- দে । শ
- জুন ১১, ২০২৬
সঙ্গীত নাটক অকাদেমি সম্মানে উজ্জ্বল বাংলা-অসমের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
সর্বভারতীয় সংস্কৃতি মঞ্চে উজ্জ্বল দুই রাজ্যের নাম। ২০২৪-২০২৫ সালের সংগীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার, উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কার ঘোষণা হয়েছে। শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম এ স্বীকৃতির তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলা ও অসমের কৃতী শিল্পী ও গবেষকরা। কেবল অসম থেকেই ঘোষিত পুরস্কার তালিকায় রয়েছেন রাজ্যের মোট ১১ জন শিল্পী। হিন্দুস্তানি মার্গ সংগীত থেকে শুরু করে আঞ্চলিক লোকনৃত্য, মাজুলির সত্র থেকে তেজপুরের নাট্যমঞ্চ, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার লোকসুর থেকে শাস্ত্রীয় নৃত্যের মঞ্চ; অভিনয়, সত্রিয়া নৃত্য, কথক, লোকসংগীত, খোলবাদন, নাট্যনির্দেশনা ও টোকারি গীত— বিভিন্ন ধারার শিল্পীদের আজীবনের সাধনা এবার পেল জাতীয় স্তরের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি।
বুধবার সঙ্গীত নাটক অকাদেমির সাধারণ পরিষদের বৈঠকের পর পুরস্কারপ্রাপকদের নাম ঘোষণা করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের মধ্যে থেকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য মোট ১০৮ জনকে সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার এবং ১০৬ জন তরুণ শিল্পীকে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করেছে অকাদেমি। সে তালিকায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে অসম ও পশ্চিমবঙ্গের। তালিকায় রয়েছেন বাংলার শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে পরিচিত মুখ সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। হিন্দুস্তানি যন্ত্রসংগীত বিভাগে, বিশেষত তবলা বাদনে অনন্য নজির গড়ার জন্য এই বিশিষ্ট শিল্পীকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সুগম সংগীত তথা আধুনিক গানের ধারাকে জনপ্রিয় করে তোলার স্বীকৃতি হিসেবে ‘অন্যান্য প্রধান সংগীতধারা’ বিভাগে সম্মানিত করা হচ্ছে প্রাতঃস্মরণীয় শিল্পী প্রভাতী মুখোপাধ্যায়কে। সংস্কৃতির শিকড়ের খোঁজেও এবার দিল্লির নজর আটকেছে এই রাজ্যে। পুরুলিয়ার ঐতিহ্যবাহী ছৌ নাচকে আন্তর্জাতিক দরবারে পৌঁছে দেওয়া সমীর কুমার মাহাতোও সম্মানিত হচ্ছেন। তরুণ প্রজন্মের প্রতিভাদের মূল্যায়নেও এবার কার্পণ্য করেনি অকাদেমি। ‘উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কার’ দেওয়া হচ্ছে বাংলার প্রতিভাবান লোকসংগীত শিল্পী মধুশ্রী হাতিয়ালকে। ঝুমুর গানের জগতে তাঁর অনবদ্য সুর ও সাধনা তরুণ বয়সেই তাঁকে জাতীয় স্তরের অনন্য গৌরব এনে দিয়েছে। এর আগে, ২০২৩ সালের জন্য (যা এই বছরের গোড়ার দিকে প্রদান করা হয়) সংস্কৃত নাট্যচর্চায় অনন্য অবদানের জন্য পিয়াল ভট্টাচার্য এবং বাংলার মাটির গান তথা লোকসংগীতের প্রসারে স্বপন মুখোপাধ্যায়কে সম্মানিত করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন অসমের নাট্যজগতের পরিচিত মুখ চেতনা দাস। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে তিনি নিরলসভাবে অসমের নাট্যচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছেন। সত্রিয়া নৃত্যের জন্য সম্মানিত হয়েছেন মল্লিকা কন্দলি এবং ভাস্কর জ্যোতি ওঝা। ২০২৪ সালের পুরস্কারপ্রাপকদের তালিকায় রয়েছেন সত্রিয়া নৃত্যশিল্পী প্রেম ওঝা বরবায়ন এবং কথক শিল্পী বিপুল চন্দ্র দাস। পুরস্কার ঘোষণার পর আবেগাপ্লুত চেতনা দাস বলেছেন, ‘অসমের মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, হয়তো তারই প্রতিফলন এ সম্মান। তেজপুর থেকেই আমার শিল্পীজীবনের শুরু। সেখানেই প্রথম বার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলাম।’
