- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মার্চ ২৭, ২০২৬
মমতার বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ দিতে কলকাতায় আসছেন অমিত শাহ। নিউ টাউনে শ্বেতপত্র পেশ করেই ফিরবেন দিল্লি
ভোটের মুখে বঙ্গ রাজনীতির উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিতে ঝটিকা সফরে শুক্রবার রাতেই কলকাতায় আসছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। উদ্দেশ্য, তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রস্তুত করা বিস্তৃত ‘অভিযোগপত্র’ প্রকাশ। শনিবার নিউ টাউনের একটি হোটেলে সে নথি প্রকাশ করবেন তিনি। এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেবেন। কার্যত এক দিনের সফর, কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্বে তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ দিল্লির সর্দার পটেল মার্গের তাজ প্যালেস থেকে রওনা দেবেন শাহ। জেনারেল অ্যাভিয়েশন টার্মিনাল ৪ থেকে রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে তাঁর বিমান উড়বে এবং রাত ১১টা ৪০ মিনিটে কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। সেখান থেকে তিনি সরাসরি নিউ টাউনের নির্দিষ্ট হোটেলে পৌঁছে যাবেন এবং সেখানেই রাত্রিবাস করবেন। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকতে পারেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-সহ দলের একাধিক শীর্ষনেতা। ‘জ়েড প্লাস’ নিরাপত্তায় থাকা শাহের এ সফর ঘিরে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে রাজ্য পুলিশ ও কলকাতা পুলিশকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও সহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, শনিবার বেলা ১২টা নাগাদ শুরু হবে তাঁর কর্মসূচি। নিউ টাউনের ওই হোটেলেই একটি সাংবাদিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে, যা চলবে প্রায় বেলা ১টা পর্যন্ত। সেখানেই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করা হবে বিজেপির বহুল আলোচিত ‘অভিযোগপত্র’, যাকে দলের অনেকেই কার্যত ‘শ্বেতপত্র’ বলেই উল্লেখ করছেন। এরপর বেলা ১টা ৫ মিনিট নাগাদ হোটেল ছেড়ে তিনি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেবেন এবং বেলা ১টা ২০ মিনিটের বিমানে দিল্লি ফিরে যাবেন। বিজেপি সূত্রে খবর, ‘অভিযোগপত্র’টি প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ পাতার একটি বিস্তৃত নথি, যার মলাটেই ‘অশান্ত বাংলা’র চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গত পনেরো বছরে মমতা ব্যানার্জি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতির যে চিত্র, সেটিকে বিভিন্ন পরিসংখ্যান, ঘটনা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, প্রশাসন থেকে আইনশৃঙ্খলা—মোট ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করে রাজ্যের ‘অবনতি’র অভিযোগ তুলে ধরতে চলেছে বিজেপি। শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন, এই নথিতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি-কেও একই সঙ্গে কাঠগড়ায় তোলার প্রস্তুতি রয়েছে বলেই ইঙ্গিত মিলছে।
‘অভিযোগপত্র’-এ স্থান পেয়েছে একাধিক বহুল আলোচিত ইস্যুও। নিয়োগ দুর্নীতি, শিক্ষক কেলেঙ্কারি, কয়লা ও বালি পাচার, চিটফান্ড জালিয়াতি; এই সমস্ত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে বলেই দাবি গেরুয়া শিবিরের। পাশাপাশি ২৫ লক্ষ ভুয়ো জব কার্ডের অভিযোগ, মিড-ডে মিল প্রকল্পে প্রায় ১০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, এবং প্রায় ১৭,৫২০ কোটি টাকার রোজভ্যালি কেলেঙ্কারির উল্লেখও থাকতে পারে বলে জানা গিয়েছে। শুধু আর্থিক দুর্নীতি নয়, নারী নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আঘাত, এ সমস্ত বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে নথিতে।
এছাড়া আনন্দপুর কাণ্ড, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাধা, সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতার না বসানো, এমনকি জেলায় জেলায় বোমা তৈরির কারখানার অভিযোগও থাকতে পারে ‘চার্জশিট’-এ। সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) নিয়েও রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হতে পারে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, নির্বাচনের আগে জনমত গঠনে এই নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। শাহের এই সংক্ষিপ্ত সফর তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলেরই একটি সুস্পষ্ট প্রকাশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গবিজেপির নির্বাচনী কৌশলে এই ‘অভিযোগপত্র’ গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দলীয় সূত্রে স্পষ্ট, আগে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ‘রোগ’ চিহ্নিত করা হবে, তারপর প্রকাশ করা হবে ‘নিরাময়ের পথ’। অর্থাৎ, এই নথি প্রকাশের পরই আসবে দলের নির্বাচনী ইস্তাহার বা ‘সঙ্কল্পপত্র’। জানা গিয়েছে, রাজ্যের প্রায় ১০ হাজার বিশিষ্টজনের মতামত নিয়ে সেই ইস্তাহার তৈরি করা হচ্ছে। আগামী ৫ এপ্রিল তা প্রকাশিত হতে পারে। এদিকে এখনো সব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারেনি বিজেপি। এখনো ১৯টি আসন বাকি রয়েছে। তবে নির্বাচনী প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই যে চূড়ান্ত পর্যায়ে তা পদে পদে বুঝিয়ে দিচ্ছে গেরুয়া শিবির।
২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের পর্যালোচনা প্রায় সম্পূর্ণ, যার মধ্যে ১৮০টি কেন্দ্রে সর্বভারতীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ৩০ মার্চ থেকে তারকা প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার কথাও জানা গিয়েছে। যাঁদের আসন পরিবর্তন করা হয়েছে, তাঁদের ‘প্রত্যাখ্যাত পর্যটক’ বলেও অভিহিত করা হচ্ছে দলীয় অন্দরে। রামনবমী উদ্যাপনকে ঘিরেও প্রচারের কৌশল নিয়েছে গেরুয়া শিবির। স্থানীয় ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনকে সামনে রেখে ধাপে ধাপে নির্বাচনী প্রচার জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ‘ভয় বনাম ভরসা’— এমন স্লোগানকে সামনে রেখেই রাজ্যে রাজনৈতিক লড়াইকে নতুন মাত্রা দিতে চাইছে বিজেপি।
❤ Support Us






