- দে । শ
- জুন ৩, ২০২৬
বুলডোজারের সামনে রাতভর অবস্থান, আপাতত স্থগিত উচ্ছেদ; যাদবপুরে হকারদের পাশে বামেরা
রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর, রেলস্টেশন, ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ, প্রতিবাদ ক্রমশ প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠছে। শিয়ালদহ, হাওড়া, দমদম, উল্টোডাঙা, বর্ধমান, দুর্গাপুর কলকাতা সহ রাজ্যের জেলায় জেলায় উত্তেজনা বাড়ছে। মঙ্গলবার রাতে যাদবপুর স্টেশন চত্বরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা বুলডোজার, বিপুল পুলিশবাহিনী এবং সম্ভাব্য উচ্ছেদের খবর ঘিরে তৈরি হয় তীব্র উদ্বেগ। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয় প্রতিরোধে। হকারদের পাশে দাঁড়িয়ে স্টেশন চত্বরে অবস্থান শুরু করে সিপিআইএম-সহ বিভিন্ন বাম দলের নেতাকর্মীরা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-গবেষকদের একাংশ। কয়েক ঘণ্টার টানাপড়েন, আলোচনা ও বিক্ষোভের পর গভীর রাতে শেষ পর্যন্ত বুলডোজার পিছু হটতে বাধ্য হয়। সিপিআইএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য জানান, আন্দোলনের চাপে পড়ে আপাতত উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত রেখেছে রেল।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকারদের একাংশের দাবি, স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদের প্রস্তুতি চলছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকায় পৌঁছয় একাধিক জেসিবি ও বুলডোজার। সঙ্গে ছিল রেল পুলিশ, জিআরপি আর রাজ্য পুলিশের বিশাল বাহিনী। দমদম, শিয়ালদহ কিংবা হাওড়া স্টেশন চত্বরে সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের নজির সামনে থাকায় আতঙ্ক ছড়াতে সময় লাগেনি। অনেকেই পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়েই দোকানের সামনে অবস্থান নিতে শুরু করেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছন সৃজন ভট্টাচার্য, সিপিআই(এম-এল) লিবারেশনের নেতা অতনু চক্রবর্তী-সহ বিভিন্ন বাম সংগঠনের প্রতিনিধিরাও। স্টেশন চত্বর জুড়ে শুরু হয় মিছিল ও স্লোগান। ‘পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ চলবে না’, ‘হকার মেরে বেকার বাড়ানো চলবে না’— এমন নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। পরে সিদ্ধান্ত হয়, সম্ভাব্য উচ্ছেদ রুখতে সারা রাত স্টেশন চত্বরেই অবস্থান চলবে।
বাম নেতৃত্বের অভিযোগ, কোনো বৈধ প্রক্রিয়া বা গ্রহণযোগ্য নোটিস ছাড়াই উচ্ছেদের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। উপস্থিত হকারদের উদ্দেশে সৃজন বলেন, ‘সমস্যার কোনও সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এখানেই থাকতে হবে। যাঁদের জীবন-জীবিকা এই দোকানগুলির উপর নির্ভরশীল, তাঁদের কথা না শুনে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যায় না।’ রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের সঙ্গে বাম নেতৃত্বের আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় যোগ দেন আইনজীবী শামিম আহমেদও। তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন উচ্চ আদালত এবং সর্বোচ্চ আদালতের একাধিক রায়ে পুনর্বাসনের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘যাঁদের জীবিকা অন্য কোনো উপায়ে সুরক্ষিত নয়, তাঁদের উচ্ছেদ করার আগে বিকল্প ব্যবস্থার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। মানুষের মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকারকে আদালত বারবার স্বীকৃতি দিয়েছে।’
