- দে । শ
- মে ১১, ২০২৬
৪২ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস ! অসমের নতুন মন্ত্রিসভায় শিলচরের প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলল বিডিএফ
অসমের নির্বাচনে আরও একবার বিপুল জনসমর্থনে জিতেছে বিজেপি। ১২ মে নতুন সরকার গঠন। তার আগে, নতুন মন্ত্রিসভায় শিলচরের বিধায়ককে অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবি তুলল বরাক ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (বিডিএফ)। রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে সংগঠনের মুখ্য আহ্বায়ক প্রদীপ দত্ত রায় বলেন, বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক গুরুত্ব ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে এ বার শিলচরকে মন্ত্রিসভায় যথাযথ প্রতিনিধিত্ব দেওয়া উচিত।
নতুন সরকারকে অগ্রিম শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রদীপ দত্ত রায় এদিন বলেছেন, বরাক উপত্যকা তথা অসমের প্রায় ৯০ লক্ষ বাঙালির বহুদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলির সমাধানে নতুন সরকার আন্তরিক ও কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলেই তাঁদের আশা। তবে সে আশার পাশাপাশি তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকৃত পরীক্ষা হবে মন্ত্রিসভা গঠনের সময়। তাঁর কথায়, বারবার প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবে শিলচরের প্রতি অবহেলার ইতিহাস আজও কাটেনি। এ প্রসঙ্গেই তিনি তুলে ধরেন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক বঞ্চনার পরিসংখ্যান। প্রদীপবাবুর বক্তব্য, গত ৪২ বছর ধরে শিলচর থেকে নির্বাচিত কোনো বিধায়ক অসমের মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস, অগপ কিংবা বিজেপি— দল বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু শিলচরের ভাগ্য বদলায়নি। ১৯৮৩ সালে জগদীশ চৌধুরী শিলচর থেকে শেষবারের মতো মন্ত্রী হয়েছিলেন। তারপর চার দশকেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। কিন্তু রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হওয়া সত্ত্বেও শিলচর আর কখনো ন্যায্য মর্যাদা ফিরে পায়নি।
বিডিএফ-এর মতে, এ পরিসংখ্যান শুধুমাত্র সংখ্যার হিসাব নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বহু বছরের ক্ষোভ, উপেক্ষা এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি। বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক মানচিত্রে শিলচর শুধু একটি শহরের নাম নয়, বরং এ অঞ্চলের প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। অথচ সিদ্ধান্তগ্রহণের সর্বোচ্চ স্তরে শহরের কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত। শিলচরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রদীপ দত্ত রায় বলেন, জনসংখ্যার বিচারে এটি অসমের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। শুধু জনসংখ্যা নয়, ইতিহাসের দিক থেকেও শিলচরের গুরুত্ব অসাধারণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের গোড়াপত্তন হয়েছিল এই শহর থেকেই। ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই চা শিল্পের বিকাশ ঘটে। যুদ্ধকালীন প্রয়োজনের জন্য এখানে গড়ে ওঠে সামরিক বিমানবন্দর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও শিলচরের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রবাহে শিলচরের ভূমিকা তাই উপেক্ষা করার মতো নয়।
বিডিএফের অভিযোগ, ঐতিহাসিক ও কৌশলগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনায় শিলচর ক্রমশ তার প্রাপ্য মর্যাদা হারাতে বসেছে। ক্ষোভের সুরে প্রদীপ দত্ত রায় বলেছেন, অবহেলার ধারাবাহিকতায় শহরটির কৌলিন্য ক্ষয়ে গিয়েছে। মানুষের মধ্যে অনুভূতি তৈরি হয়েছে যে, রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক গুরুত্বকে এখনো যথাযথ মর্যাদা দিতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে এ বারের নির্বাচনের ফলকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই দেখছে বিডিএফ। প্রদীপ দত্ত রায় স্মরণ করিয়ে দেন, বিজেপি শাসনামলেও এর আগে দিলীপকুমার পাল এবং দীপায়ন চক্রবর্তী শিলচর থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হলেও তাঁদের কাউকেই মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়নি। ফলে শুধু নির্বাচনী জয় নয়, প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বাস্তব পদক্ষেপই এখানে মূল বিষয়। তিনি আরও জানান, অসমে বিজেপির উত্থানের অন্যতম স্থপতি ছিলেন প্রয়াত বিমলাংশু রায়। এ বার তাঁর পুত্র শিলচর থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তাই বিডিএফের দাবি, বরাক উপত্যকার ভোটারদের প্রতি রাজনৈতিক সম্মান প্রদর্শনের স্বার্থে হলেও নতুন মন্ত্রিসভায় শিলচরের বিধায়ককে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। সংগঠনের মতে, তাঁদের এ দাবি অতিরিক্ত সুবিধা প্রাপ্তির জন্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলার ন্যায্য সংশোধন।
