- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ৭, ২০২৬
‘নিজামের শহর’ অতীত, অমরাবতীতেই সিলমোহর। দশকের জট কাটিয়ে স্থায়ী রাজধানী পেল অন্ধ্রপ্রদেশ
দীর্ঘ এক দশকের টানাপোড়েন, রাজনৈতিক দোলাচল আর প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার অবসান। অবশেষে অন্ধ্রপ্রদেশ তার নিজস্ব স্থায়ী রাজধানী পেল। কেন্দ্রের গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে আইনি সিলমোহর পড়তেই স্পষ্ট বার্তা, হায়দরাবাদ এখন অতীত; নতুন প্রশাসনিক বাস্তবতার নাম অমরাবতী। ২০২৬ সালের অন্ধ্রপ্রদেশ পুনর্গঠন (সংশোধনী) আইন কার্যকর হওয়ায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটল বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
১ এপ্রিল লোকসভায় পাস হওয়ার পরদিনই রাজ্যসভায় অনুমোদন মেলে বিলটির। তার পর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সম্মতি মিলতেই ৬ এপ্রিল আইন ও বিচার মন্ত্রক গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২ জুন ২০২৪ থেকেই কার্যকর বলে গণ্য হবে নতুন আইন। অর্থাৎ, হায়দরাবাদের পরিবর্তে অমরাবতীই অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তরাধিকারী রাজধানী হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পেল। অন্ধ্রপ্রদেশ ক্যাপিটাল রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি আইনে নির্ধারিত বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই রাজধানী এলাকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২০১৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ ভাঙনের সময় প্রণীত আইনে হায়দরাবাদকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশের যৌথ রাজধানী হিসেবে রাখা হয়েছিল। সে সময় থেকেই নতুন রাজধানী নিয়ে দোলাচল শুরু। পরবর্তীতে পরিকল্পনা, পরামর্শ ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ভিত্তিতে অমরাবতীকে রাজধানী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও রাজনৈতিক পালাবদলে সে সিদ্ধান্ত প্রশ্নের মুখে পড়ে। ২০১৯ সালে ক্ষমতায় এসে ওয়াইএসআর কংগ্রেস সরকার তিন রাজধানীর তত্ত্ব সামনে আনে— প্রশাসনিক রাজধানী বিশাখাপত্তনম, আইনসভা অমরাবতী এবং বিচার বিভাগীয় রাজধানী কুর্নুল। ওই প্রস্তাব ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও প্রতিবাদ দানা বাঁধে। বিশেষত অমরাবতীর কৃষকরা জমি দেওয়ার পরও রাজধানীর মর্যাদা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ায় আন্দোলনে নামেন।
পরিস্থিতি ফের বদলায় ২০২৪ সালে। নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় ফিরে তেলুগু দেশম পার্টি এবং মুখ্যমন্ত্রী এন. চন্দ্রবাবু নাইডু আবার অমরাবতীকেই একমাত্র রাজধানী করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। চলতি বছরের ২৮ মার্চ অন্ধ্রপ্রদেশ বিধানসভায় প্রস্তাব পাস করে কেন্দ্রের কাছে আইনের সংশোধনের আবেদন জানানো হয়। তারই পরিণতি এই সংশোধনী আইন। এ সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। ইতিমধ্যেই প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার ৯১টি অবকাঠামো প্রকল্প অমরাবতীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের একাধিক সংস্থা এই প্রকল্পে যুক্ত। কেন্দ্র এবং রাজ্য—উভয় সরকারের আশা, রাজধানীর আইনি স্বীকৃতির পর ্সেখানে বিনিয়োগের গতি আরও বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
কেন্দ্রের ঘোষণার পরই মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু সমাজমাধ্যমে লেখেন, ‘এখন থেকে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী অমরাবতী।’ একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সাংসদ এবং রাজ্যের সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘এটি অন্ধ্রপ্রদেশের মানুষের জয়, বিশেষ করে অমরাবতীর কৃষকদের, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছেন।’ শাসক শিবিরে উচ্ছ্বাসের আবহ থাকলেও বিরোধীদের আপত্তি থামেনি। ওয়াইএসআর কংগ্রেসের সাংসদ গোল্লা বাবু রাও সংসদে এই বিলকে ‘নাটক’ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর দাবি, রাজধানী সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাজ্যের সব অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করা উচিত।
এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য আরও পেছনে ফিরতে হয় ইতিহাসে। স্বাধীনতার আগে এই অঞ্চল নিজাম-শাসিত হায়দরাবাদ দেশীয় রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ১৯৪৮ সালে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ১৯৫৬ সালে ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে অন্ধ্র রাজ্য এবং হায়দরাবাদ রাজ্যের তেলেঙ্গানা অংশ মিলিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ আন্দোলন এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০১৩ সালে পৃথক তেলেঙ্গানা গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং ২০১৪ সালে সংসদে পাশ হওয়া আইনের মাধ্যমে ২ জুন আনুষ্ঠানিক ভাবে তেলেঙ্গানা রাজ্যের জন্ম হয়। সে সময় থেকেই হায়দরাবাদকে দুই রাজ্যের যৌথ রাজধানী হিসেবে রাখা হয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।
প্রবল আলোচিত বিতর্ক, রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও অন্ধ্রপ্রদেশের ‘রাজধানী বদল’-এ প্রশাসনিক স্তরে একরকম স্বস্তি ফিরেছে বলেই মত পর্যবেক্ষকদের। দীর্ঘ এক দশকের টানাপোড়েন, অনিশ্চয়তা এবং দোদুল্যমান নীতি এবার অনেকবেশি জনমুখী ও উন্নয়নমুখী হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। নজর, ঘোষণার পর বাস্তবের মাটিতে কত দ্রুত অমরাবতী ‘বিশ্বমানের শহর’ হিসেবে গড়ে ওঠে।
❤ Support Us





