Advertisement
  • এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
  • জুন ২৫, ২০২৫

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কপিরাইটের নতুন মেরুকরণ ! কী রায় মার্কিন আদালতের ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কপিরাইটের নতুন মেরুকরণ ! কী রায় মার্কিন আদালতের ?

ইন্টারনেটের যুগে তথ্যের মুক্ত প্রবাহে জ্ঞান যেমন বিস্তার লাভ করে, তেমনই প্রশ্ন ওঠে, এই প্রবাহে কাদের অধিকার কতখানি ? সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত যে রায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা অ্যানথ্রোপিককে লেখকদের বই প্রশিক্ষণের জন্য ‘ন্যায্য ব্যবহার’-এর সুযোগ দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রযুক্তি শিল্পের জন্য বড়ো জয়। কিন্তু এই রায়ে সৃষ্টিশীলতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্নচিহ্ন উঠে গেল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সংস্থা অ্যানথ্রোপিক-এর বিরুদ্ধে দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার শুনানিতে, সান ফ্রান্সিসকোর মার্কিন জেলা বিচারক উইলিয়াম আলসাপ রায় দিয়েছেন যে, লেখক আন্দ্রেয়া বার্টজ, চার্লস গ্রেবার এবং কার্ক ওয়ালেস জনসনের বই পড়ে অ্যানথ্রোপিক তাদের ‘ক্লড’ নামের ভাষা মডেলকে প্রশিক্ষিত করেছিল ভিন্ন কিছু সৃষ্টির জন্য, অনুকরণ বা প্রতিস্থাপনের জন্য নয়। লেখকদের অনুমতি ছাড়াই তাদের বইগুলো ব্যবহার করে এআই সিস্টেমকে প্রশিক্ষণ দেওযইয়া যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট আইনের লঙ্ঘন নয়। একই সঙ্গে বিচারক স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, ওই বইগুলিকে ‘কেন্দ্রীয় তথ্যাগারে’ জমা করে রাখার যে পদ্ধতি, তা কপিরাইট আইনের চোখে বৈধ নয়। সেই অংশে সংস্থার আচরণ কপিরাইট লঙ্ঘনের শামিল বলে মন্তব্য আদালতের।

আদালতের ব্যাখ্যার মধ্যে যুক্তির পরিসর থাকলেও, তা নিছক আইনি কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়— এর সামাজিক ও নৈতিক প্রেক্ষিত অনুধাবন করা জরুরি। নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে— নির্মাতার অনুমতি ছাড়া, পারিশ্রমিক ছাড়া, যাঁদের মেধা ও শ্রমে তৈরি কনটেন্ট থেকে এআই সংস্থাগুলি যদি ‘উন্নত প্রযুক্তি’ নির্মাণ করে, তবে সেই প্রযুক্তির মূল্যবৃদ্ধিতে সৃষ্টিকর্তাদের কী ভূমিকা স্বীকৃত হবে ? আর তা যদি না হয়, তবে একে কি বলা যায় প্রযুক্তি-সমর্থিত বৈধ লুন্ঠন? লেখকদের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ‘এআই সংস্থাগুলি পেশাদার লেখকদের কনটেন্ট নিয়ে প্রথমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, তারপর সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আবার লেখকের সৃষ্টির প্রতিযোগী হিসেবে বাজারে হাজির হচ্ছে— এতে লেখকদের পেশার অবলুপ্তি ঘটবে।’ এই দাবির উপর ভিত্তি করেই লেখকেরা গত বছর অ্যানথ্রোপিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আমাজন ও অ্যালফাবেট সমর্থিত কোম্পানিটি অনুমতি বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই তাদের বইয়ের পাইরেটেড সংস্করণ ব্যবহার করে ক্লডকে মানব প্রম্পটে সাড়া দিতে প্রশিক্ষিত করেছে। এআই কোম্পানিগুলোর দাবি, তারা কপিরাইটধারী তথ্য ব্যবহার করে নতুন, রূপান্তরধর্মী কনটেন্ট তৈরি করছে, যা ন্যায্য ব্যবহারের আওতায় পড়ে। তাদের মতে, যদি কপিরাইট নিয়মে মালিকদের অর্থ প্রদান করতে বাধ্য করা হয়, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিল্পের বিকাশে বাধা আসবে।

