- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ২২, ২০২৫
কেন্দ্রের বঞ্চনার জবাবে, উন্নয়নই হাতিয়ার! ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্পের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের মঞ্চ থেকে দলীয় কর্মীদের সামনে রাজনৈতিক আক্রমণ-বিগ্রহের বার্তা দিয়ে ঘুঁটি সাজিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঠিক তার পরের দিন, ২২ জুলাই, নবান্নে দাঁড়িয়ে মমতা ঘোষণা করলেন এক নতুন সরকারি প্রকল্প—‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’-এর। উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক সমস্যার সরাসরি সমাধান প্রশাসনের হাত ধরে। আগামী ২ অগাস্ট থেকে রাজ্যজুড়ে শুরু হবে এই প্রকল্প, চলবে টানা ২ মাস। নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক তৎপরতার এই চালকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ব্যাখ্যা করছেন নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবেই। নবান্ন থেকে এ প্রকল্পের ঘোষণা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট। একদিকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ—দুইয়ের মিশেলে তৈরি হচ্ছে নতুন রাজনীতির কৌশল।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, আসন্ন প্রকল্পে রাজ্যের ৮০ হাজার বুথকে ভিত্তি করে গঠিত হচ্ছে পরিকাঠামো। প্রতিটি বুথে ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ, ফলে বাজেট দাঁড়াচ্ছে ৮ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। ৩টি বুথকে একত্র করে একটি ক্যাম্পিং কেন্দ্র গঠন করা হবে, যেখানে একদিন ধরে চলবে বিশেষ শিবির। এই শিবিরে থাকবেন সরকারি আধিকারিক, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং প্রয়োজনে জনপ্রতিনিধিরাও। এই ক্যাম্পগুলি স্থানীয় বাসিন্দারা সরাসরি সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। উঠে আসা সমস্যাগুলি অনলাইনে নথিভুক্ত করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ার উপর নজরদারি করতে গঠিত হবে রাজ্য ও জেলা স্তরের টাস্ক ফোর্স। নেতৃত্বে থাকবেন মুখ্যসচিব। সর্বস্তরে থাকবে নিয়মিত মনিটরিং।
আজ নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলন থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এটা হয়তো বড়ো কোনো প্রকল্প নয়, কিন্তু এর প্রভাব হবে গভীর। তিনি বলেন, ‘ছোটখাটো প্রয়োজন—যেমন একটি পানীয় জলের কল, রাস্তার সংস্কার, আলো বসানো—এ জাতীয় সমস্যার জন্য আর সাধারণ মানুষকে দফতর দফতর ঘুরতে হবে না। বরং প্রশাসনই এবার তাঁদের কাছে পৌঁছে যাবে। তাঁর কথায়, সরকার মানুষের কাছে যাবে, মানুষ আর প্রশাসনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে না।’ প্রকল্প ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, একশো দিনের কাজের টাকা, আবাস যোজনার অনুদান, গ্রামীণ পানীয় জল প্রকল্পসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যের প্রাপ্য আটকে রেখেছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃতবাধীন০ কেন্দ্র সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘প্রধানমন্ত্রী আত্মনির্ভরতার কথা বলেন, অথচ বাংলাকে সেই পথে এগোতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার পিছিয়ে থাকবে না। মানুষের মুখ থেকে হাসি কেড়ে নিতে দেব না কিছুতেই।’
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রকল্প শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং নির্বাচনের প্রাক্কালে তৃণমূল কংগ্রেসের কৌশলগত চাল। ‘দিদিকে বলো’, ‘দুয়ারে সরকার’, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর পর এই প্রকল্প সাধারণ মানুষের কাছে সরকারকে আরো কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার অনন্য কৌশলী প্রয়াস। এতে যেমন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তেমনই রয়েছে ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, একশো দিনের কাজের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আটকে রয়েছে। ৩২ লক্ষ পরিবারের জন্য আবাস যোজনার অর্থ মঞ্জুর হয়নি। জল জীবন মিশন-সহ বহু প্রকল্প কেন্দ্রীয় সহায়তার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। সংসদে কেন্দ্র সরকার নিজেই স্বীকার করেছে, নিরীক্ষার অভাবেই এ সমস্ত টাকা আটকে রয়েছে। এই স্বীকারোক্তিকেই তৃণমূল রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, রাজ্য ও কেন্দ্রের সংঘাত নয়, এই মুহূর্তে রাজ্যের লক্ষ্য হওয়া উচিত সার্বিক উন্নয়ন। তাই সমস্ত বাধা সত্ত্বেও তিনি চান, প্রশাসন মানুষের পাশে থাকুক, সরাসরি তাঁদের সঙ্গে যুক্ত থাকুক, এবং প্রতিটি সমস্যার দ্রুত সমাধান হোক। ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্প তাই শুধুমাত্র একটি পরিষেবা নয়, বরং প্রশাসন ও রাজনীতির যুগলবন্দি। এর বাস্তবায়ন কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে মনিটরিং, স্বচ্ছতা ও সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর।
❤ Support Us






