Advertisement
  • এই মুহূর্তে প্রচ্ছদ রচনা স | হ | জ | পা | ঠ
  • জুলাই ১০, ২০২৫

জলে বাঁধ, ঘূর্ণনে টান — মেরু বদলের নেপথ্যে মানুষের জলবন্দি কীর্তি !

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জলে বাঁধ, ঘূর্ণনে টান — মেরু বদলের নেপথ্যে মানুষের জলবন্দি কীর্তি !

প্রকৃতির ভারসাম্য নাকি মানুষের হাতে ! সেই প্রশ্ন ফের উঠে এল। কারণ, পৃথিবীর উত্তর মেরু নাকি আর আগের জায়গায় নেই। গত প্রায় দু-শো বছরের মধ্যে নির্মিত হাজার হাজার বাঁধের পেছনে আটকে থাকা জলের ভারে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অক্ষই খানিকটা সরে গিয়েছে। ঠিক যেন মেরু নিজের পথ হারিয়ে ফেলেছে। সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ১৮৩৫ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময়কালে বিশ্বজুড়ে নির্মিত হয়েছে ৬ হাজার ৮৬২টি বাঁধ। এ সমস্ত বাঁধের পেছনে জমে থাকা জলের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, সেই জল দিয়ে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো প্রাকৃতিক গিরিখাত
দু-বার পূর্ণ করা সম্ভব। এই অতিরিক্ত ভর পৃথিবীর ভূত্বকে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে এবং এর ফলেই মেরুর প্রকৃত অবস্থান স্থানচ্যুত হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তনের ফলে উত্তর মেরু তার স্থান থেকে প্রায় ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি বা ১ দশমিক ১ মিটার সরেছে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘প্রকৃত মেরু স্থানান্তর’।

গবেষণাপত্রের প্রধান লেখিকা নাতাশা ভ্যালেন্সিক, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও গ্রহবিদ্যার একজন স্নাতকোত্তর গবেষক। তিনি জানিয়েছেন — বাঁধে যখন জল আটকে রাখা হয়, তখন তা কেবল সমুদ্র থেকে জল সরিয়ে নিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমিয়ে দেয় না, বরং পৃথিবীর উপরিভাগে ভরের এমন এক পুনর্বণ্টন ঘটায়, যার ফলে বদলে যায় মেরুর অবস্থানও। গবেষণা বলছে, ১৮৩৫ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত সময়ে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে ব্যাপকভাবে বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। এর ফলে উত্তর মেরু সরে গিয়েছে ২০ সেন্টিমিটার পূর্বদিকে, যা আজকের রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং চিনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দ্রাঘিমাংশের দিকে অবস্থিত। এর পরের পর্যায়ে, অর্থাৎ ১৯৫৪ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে, ব্যাপক হারে বাঁধ নির্মাণ হয়েছে পূর্ব আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে। ফলে ভরের স্থানান্তর ঘটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে আর মেরু সরে গিয়েছে ৫৭ সেন্টিমিটার পশ্চিম দিকে, যা উত্তর আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এলাকার মধ্যে পড়ে।

এই স্থানচ্যুতি একরৈখিক নয়। বরং পৃথিবীর মেরু একটি দুলুনির মতো পথে হাঁটে, যেন দিক খুঁজে নিতে চায়। কখনো পূর্বে, কখনো পশ্চিমে। একসময়ের উত্তর মেরু আজ আর নিজের জায়গায় নেই — সে হাঁটছে, সরছে, নিজের ভারসাম্য বদলাচ্ছে। এই গবেষণায় আরো দেখা গিয়েছে, বাঁধে জল আটকে রাখার ফলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা প্রায় ২৩ মিলিমিটার বা ০ দশমিক ৯ ইঞ্চি কমেছে। অথচ বিশ শতকে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় বৃদ্ধি হয়েছে ১২ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বৃদ্ধি যদি বাঁধ না থাকত, তা হলে আরো অনেক বেশি হতো। কারণ এই অতিরিক্ত জল আটকে আছে স্থলভাগের জলে, সমুদ্রের বাইরে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, মেরুর অবস্থান স্থানচ্যুত হয়েছে বটে, তবে তা পৃথিবীর উপর তাৎক্ষণিক বড়ো কোনো বিপর্যয় আনবে না। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যে গভীর, তা অস্বীকার করা যায় না।  যদিও বরফযুগে ফের প্রবেশ করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন তারা। তবুও এই ভরের পরিবর্তন সমুদ্রপৃষ্ঠের উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রের উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে, ভবিষ্যতের জলবায়ু বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসে বাঁধের প্রভাব অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!