Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৫, ২০২৫

এনআরসি-র শুরু! বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের যজ্ঞে প্রান্তিকদের অস্তিত্ব বিপন্ন

এনআরসি-র শুরু! বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের যজ্ঞে প্রান্তিকদের অস্তিত্ব বিপন্ন

ভোট আসে, ভোট যায়। পঞ্চায়েত বদলায়, বিধানসভা বদলায়, পার্টির রং বদলায়। কিন্তু প্রান্তিক গ্রামের চিরন্তন ছবি বদলায় না — বিদ্যুৎ নেই, শৌচালয় নেই, কাগজও নেই। কেবল ভোটের দিনে পৌঁছে যায় স্লোগান আর কালি লাগানো বুথের বুড়ো আঙুল। গণন্ত্রের এটুকুই উৎসব। এই ভোটই আজ প্রশ্নের মুখে। বিহারে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ সংশোধন’ প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারলে, ভোটার তালিকা থেকে কাটা যাবে নাম।

কমিশনের নতুন নির্দেশে, যাঁদের নাম ২০০৩ সালের তালিকায় নেই, তাঁদের এবার নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। তাও আবার একগুচ্ছ নির্ধারিত কাগজপত্র দিয়ে। জন্মসনদ, জাতি সনদ, বা জমির দলিলের কপি-সহ বিশেষ কিছু কাগজের কোনোটিই না থাকলে, ভোটার তালিকায় নাম উঠবে না! অনেকের কাছেই কাগজ নেই। কারো কাগজ জলে ভেসে গেছে, কারো ঝড়ে উড়ে গেছে, কারো বা দাঙ্গাপীড়িত আগুনে ভস্মপ্রায়। অথচ গণতন্ত্র রক্ষায়, কাগজই প্রমাণ। তাই কাগজ চাই। গ্রামের পর গ্রাম, অঞ্চলের পর অঞ্চল মরিয়া হয়ে কাগজ খুঁজছে। ঠিক যেমন তাঁরা খুঁজেছিল এনআরসি-র আশঙ্কায়। কোথাও বিএলও’র কাছে মানুষ ভিড় করছেন, কেউ বা খুঁজছেন মৃত বাবার নাগরিকত্বের প্রমাণ, কেউ বা জানেনই না, ভোট দিতে কোন কাগজ জমা দিতে হবে। যেমন, নালন্দার কল্যাণ বিঘা গ্রামের দিনমজুর, মেঘন মাঁঝি ভাবতেই পারেননি, ৫ বছর ফেরতা ‘অনুষ্ঠানে’ তাঁর ভোটার আইডি আর আধার কার্ডই যথেষ্ট নয়। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের নিজের গ্রামেই যদি এমন চিত্র, তবে রাজ্যের অন্য প্রান্তের কী দশা— অনুমান করা কঠিন নয়। কমিশনের দাবি, এই প্রক্রিয়া ‘ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ’ করার জন্য। কিন্তু বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ করতেই হয়, তা হলে, নির্বাচনের ঠিক আগে হটাৎ করে, এত কম সময়ে, প্রবল বর্ষার মাঝে এতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কেন? কেন প্রমাণের দায় চাপানো হল শুধুমাত্র ভোটারের কাঁধে? নাগরিকের প্রাথমিক অধিকার কি আজ নিজেকে প্রমাণ করেই অর্জন করতে হবে?

বিহারের রাজনীতি ঘিরে উত্তেজনা বরাবরই বেশি। এবছর তার সঙ্গে রয়েছে জাতিগণনার বিষয়। পাটনার মসনদে কে বসবে সে সমীকরণ অনেকাংশে তৈরি হয় ‘জাতিভিত্তিক’ ভৌটকৌশলে। তাই ভোটের ঠিক আগে, নাগরিকত্ব প্রমাণের নির্দেশ জারি হওয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে উঠেছে। তেজস্বী যাদব সরাসরি অভিযোগ করেছেন, ‘এটা হলো দরিদ্র, দলিত, সংখ্যালঘু এবং যুবকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র।‘ ভোটের হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অংশ যদি তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তাহলে কারা উপকৃত হবেন— তা খুব জটিল অঙ্ক নয়। আরজেডি, কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস— তিনটি প্রধান বিরোধী দল এক সুরে বলেছে, বিহারে ‘পেছনের দরজা দিয়ে এনআরসি’ আনার চেষ্টা চলছে। কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তাদের দাবি, দেশে এমন কোনো আইন নেই যা ভোটার হওয়ার জন্য নাগরিকত্বের ‘কড়া’ প্রমাণ চায়। বরং সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয় নাগরিক মাত্রই ভোট দিতে পারবেন—তাঁর জন্মের স্থান বা বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়ে এত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো কথা নেই।