অসমের সাংস্কৃতিক পরম্পরার আর এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি প্রেম ওঝা বরবায়নের জীবনকাহিনি সংগ্রাম ও অধ্যবসায়ের এক অনন্য দলিল। মাত্র ছ-বছর বয়সে তাঁকে মাজুলির ঐতিহ্যবাহী কমলাবাড়ি সত্রে পাঠানো হয়েছিল সত্রিয়া নৃত্যের শিক্ষা গ্রহণের জন্য। কিন্তু সে জীবন মোটেও সহজ ছিল না। সত্রে থেকে বাসন মাজা, আশ্রম পরিষ্কার করা-সহ নানা দায়িত্ব পালন করতে হতো তাঁকে। সেসব দিনের কথা স্মরণ করে প্রেম ওঝা বলেন, ‘খুব কষ্ট হতো। চার বার সত্র থেকে পালিয়েও গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই বাবা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতেন। বলতেন, আজ যে কষ্ট হচ্ছে, এক দিন সেটাই তোমার ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে।’ তিনি এখন বুঝতে পারেন, সেই কঠিন শৃঙ্খলা আর অনুশাসনই পরবর্তী জীবনে তাঁর নিবিড় শিল্পী সত্তা গড়ে তুলেছে। জাতীয় সম্মান পাওয়ার পর তাই অতীতের সেই দিনগুলোকেই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন তিনি।
প্রবীণ শিল্পীদের পাশাপাশি জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পেয়েছেন অসমের ছয় তরুণ শিল্পীও। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কারের ২০২৪ সালের তালিকায় রয়েছেন সত্রিয়া নৃত্যশিল্পী মীনাক্ষী মেধি, লোকসংগীত শিল্পী দিলীপ হীরা এবং নাট্যনির্দেশক বিদ্যুৎ কুমার নাথ। ২০২৫ সালের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন সত্রিয়া শিল্পী নিরঞ্জন শইকীয়া বরবায়ন, খোলবাদক দেবজিত শইকীয়া এবং টোকারি গীতের শিল্পী হীরক জ্যোতি শর্মা। অসম সংস্কৃতির ধারক ও বাহকরা তাই বলছেন, এ পুরস্কার কেবল কয়েক জন শিল্পীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। বরং বৃহত্তর অসমের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জাতীয় স্বীকৃতি। বৈষ্ণব ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়ে সত্রিয়া, আজ শাস্ত্রীয় নৃত্যের মর্যাদা পেয়েছে, লোকসংগীত ও টোকারি গীতের মতো আঞ্চলিক শিল্পধারার প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এ বারের তালিকায়।
সঙ্গীত নাটক অকাদেমি দেশের সঙ্গীত, নৃত্য ও নাট্যকলার সর্বোচ্চ জাতীয় প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থা সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীনে পরিচালিত হয়। ভারতের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নথিবদ্ধকরণ এবং প্রসারের দায়িত্ব বহন করে তারা। অকাদেমির পুরস্কারকে দেশের পরিবেশনশিল্পের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জাতীয় স্বীকৃতিগুলির অন্যতম বলে মনে করা হয়। এ বছর আকাদেমি সাত জন বিশিষ্ট শিল্পীকে ‘অকাদেমি রত্ন’ বা ‘ফেলো’ হিসেবেও নির্বাচন করেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রামলাল বারেঠ, এ ভি আনন্দ, রীতা গাঙ্গুলি, পুরু দধীচ, চিত্তরঞ্জন জ্যোতিষী, পাসুমার্থি রত্তাইয়া শর্মা এবং সুধারাণী রঘুপতি। অকাদেমির ফেলোশিপ প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ সম্মান, এক সময়ে সর্বাধিক ৪০ জনকেই এই মর্যাদা দেওয়া হয়।
সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কারের সঙ্গে এক লক্ষ টাকা, তাম্রপত্র ও অঙ্গবস্ত্র দেওয়া হয়। অকাদেমি ফেলোশিপের সঙ্গে থাকে ৩ লক্ষ টাকা। অন্য দিকে, উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কারপ্রাপকেরা পান ২৫ হাজার টাকা, তাম্রপত্র এবং অঙ্গবস্ত্র। অকাদেমির সূত্রে জানা যাচ্ছে, নির্বাচিত ‘ফেলো’ এবং পুরস্কারপ্রাপকদের সম্মানিত করা হবে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে। প্রাপকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কার প্রদান করবেন অকাদেমির চেয়ারম্যান।
❤ Support Us






