- এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
- জুলাই ৪, ২০২৫
ডিএনএ-র সন্ধানে মিলে যায় ইতিহাসের ধারা! প্রাচীন মিশরীয় ব্যক্তির জিনোমে মেসোপটেমিয়ার রক্ত
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার অতীতকে জীবন্ত করে তোলে, তেমনি জিনতাত্ত্বিক গবেষণা অতীতের আরো গভীরে প্রবেশ করার গোপন দরজা খুলে দেয়। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—প্রাচীন মিশরের এক ব্যক্তির সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ থেকে জানা যাচ্ছে, তাঁর এক-পঞ্চমাংশ পূর্বপুরুষের উৎস মেসোপটেমিয়া অঞ্চল। ফলে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে সাংস্কৃতিক সংযোগ ও আন্তঃসম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে বসবাসকারী ওই ব্যক্তি ছিলেন মিশরের ওল্ড কিংডম যুগের মানুষ, তিনি পিরামিড নির্মাণের প্রারম্ভিক সময়ে বাস করতেন। ওই সময় মিশর ও মেসোপটেমিয়া—উভয়ই ছিল সভ্যতার সূতিকাগার। ভাষা, ধর্ম, শিল্পকলা ও প্রযুক্তিতে একে অপরকে প্রভাবিত করেছে বহু উপায়ে।
গবেষকরা এই তথ্য পেয়েছেন ২টি দাঁতের শিকড় থেকে সংগৃহীত ডিএনএ-এর মাধ্যমে। ১৯০২ সালে মিশরের বেনি হাসান গ্রামে নুয়াইরাত এলাকার এক শিলাকাটা সমাধিতে মাটির একটি সিল পাত্রে পাওয়া যায় এই ব্যক্তির দেহাবশেষ। গবেষকরা জানাচ্ছেন, ওই ব্যক্তির জিনগত প্রভাবের ৮০ শতাংশ মিশরের স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত, তবে বাকি ২০ শতাংশ জিনগত সূত্র মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের। অর্থাৎ, তিনি শুধু মিশরের সন্তান ছিলেন না, বরং প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার সঙ্গেও তাঁর পূর্বপুরুষদের সম্পর্ক ছিল। এই তথ্য প্রাচীন দুই সভ্যতার মধ্যে বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং সম্পর্কের জোরালো প্রমাণ দিচ্ছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে, প্রাচীন মিশরীয়দের ডিএনএ গবেষণা সম্ভব হয়নি, কারণ মিশরের গরম আবহাওয়া ডিএনএ দ্রুত নষ্ট করে দেয়। কিন্তু এই ব্যক্তির মৃতদেহের শিলাকাটা সমাধি এবং মাটির সিল পাত্রে কবর দেওয়ার কারণে তার ডিএনএ কিছুটা সংরক্ষিত ছিল। এই ব্যক্তির কঙ্কালের প্রায় ৯০ শতাংশ সংরক্ষিত ছিল। তাঁর বয়স ছিল আনুমানিক ৬০ বছর, তাঁর হাড়ে কিছু বয়ঃসন্ধির রোগ, যেমন অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের চিহ্ন ছিল বলে জানা যাচ্ছে।ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের গবেষকপন্টুস স্কোগলুন্ড বলেন, ‘মিশরে প্রাচীন ডিএনএ উদ্ধার করা এত কঠিন ছিল, যে আমরা একে এক ধরনের আশ্চর্যজনক সাফল্য হিসেবে অভিহিত করছি। গবেষণা শুরুর সময়, আমরা জানতাম না, এ ধরনের সাফল্য আসবে।’
গবেষকরা বলছেন, প্রাচীন মিশরের ওই সময়কাল ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল। সে সময় মিশরীয়রা মেসোপটেমিয়া থেকে নতুন শিল্পকৌশল আর প্রযুক্তি গ্রহণ করে। প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ার মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে আরো অনেক দিক থেকেই। দুই সভ্যতার মধ্যে শিল্পকলা, স্থাপত্য, ধর্মীয় উপাদান, এমনকি শিল্প সামগ্রীতে একে অপরের প্রভাব দেখা যায়। নীল রত্নপাথর ল্যাপিস ল্যাজুলি, মেসোপটেমিয়া থেকে মিশরে আমদানি করা হয়েছিল, ফ্যারাওয়ের দেশের ধনীরা ব্যাপকভাবে এগুলি ব্যবহার করতেন। এ সময়েই সেখানে পিরামিড নির্মাণ শুরু হয়েছিল, সেখানে মেসোপটেমিয়ার প্রভাব স্থাপত্য ও শিল্পের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে মেসোপটেমিয়া থেকে আগত কুমোর চাকা মিশরে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যা মিশরীয়দের শিল্পকৌশলে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
গবেষকরা আরও জানাচ্ছেন, সমাধিস্থ ওই ব্যক্তি সম্ভবত একজন কুমোর ছিলেন। তাঁর হাড়ের গঠন ও পেশির চিহ্ন সে কথাই বলছে। অথচ তাঁর সমাধি ছিল শিলাকাটা এক অভিজাত কক্ষে, যা সচরাচর উচ্চবর্গীয়দের জন্যই সংরক্ষিত ছিল। তাহলে কি এই ব্যক্তি ছিলেন সাধারণ কোনো কুমোর নন? হতে পারে তিনি ছিলেন রাজদরবারের নিপুণ কারিগর, যাঁর শিল্পকৌশলে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে এমন সম্মানজনক দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মৃৎশিল্প—যা মেসোপটেমিয়ার কুমোর চাকার মাধ্যমে মিশরে প্রবেশ করেছিল—সে সময়ে শুধু ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরি নয়, বরং সামাজিক মর্যাদারও একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির জীবনী আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—শ্রমজীবী হলেও দক্ষতায় একজন ব্যক্তি কীভাবে সমাজে মর্যাদা অর্জন করতে পারেন। এ আবিষ্কার আমাদের ইতিহাস চর্চার অন্য এক পাঠও দেয়। ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাহদের নয়, শ্রমিক, কারিগর, শিল্পীরও। আমরা যখন অতীতকে বুঝতে চাই, তখন প্রতিটি মানবজীবনই একটি মহাকাব্য। সেই কাহিনি তুলে ধরার দায়িত্ব ইতিহাসবিদের, প্রত্নতাত্ত্বিকের, আর আজকের দিনে—জিনতত্ত্ববিদেরও। মিশরীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতার মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক ইতিহাস আরো গুরুত্ব সহকারে গবেষণা করা প্রয়োজন।
❤ Support Us







