেই দাবির সত্যতা এবং তার ভিত্তিতে অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
প্রিভিউ পাসের পাশাপাশি ডোনার কার্ড বিক্রির বিষয়টিও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে। ২০২৫ সালে শিল্পী ও পুজো উদ্যোক্তাদের সাহায্য করার কথা বলে সিলভার, গোল্ডেন ও প্ল্যাটিনাম—তিন ধরনের ডোনার পাস চালু করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। পাসগুলির দাম ছিল দেড় হাজার থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত। ক্রেতাদের ইউপিআই বা অন্য অনলাইন মাধ্যমে টাকা পাঠাতে হতো। অর্থ জমা পড়ার পরে তাঁদের কিউআর কোড দেওয়া হতো, যা দেখিয়ে পুজোমণ্ডপে প্রবেশ করা যেত। কলকাতার বিভিন্ন মণ্ডপের পাশাপাশি বনেদি বাড়ির পুজো এবং আলিপুর মিউজিয়ামে প্রবেশের জন্যও পৃথক পাস বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারীদের অনুমান, পাস বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ছিল বিপুল। অভিযোগ, অনলাইনে জমা পড়া টাকা প্রথমে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যেত। পরে সেখান থেকে একাধিক অ্যাকাউন্টে সেই অর্থ স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকার লেনদেনের হিসাব খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ওই অর্থের কতটা পুজো কমিটিগুলির কাছে পৌঁছেছিল, শিল্পী ও উদ্যোক্তাদের সাহায্যের জন্য কত টাকা খরচ হয়েছিল এবং বাকি অর্থ কোথায় গিয়েছে, তা জানতেই ইন্দ্রনীলকে একাধিক বার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে ইডি সূত্রের খবর।
গত সেপ্টেম্বর থেকেই এই মামলায় তদন্তের গতি বাড়ে। ২৯ সেপ্টেম্বর ইন্দ্রনীলের হুগলির বাড়িতে তল্লাশি চালায় ইডি। পরের দিন, ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁকে সিজিও কমপ্লেক্সে ডেকে প্রায় আট ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ৭ অক্টোবর ফের হাজিরা দিতে হলে তাঁকে প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। তার পর ১৬ অক্টোবরও তাঁকে তলব করা হয়। তবে সে দিন তিনি হাজিরা দেননি বলে অভিযোগ। বুধবার ফের তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। এ দিন হাজিরা দেওয়ার পরেই পুলিশ তাঁকে নিয়ে যাওয়ায় তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ দিকে, তদন্তের মধ্যে আইনি রক্ষাকবচ পাওয়ার জন্য আদালতেরও দ্বারস্থ হয়েছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী। তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে যায় বলে জানা গিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টেও রক্ষাকবচের আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি। তবে আদালত থেকে সুরক্ষা না মেলায় তদন্তকারীদের পদক্ষেপ ঘিরে জল্পনা চলছিল। বুধবার সিজিও কমপ্লেক্সে পুলিশের উপস্থিতি বৃদ্ধি সেই জল্পনাকে আরও উস্কে দেয়। শেষ পর্যন্ত ইডির দফতর থেকে বেরোনোর পর পুলিশ তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
পাস বিক্রি ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ এবং ইডি পৃথক দিক থেকে তদন্ত চালাচ্ছে। কলকাতা পুলিশের তদন্তে অভিযোগের ভিত্তি, পাস বিক্রির পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, অর্থ তছরুপের অভিযোগে প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের অধীনে তদন্ত করছে ইডি। পাস বিক্রির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের গতিপথ, বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা — সবই তদন্তের আওতায় রয়েছে।
দুর্গাপুজোর মতো সাংস্কৃতিক উৎসবকে কেন্দ্র করে পাস বিক্রির ব্যবসা কী ভাবে কয়েক বছরে বিপুল অঙ্কের লেনদেনের পর্যায়ে পৌঁছল, এখন সে প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে প্রচার, পাসের বিক্রিবাটার হিসাব এবং সংগৃহীত অর্থের বণ্টন —তদন্তের একাধিক দিক রয়েছে। বুধবার ইডির দফতরে হাজিরার পর ইন্দ্রনীলকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সেই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তদন্তের ফলেই স্পষ্ট হবে, পাস বিক্রির অর্থনৈতিক লেনদেনে অনিয়ম হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তার দায় কার।
❤ Support Us