প্রদীপ দত্ত রায়ের বক্তব্যে শুধু মন্ত্রিত্বের দাবি নয়, বরং বৃহত্তর বাঙালি সমাজের উদ্বেগও উঠে আসে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এখনো অসমের বহু বাঙালিকে ‘ডি-ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত থাকতে হবে? কেন জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি-সংক্রান্ত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে থাকবে? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ লক্ষ বাঙালি হিন্দুসহ ১৯ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পায়নি। এর ফলে বহু মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা এবং প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।কর্মসংস্থানের প্রশ্নেও তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর প্রশ্ন, কেন বাঙালি যুবক-যুবতীরা পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন? কেন বরাক উপত্যকার সরকারি প্রশাসনে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব এত নগণ্য থাকবে? তাঁর মতে, এ প্রশ্নগুলি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতার প্রতিফলন।
এ দিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও টেনে আনেন প্রদীপ দত্ত রায়। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের পরে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বাঙালিদের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানের বিষয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে একই সঙ্গে অসমের ৯০ লক্ষ বাঙালির সমস্যার প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলেই তাঁর দাবি। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের উন্নয়নের কথা বলা হলে অসমের বাঙালিদের উদ্বেগ ও বঞ্চনার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। বিডিএফের দাবি, নতুন মন্ত্রিসভায় শিলচর থেকে একজন প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি শুধু প্রতীকী পদক্ষেপ হবে না। বরং তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগ্রহণের স্তরে বরাক উপত্যকার বাস্তব সমস্যাগুলিকে সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করবে। নাগরিকত্ব, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক অংশীদারিত্ব, অবকাঠামো, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের মতো প্রশ্নগুলিকে তখন নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আরও জোরালোভাবে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
শিলচরের রাজনৈতিক ইতিহাসও এ দাবিকে ন্যায্যতা দিচ্ছে। ১৯৮৫ সালের পর থেকে শিলচরের কোনো বিধায়ক মন্ত্রী না হওয়ায়, দীর্ঘদিন ধরে জনমানসে ক্ষোভ আর উপেক্ষার বোধ পুঞ্জিভূত হয়েছে । বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, কিন্তু মন্ত্রিত্বের ক্ষেত্রে শহরটিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। কখনো দলীয় সমীকরণ, কখনও আঞ্চলিক ভারসাম্যের যুক্তি দেখিয়ে শিলচরের দাবি পিছনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সদ্য নির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক ডাঃ রাজদীপ রায়ের নাম স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় উঠে এসেছে। প্রায় ৫৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে তাঁর জয় অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই ফল শুধু নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং শিলচরের মানুষের সুস্পষ্ট জনমতের প্রতিফলন। মানুষের প্রত্যাশা, এই বিজয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটুক।
স্থানীয়দের বক্তব্য, মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাও এ বার ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। তাঁদের অভিমত, দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক পরিকাঠামো, রাস্তার বেহাল দশা, জল জমার সমস্যা, নিরাপদ পথচারী ব্যবস্থা না থাকা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা মানুষের ক্ষোভকে বাড়িয়েছে। বহু নাগরিক মনে করছেন, সিদ্ধান্তগ্রহণের স্তরে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব না থাকলে এই সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধানও কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অসমের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখন এ দাবিকে হাওয়া দিচ্ছে, কারণ, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার পাশাপাশি বরাক উপত্যকার প্রতিনিধিত্বও সমানভাবে নিশ্চিত করা না গেলে, অদূর ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এখন সব নজর ১২ মের দিকে। নতুন সরকার কি শিলচরের দীর্ঘ ৪২ বছরের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে মন্ত্রিসভায় এই গুরুত্বপূর্ণ শহরের কণ্ঠস্বরকে স্থান দেবে, নাকি আরও একবার প্রতীক্ষাই সঙ্গী হবে বরাকের, উত্তর মিলবে শীঘ্রই।
❤ Support Us






