Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • আগস্ট ৬, ২০২৬

অনুদানে বৈষম্য, সময়মতো হিসাব দিতে ব্যর্থ অধিকাংশ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল — এডিআর রিপোর্ট ঘিরে নয়া বিতর্ক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অনুদানে বৈষম্য, সময়মতো হিসাব দিতে ব্যর্থ অধিকাংশ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল — এডিআর রিপোর্ট ঘিরে নয়া বিতর্ক

রাজনৈতিক দলগুলির অর্থায়নের উৎস কতটা স্বচ্ছ? কোন দল কত অনুদান পেল, সে অর্থ কোথা থেকে এল, আর সেই তথ্য নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা পড়ল কি না — এই প্রশ্নগুলিকে ফের সামনে নিয়ে এল ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস’-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট। ২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দেশের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলির ঘোষিত অনুদান সংক্রান্ত প্রতিবেদন খতিয়ে দেখে সংস্থাটি জানিয়েছে, অনুদানের অঙ্কে যেমন বিস্তর ফারাক রয়েছে, তেমনই আর্থিক তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ দল সময়সীমা মানতে পারেনি। বহু দলের ক্ষেত্রে আবার নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেই কোনো তথ্য মেলেনি।

এডিআর-এর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলির অর্থের উৎস সম্পর্কে নাগরিকদের জানার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোন ব্যক্তি বা সংস্থা কোনও রাজনৈতিক দলকে অনুদান দিচ্ছে, সে অনুদান ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার অন্যতম উপায় এই আর্থিক তথ্য। সে কারণেই রাজনৈতিক দলগুলির অনুদান সংক্রান্ত রিপোর্টকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করে সংস্থাটি।

‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১’-এর ‘২৯সি ধারা’ অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলিকে ২০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের সমস্ত অনুদানের উৎস ও বিবরণ নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিতে হয়। পাশাপাশি, আয়কর আইন, ১৯৬১-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়ম মেনে আর্থিক তথ্য প্রকাশ করলে রাজনৈতিক দল এবং অনুদানদাতারা কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধাও পেয়ে থাকেন। ফলে সময়মতো এবং নির্ভুল আর্থিক তথ্য জমা দেওয়া শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতাই নয়, রাজনৈতিক স্বচ্ছতারও অন্যতম সূচক। এডিআর-এর বিশ্লেষণে মোট ৪০টি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের জন্য ৩৯টি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের জন্য ৩৪টি দলের অবদান সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপলব্ধ থাকায় সেসব নথির ভিত্তিতেই সমীক্ষা করা হয়েছে। দেশের মোট ৬৭টি স্বীকৃত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই ৪০টি দলকে বিশ্লেষণের আওতায় আনা হয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হল, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে মাত্র ১২টি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের অবদান বা অনুদান সংক্রান্ত রিপোর্ট নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে। সময়সীমা মেনে রিপোর্ট জমা দেওয়া দলগুলির মধ্যে রয়েছে ‘জননায়ক জনতা পার্টি’ (জেজেপি), ‘লোক জনশক্তি পার্টি’ (রামবিলাস), ‘কেরালা কংগ্রেস’ (এম), ‘নাগা পিপলস ফ্রন্ট’ (এনপিএফ), ‘রাষ্ট্রীয় লোকতান্ত্রিক পার্টি’ (আরএলটিপি), ‘মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টি’ (এমজিপি), ‘বিজু জনতা দল’ (বিজেডি), ‘অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এআইইউডিএফ), ‘অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম’ (এআইএডিএমকে), ‘দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝাগম’ (ডিএমকে), ‘ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি’ এবং ‘ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা’ (জেএমএম)।

অন্যদিকে, আগের অর্থবর্ষ অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে সময়মতো রিপোর্ট জমা দেওয়া দলের সংখ্যা ছিল ২৪। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে রিপোর্ট দাখিলকারী দলের সংখ্যা কার্যত অর্ধেকেরও কমে গিয়েছে। এই প্রবণতা রাজনৈতিক দলগুলির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। রিপোর্টে আরও দেখা গিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ২১টি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নির্ধারিত সময় পেরিয়ে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। কারও ক্ষেত্রে বিলম্ব মাত্র আট দিনের, আবার কারও ক্ষেত্রে সেই বিলম্ব পৌঁছেছে ১৬০ দিন পর্যন্ত। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষেও ১৪টি দল সময়সীমা অতিক্রম করে রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। সে সময় বিলম্বের পরিমাণ ছিল দুই দিন থেকে ১০৯ দিন পর্যন্ত।

আরও উদ্বেগজনক তথ্য হল, বহু দলের রিপোর্ট নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেই পাওয়া যায়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের জন্য ৩৩টি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের অবদান সংক্রান্ত রিপোর্ট অনুপস্থিত বলে জানিয়েছে এডিআর। এই তালিকায় রয়েছে ‘ভারত আদিবাসী পার্টি’, ‘গোয়া ফরওয়ার্ড পার্টি’, ‘ভয়েস অফ দ্য পিপল পার্টি’, ‘সিটিজেন অ্যাকশন পার্টি–সিকিম’, ‘জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স’, ‘অসম গণ পরিষদ’, ‘ইন্ডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অফ ত্রিপুরা’, ‘তিপরা মোথা পার্টি’, ‘অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক’, ‘অল ইন্ডিয়া এন.আর. কংগ্রেস’, ‘বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট’, ‘হিল স্টেট পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি’, ‘জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল প্যান্থার্স পার্টি’-সহ আরও একাধিক দল।

এডিআর-এর বিশ্লেষণে আরও একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে সময়মতো রিপোর্ট জমা দেওয়া কয়েকটি দল ২০২৪-২৫ সালে সেই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেনি। এই তালিকায় রয়েছে ‘তেলুগু দেশম পার্টি’, ‘মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা’, ‘অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন’, ‘অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’ এবং ‘সিকিম ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’। অন্যদিকে, কিছু দল পরপর দুই অর্থবর্ষেই নির্ধারিত সময়ের পরে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ‘জনতা দল’ (ইউনাইটেড), ‘আপনা দল’ (সোনেলাল), ‘সিপিআই (এমএল) লিবারেশন’, ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’, ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লোক দল’, ‘জনতা দল (সেকুলার)’, ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ এবং ‘দেশীয় মুরপোক্কু দ্রাবিড় কাঝাগম’।

ভারতে রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থা বাতিলের পর রাজনৈতিক দলগুলির অর্থের উৎস নিয়ে জনস্বার্থে আরও বেশি তথ্য প্রকাশের দাবি জোরালো হয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে এডিআর-এর এই বিশ্লেষণ আবারও দেখিয়ে দিল, শুধু অনুদানের অঙ্ক নয়, সেই অনুদানের হিসাব জনসমক্ষে আনা এবং আইন নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এখনো বহু রাজনৈতিক দলের বড়সড় ঘাটতি রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও জনআস্থার প্রশ্নে এই প্রবণতা যে উদ্বেগের, তা কার্যত স্পষ্ট করে দিয়েছে সংস্থার সর্বশেষ রিপোর্ট।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!