কমিশনের এহেন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের কয়েছে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস। তাঁদের দাবি, এরকম পদক্ষেপ ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর পরিপন্থী। এতে কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়তে পারে। এডিআর-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জগদীপ চোকার বলছেন, ‘কমিশন যেসব নথি দেখতে চেয়েছে, সেগুলো মূলত শহরাঞ্চলের মানুষের হাতে থাকে। অধিকাংশ গ্রামীণ মানুষের তো জন্মসনদও নেই! আর যাঁরা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে বাইরে কাজ করছেন, তাঁদের পক্ষে এখন গ্রামে এসে কাগজ জমা দেওয়া আদৌ সম্ভব?’ অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের জেরে প্রশাসনিক স্তরেও বাড়ছে বিভ্রান্তি। বিএলও-রা জানাচ্ছেন, তাঁদের কাছেই অনেক কিছু স্পষ্ট নয়— কে প্রমাণ দেবেন, কাকে দিতে হবে না, কোন ডকুমেন্ট চলবে, কোনটা চলবে না, কোনোকিছুই সুস্পষ্ট নয়। ফলে এক বুথে যা মান্য, অন্য বুথে তা নয়। এক রকমের ডকুমেন্ট কোথাও গ্রহণযোগ্য, কোথাও নয়। ফলে এক ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে—যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর পক্ষে যথেষ্ট অশুভ সংকেত।

কমিশনের তরফে দাবি করা হয়েছে, এই তৎপরতা হলো, ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগ। শহরায়নের কারণে যেভাবে এক ব্যক্তি একাধিক জায়গায় ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হচ্ছেন, তা আটকাতেই এ ব্যবস্থা। তবে প্রশ্ন উঠছে, তা হলে কেন শুধুমাত্র ২০০৩ সালের তালিকাকে মানদণ্ড ধরা হল? কেন এই প্রক্রিয়া এত দ্রুত চালানো হচ্ছে? ২০০৪ সালের শেষ এসআইআর-এর সময়কার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি.এস. কৃষ্ণমূর্তি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আগেকার সংশোধনগুলিতে ঘরে ঘরে গিয়ে যাচাই করা হত। এবার তার কিছুই হচ্ছে না। বরং ভোটারদের নিজেদের খরচে, নিজের উদ্যোগে কাগজপত্র জোগাড় করতে বলা হচ্ছে। অথচ পরিস্কার করে জানানো হচ্ছে না, কোন কাগজ যথেষ্ট, কোনটা নয়।

শেষ পর্যন্ত, বিহারের প্রাক-ভোটপ্রক্রিয়া আদালতে গিয়ে ঠেকেছে। সুপ্রিম কোর্ট যদি এই নির্দেশকে স্থগিত রাখে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের অতি-তৎপরতা প্রবল ধাক্কা খাবে। তবে যদি নির্দেশ বহাল থাকে, তাহলে লাখ লাখ মানুষ ভোটের বাইরে থেকে যাবেন— এক প্রকার ‘ডি-ফ্যাক্টো ডিসফ্র্যাঞ্চাইজমেন্ট’। সে অর্থে বিহারে এখন শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে না, বরং গণতন্ত্রের উপর পরীক্ষা চলছে। নাগরিকত্ব কি এমন কিছু, যা বার বার প্রমাণ করতে হয়? কাগজ না থাকলে কি কেউ আর ভারতীয় নন? ভোটাধিকার কি কেবল তাঁদেরই, যাঁদের নাম নথিতে আছে? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মেঘন মাঝিদের মতো লাখ লাখ মানুষের মনে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!