- দে । শ
- মে ২৯, ২০২৬
সোনম ওয়াংচুকের মন্তব্য অবাঞ্ছিত, কঠোর বার্তা লাদাখের উপরাজ্যপালের
লাদাখকে মণিপুরের সঙ্গে তুলনা করে কি পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ করে তুলতে চাইছেন সোনম ওয়াংচুক ? জনপ্রিয় পরিবেশকর্মী তথা আন্দোলনের মুখকে এমন প্রশ্নই ছুড়ে দিয়েছেন লাদাখের উপরাজ্যপাল বিনাই কুমার সাক্সেনা। মঙ্গলবার এক্স হ্যান্ডলে প্রকাশিত এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশ কখনো মিথ্যা প্রচার বা জনতাকে উত্তেজিত করার লাইসেন্স হতে পারে না।’ সে সঙ্গে সোনম ওয়াংচুককে ‘বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক বয়ান’ থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। এক সাক্ষাৎকারে লাদাখের আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুক দাবি করেছিলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরের হিংসাত্মক ঘটনার পর তাঁর আশঙ্কা হয়েছিল, ‘লাদাখ আর একটি মণিপুর হয়ে উঠতে পারে।’ এ মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে প্রবল বিতর্কের জন্ম দেয়। আর তার পরেই মঙ্গলবার রাজভবনে ওয়াংচুক ও তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো-র সঙ্গে বৈঠকে বসেন লাদাখের লেফটেন্যান্ট গভর্নর বিনয় কুমার সাক্সেনা।
বৈঠকের পরে সাক্সেনা জানান, ‘সোনম ওয়াংচুক ও শ্রীমতী গীতাঞ্জলি আংমোর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও রাজনৈতিক সংলাপের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন— এ বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।’ কিন্তু এই সৌজন্যের আবরণের মধ্যেই ছিল তীব্র কটাক্ষ। তিনি আরও লেখেন, ‘আমি ওয়াংচুককে সতর্ক করেছি, যেন তিনি এমন কোনো বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক বয়ান না তৈরি করেন, যা জনপরিসরের আলোচনাকে দূষিত করে। গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশকে মিথ্যা প্রচার ও জনতাকে উত্তেজিত করার অধিকার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।’ সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, উপরাজ্যপালের দাবি করছেন, বৈঠকে ওয়াংচুক না কি স্বীকার করেছেন, লাদাখের পরিস্থিতিকে মণিপুরের সঙ্গে তুলনা করা ‘ভুল’ ছিল। যদিও এ নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি ওয়াংচুক। তাঁর দফতর থেকে শুধু জানানো হয়েছে, এই মুহূর্তে এ বিষয়ে তাঁদের কিছু বলার নেই।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে লেহ-তে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল পরিস্থিতি। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন বহু মানুষ, তাঁদের মধ্যে পুলিশকর্মীরাও ছিলেন। ওই ঘটনার পর লাদাখের আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। রাজ্যের মর্যাদা, সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্তি, জমি ও চাকরিতে সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে অধিক ক্ষমতা— একাধিক দাবিকে সামনে রেখে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে আসছে লেহ অ্যাপেক্স বডি এবং কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স। আর আন্দোলনের মুখ হিসেবেই জাতীয় স্তরে পরিচিতি পেয়েছেন ওয়াংচুক। এক পর্যায়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘ কারাবাস কাটিয়ে সম্প্রতি তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
জেলমুক্তির পরেও ওয়াংচুকের বহু অবস্থানে অস্বস্তিতে পড়েছে কেন্দ্র সরকার। বিতর্কিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-র প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি। এমনকি নিজেকে ‘ককরোচ দলের সদস্য’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দেশের তরুণেরা রাস্তায় নেমে হিংসার পথ না বেছে ‘সৃজনশীল অভিব্যক্তি’-র মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছে, এটাই গণতন্ত্রের শক্তি। ওয়াংচুক বলেছিলেন, ‘তরুণদের বার্তাটা বোঝা দরকার, বার্তাবাহককে দয়া করে হত্যা করবেন না। তরুণেরা পাথর ছুড়ছে না, সৃজনশীল ভাবে নিজেদের কথা বলছে। এটাই আমাদের বিশ্বগুরু হওয়ার পরিচয়।’ তিনি আরও সতর্ক করেছিলেন, তরুণদের কণ্ঠরোধ করলে ক্ষোভ অন্য রূপ নিতে পারে। নেপালে ইন্টারনেট বন্ধের পরে যেভাবে হিংসা ছড়িয়েছিল, তার উদাহরণও টেনেছিলেন তিনি।
কিন্তু এদিনের উপরাজ্যপালের বক্তব্যে স্পষ্ট, কেন্দ্র সোনমের অবস্থানকে ভাল চোখে দেখছে না। সাক্সেনার দাবি, বৈঠকে ওয়াংচুক না কি বলেছেন, তিনি ‘ককরোচ পার্টির উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত নন’ এবং সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাদের উদ্দেশ্য বুঝে প্রয়োজনে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবেন। এ দিন উপরাজ্যপাল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন— পর্যটন। তাঁর মতে, ‘বারবার মিছিল ও আন্দোলন লাদাখের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে পর্যটন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা এ অঞ্চলের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।’ উল্লেখযোগ্য ভাবে, এখনই লাদাখে পর্যটনের মরসুম শুরু হয়েছে। হোটেল, হোমস্টে, ট্যাক্সি ব্যবসা— সব কিছুই এ সময়ের পর্যটকের উপর নির্ভরশীল। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে প্রশাসনের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
যদিও একই সঙ্গে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির কথাও সামনে এনেছেন লাদাখের উপরাজ্যপাল। তাঁর দাবি, ওয়াংচুক ‘হিম সরোবর’ প্রকল্প, ইগু ফে ক্যানালের পুনরুদ্ধার, মাহে-টোপকো ক্যানাল নির্মাণ এবং বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রশংসা করেছেন। জল সংরক্ষণ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের মতো প্রকল্পে কেন্দ্র যে সক্রিয়, তা বোঝাতেই প্রকল্পের কথা উল্লেখ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। অন্যদিকে, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই গত শুক্রবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন লাদাখ আন্দোলনের নেতৃত্বরা। আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির দাবি, কেন্দ্র নীতিগত ভাবে সম্মত হয়েছে যে, লাদাখের জন্য এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে, যেখানে আইনসভা, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকবে। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল স্তরের আইনসভা গঠনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। যদিও এ পর্যন্ত এই বিষয়ে কেন্দ্রের তরফে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। ফলে আন্দোলন থামবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
❤ Support Us





