- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ৯, ২০২৬
অসম, কেরালা, পুদুচেরি— তিন রাজ্যে ‘রেকর্ড’ ভোটদান । বিক্ষিপ্ত হিংসা খবর, তবু শান্তিপূর্ণ ভোটের দাবি কমিশনের
উত্তর-পূর্বের অসম থেকে দক্ষিণের কেরালা ও পুদুচেরি— তিন ভৌগোলিক প্রান্তে বৃহস্পতিবার একযোগে বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হতেই গণতন্ত্রের উৎসবে সামিল হন লক্ষ লক্ষ ভোটার। সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া ভোটপর্বে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুথমুখী মানুষের ভিড় স্পষ্ট করে দিল, এ বারও ভোটকে কেন্দ্র করে আগ্রহের ঘাটতি নেই।
এক দিকে রেকর্ড ছোঁয়া ভোটের হার, অন্য দিকে বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবর— এই দুইয়ের মাঝেই শেষের পথে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ভোটের হারে এগিয়ে পুদুচেরি (৮৬.৯২ শতাংশ), তার পরেই অসম (৮৪.৪২ শতাংশ)। তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে কেরলা— সেখানে ভোট পড়েছে ৭৫.০১ শতাংশ। এদিন, কোথাও মেঘলা আকাশ, কোথাও বা বৃষ্টির ছিটেফোঁটা, তবু প্রতিকূল আবহাওয়াকেও কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়েছেন নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে।
ভোটের দিনেই দেশবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সমাজমাধ্যমে পৃথক পোস্টে তিনি অসম, কেরল ও পুদুচেরির ভোটারদের আরও বেশি সংখ্যায় বুথে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। বিশেষ করে মহিলা ও যুব ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর জোর দিয়ে তাঁর বার্তা ছিল, ‘প্রতিটি ভোটই গুরুত্বপূর্ণ।’ অসমে এ বার ভোটের লড়াই বহুমাত্রিক। ১২৬টি আসনে ৭২২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা-র নেতৃত্বে বিজেপি ও এনডিএ শিবির উন্নয়নকে হাতিয়ার করে ভোট চাইছে। অন্য দিকে, গৌরব গগৈ-র নেতৃত্বে কংগ্রেস শিবির মরিয়া ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে।
এ বার অসমে এক দফাতেই ভোট হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল কড়া। স্পর্শকাতর বুথগুলিতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। সকাল থেকেই রাজ্যের ৩৫টি জেলায় ৩১ হাজারের বেশি বুথে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। আপাত শান্তিপূর্ণ ভোট হলেও, বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবর এসেছে। অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। গ্রেফতার করা হয়েছে ৭ জনকে। অভিযোগ, এক কংগ্রেস প্রার্থী বুথে ইভিএম ভাঙচুরের চেষ্টা করেন, তার জেরেই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে দুই রাজনৈতিক শিবিরের সমর্থকদের মধ্যে।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, এই নির্বাচন শুধুমাত্র রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং এটি অসমের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ভূমি রক্ষার এক আন্দোলন। তিনি জানান, বহু বুথে ভোটদানের হার ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা এককথায় ‘ঐতিহাসিক’। ভাষা ও জাতিগত বিভাজন পেরিয়ে মানুষ একজোট হয়ে অসমের পরিচয় রক্ষায় এগিয়ে এসেছে বলেও দাবি তাঁর। ২০২১ সালে অসমে মোট ভোট শতাংশ ছিল ৮২.০২ শতাংশ, এবার তা ২.৪০ শতাংশ বেড়েছে, এ সংখ্যাই ক্ষমতা দখলের সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের। ডিব্রুগড়ে ভোট দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল দাবি করেছেন, ‘মিত্রদের সঙ্গে আমরা প্রায় ১০০টি আসনে জিতব।’ পাল্টা আত্মবিশ্বাস শোনা গিয়েছে গৌরব গগৈয়ের গলায়ও। তাঁর দাবি, ‘মানুষ নির্ভয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করছেন, আমরা এক নতুন অসমের দিকে এগোচ্ছি।’
কেরলে বরাবরের মতোই রাজনৈতিক লড়াই আবর্তিত হচ্ছে শাসক এলডিএফ ও বিরোধী ইউডিএফ-কে কেন্দ্র করে। ১৪০টি আসনে ৮৮৩ জন প্রার্থী এবং প্রায় ২.৭১ কোটি ভোটার— সংখ্যার বিচারে এক বিশাল সমীকরণ। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন-এর নেতৃত্বে এলডিএফ উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে সামনে রেখে ভোট চাইছে। বিরোধীরা পাল্টা তুলছে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। পিনারাই বিজয়ন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ‘মিথ্যা প্রচার করে এলডিএফকে হারানো যাবে না। গত এক দশক ধরে আমরা মানুষের পাশে থেকেছি।’ অন্য দিকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে কেরলবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিয়ে বলেছেন, “গত ১০ বছরে মানুষ বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা দেখেছেন, এ বার এমন সরকার বেছে নিন যারা মানুষের কথা শোনে।”
পুদুচেরিতে ৩০টি আসনে প্রায় ৯.৫ লক্ষ ভোটার নির্ধারণ করবেন ২৯৪ জন প্রার্থীর ভাগ্য। মুখ্যমন্ত্রী এন. রঙ্গাসামি-র নেতৃত্বে এনডিএ জোট ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া। পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে কংগ্রেস-ডিএমকে জোট। এ দিন ভোটগ্রহণ শেষের পর বহু জায়গাতেই ইভিএম ও ভিভিপ্যাট সিল করে নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে, ভোটের অঙ্ক যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, ৩ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন কেবল আঞ্চলিক সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও অনেকটাই নির্ভর করতে পারে এই ফলাফলের উপর। এখন নজর একটাই, আগামী ৪ মে, যখন ইভিএম খুলে প্রকাশ্যে আসবে জনতার রায়।
❤ Support Us