মধ্যরাত পেরিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়। রেল ও প্রশাসনের আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর আশ্বাস মেলে যে অবিলম্বে কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে না। এরপরই স্টেশন চত্বর থেকে বুলডোজার সরিয়ে নেওয়া হয়। গভীর রাতে হকারদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সৃজন বলেন, ‘কেউ একটি নোটিস টাঙিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে নোটিসের কোনও গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি, পুনর্বাসন ছাড়া এই মানুষগুলিকে উচ্ছেদ করা যাবে না। রুটি-রুজির প্রশ্নকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। রেলকে বিষয়টি দেখতে হবে, সরকারকেও দায়িত্ব নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে কে কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল, বহু মানুষের জীবিকা এই দোকানগুলির সঙ্গে জড়িত। আইন মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয়। শ্রমজীবী মানুষের পেটে লাথি মেরে উন্নয়নের নাম করা যায় না।’
রাতভর উত্তেজনার পর বুধবার সকালে স্টেশন চত্বরে আবার দোকান খুললেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। বহু হকারের আশঙ্কা, আপাতত উচ্ছেদ স্থগিত হলেও বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। তাঁদের বক্তব্য, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে বহু পরিবার কার্যত পথে বসবে। কারণ, যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় কয়েক দিন আগেই জানিয়েছিলেন, ডিআরএমের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে। ২ জুন কোনো উচ্ছেদ হবে না। তাঁর দাবি ছিল, ভবিষ্যতে যাদবপুর স্টেশন আধুনিকীকরণ করা হবে। বাসস্ট্যান্ড, অটোস্ট্যান্ড, শৌচাগার-সহ বিভিন্ন পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি হকারদের স্থায়ী সমাধান নিয়েও আলোচনা হবে। তিনি আরও বলেছিলেন, যাদবপুর বিধানসভার অন্তর্গত ১০টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা অগ্রাধিকার পাবেন। অভিযোগ, মঙ্গলবার রাতের উচ্ছেদ অভিযানের চেষ্টা প্রমাণ করল, বিধায়কের আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। হকাররা প্রশ্ন তুলছেন, যদি উচ্ছেদের পরিকল্পনা না-ই থাকে, তবে স্টেশন চত্বরে বুলডোজার, বিপুল পুলিশবাহিনীর উপস্থিতির প্রয়োজন হল কেন?
যাদবপুরের এ উদ্বেগের পিছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার স্মৃতি। মাত্র কয়েক দিন আগেই দমদম স্টেশনে গভীর রাতে উচ্ছেদ অভিযান চালায় রেল। সেখানে একের পর এক দোকান, স্টল, গুমটি ভেঙে ফেলা হয়। রেলের দাবি ছিল, বহু দিন ধরেই রেল জমিতে বেআইনি দখলদারি চলছিল, উচ্ছেদের আগাম নোটিসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই অভিযান চালানো হয়েছে। ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছেছিলেন প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ তড়িৎ তোপদার, সিপিএম নেতা সোমনাথ ভট্টাচার্য, গার্গী চ্যাটার্জী এবং ময়ূখ বিশ্বাস। তাঁদের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বহু দোকানদার। তবু সেখানে উচ্ছেদ আটকানো যায় নি। রেল কর্তৃপক্ষেরর দাবি, যাত্রী নিরাপত্তা, চলাচলের সুবিধা এবং রেল সম্পত্তি রক্ষার স্বার্থে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্টেশন চত্বর ও সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বেআইনি দখলদারি চলছিল। প্রশাসনিক সহযোগিতা মেলায় এখন সে জমি দখলমুক্ত করার কাজ দ্রুত এগোচ্ছে।
এদিকে উচ্ছেদ প্রসঙ্গ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য–এর সাম্প্রতিক মন্তব্যে। তিনি ধর্মতলা-সহ কলকাতার বিভিন্ন ফুটপাত হকারমুক্ত করার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের চলাচলের স্বার্থে ফুটপাত দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। যদিও পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন। ফলে যাদবপুর স্টেশনের মঙ্গলবার রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামনে এসেছে পুরনো বিতর্ক— উন্নয়ন ও দখলমুক্তকরণের নামে জীবিকার প্রশ্ন কতটা উপেক্ষিত হচ্ছে? আপাতত উচ্ছেদ রোখা গিয়েছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। কিন্তু পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না মিললে যে এই লড়াই থামছে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন হকারেরা এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানো বাম সংগঠনগুলি।
❤ Support Us