এই বিতর্কে পিছিয়ে নেই ভারতও। দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম সংগঠন, ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি কেন্দ্র সরকারের কাছে তদবির করেছে, অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন কনটেন্ট এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে, এধরণের কাজকে কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা উচিত। ভাষা মডেল চালিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইন্টারনেটের কনটেন্টের উপর নির্ভর করে — আর এর বড় অংশই পেশাদার সাংবাদিকদের তৈরি, সম্পাদিত এবং প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন। এই সেক্টরের শ্রম এখন কিছু গ্রাফিক্স বর্তমানে প্রসেসিং ইউনিটে পরিণত হয়েছে, যেগুলো কয়েক সেকেন্ডে মানব-মানবোচিত কনটেন্ট তৈরি করছে। বিশ্ব জুড়ে সংবাদ সংস্থাগুলির এই আশঙ্কা নতুন নয়। অতীতে গুগল ও ফেসবুকের মতো সংস্থাগুলির প্রভাব সংবাদ শিল্পকে যেভাবে কোণঠাসা করেছে, এআই সে সংকটকে প্রকট করেছে বহুগুণে। আজ এআই মডেলগুলি সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন পড়ে শেখে, সারাংশ তৈরি করে দেয়, এমনকি পাঠকের প্রশ্নের উত্তরও দেয়— অথচ যাঁদের শ্রমে সেই সংবাদ তৈরি, তাঁরা নিঃস্বার্থ দাতা হয়ে থাকেন। একদিকে প্রযুক্তির ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠছে, অন্যদিকে সংবাদ শিল্প অস্তিত্বের লড়াইয়ে।

অতীতে যেমন ডিজিটাল রূপান্তর এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো বিজ্ঞাপন এবং পাঠক দুটোই কাড়ত, তেমনি এখন এআই প্রযুক্তি তাদের কনটেন্ট থেকে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছে, সম্মতি বা লভ্যাংশ দেওয়া ছাড়াই। সংবাদ প্রকাশকদের নিজস্ব অধিকার আছে নির্ধারণ করার যে, কে তাদের কনটেন্ট ব্যবহার করতে পারবে, এবং কীভাবে তারা এআই যুগ থেকে উপকৃত হবেন। এই অবস্থায় কেবলমাত্র মার্কিন আইন বা আদালতের রায়ই যথেষ্ট নয়। ভারতে যেমন ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন কপিরাইট ও এআই বিষয়ে সরকারের গঠিত কমিটিতে নিজেদের উদ্বেগ জানিয়েছে, তেমনি অন্য দেশগুলোতে আরো জোরদার কণ্ঠে প্রশ্ন তুলতে হবে। সরকারকে বুঝতে হবে, কনটেন্ট শুধু তথ্য নয়— এটি পেশা, শিল্প, এবং বহু মানুষের জীবিকার উৎস। একটি প্রযুক্তির দায় শুধু তার উদ্ভাবকের নয়, বরং সে প্রযুক্তি কীভাবে সমাজকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে জবাবদিহি থাকা দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি মানুষের কাজের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহায়ক হতে চায়, তবে তাকে তার মৌলিক ভিত্তির প্রতি ন্যায্য হতে হবে। লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, গবেষক— এঁদের তৈরি জ্ঞানের ব্যবহার যদি বিনা অনুমতিতে হয়, তবে প্রযুক্তি যতই ‘রূপান্তরধর্মী’ হোক না কেন, তা সৃষ্টিশীলতার অপমান। ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন দাবি তুলেছে, সরকার যেন এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, যাতে কনটেন্ট নির্মাতারা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পায়, এবং তাদের অধিকার রক্ষা হয়। এআই যুগে তথ্য ও জ্ঞানের ব্যবহার নিয়ে নতুন নীতির প্রয়োজন। কপিরাইট, সম্মতি, ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্নগুলোকে পাশ কাটিয়ে, উন্নয়নের নামে একপাক্ষিক সুবিধা যদি গ্রহণ করা হয়, তবে তা কেবল অন্যায় নয়, দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনকও। দেশের ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যমের উন্নয়ন আর অস্তিত্বরক্ষায় এ দাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বরিষ্ট সাংবাদিক ও সংবাদ সংস্থাগুলি।

তাই আজ প্রশ্ন প্রযুক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে নয়— বরং প্রশ্ন ন্যায়বিচারের। সৃষ্টিকে সম্মান না করলে, প্রযুক্তির গতি যতই অগ্রসর হোক না কেন, সমাজ পিছিয়ে পড়ে। সময় এসেছে, সরকার ও সংস্থাগুলি একসঙ্গে বসে স্থির করুক, এআই-এর যুগে কাদের কণ্ঠকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, কাদের নিঃশব্দে হারিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। ভারতের মত গণতান্ত্রিক দেশে, যেখানে সংবাদপত্রের ভূমিকা শুধু তথ্য পরিবেশন নয়, বরং জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে সংবাদ কনটেন্ট ব্যবহারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আর সেই প্রশ্নের জবাব না মিললে, বিপুল বিনিয়োগের এআই-র গতি থামবে না ঠিকই, তবে তার সঙ্গে ধীরে ধীরে স্তব্ধ হতে পারে পেশাদার সৃষ্টিশীলতার স্বরও।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!