- দে । শ
- জুন ৫, ২০২৬
‘বিশ্বাসঘাতকতা করেছে কংগ্রেস’, অভিযোগ তুলে ‘ইন্ডিয়া’ জোট ছাড়ল স্ট্যালিনের ডিএমকে
‘রাজনীতিতে বন্ধু হয় না, সবই পরিস্থিতির খেলা’— এই আপ্তবাক্য তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে ক্রমশ প্রকট হয়েছে। একসময়ের ‘বন্ধু’ ডিএমকে-এর নির্বাচনী পরাজয়ের পর, হাত ছেড়েছে কংগ্রেস, অভিনেতা বিজয়ের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকারে সামিল হয়েছে। এরপর থেকে দ্রাবিড়ভূমে যে অস্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছিল, তা এ বার জাতীয় রাজনীতির বিরোধী শিবিরেও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি-বিরোধী ঐক্যের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ভিতেই ফাটলের ইঙ্গিত মিলল। তামিলনাড়ুর প্রভাবশালী দ্রাবিড় দল ডিএমকে কার্যত ইন্ডিয়া জোট থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিল। আগামী ৮ জুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শীর্ষ বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে এম কে স্ট্যালিনের দল। শুধু বৈঠক বয়কটই নয়, দলের মুখপাত্র টিকেএস এলঙ্গোভনের মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে। তাঁর দাবি, ডিএমকে আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জাতীয় জোটের অংশ নয়।
তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই ডিএমকে আর কংগ্রেসের সম্পর্কের অবনতির শুরু। নির্বাচনের আগে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে লড়াই করে কংগ্রেস ৫টি আসনে জয় পায়। কিন্তু ভোটের ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যায়। অভিনেতা-রাজনীতিক সি জোসেফ বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্ট্রি কাঝগম (টিভিকে) ১০৮টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে টিভিকেকে সমর্থন করে কংগ্রেস। শুধু সমর্থনই নয়, পরবর্তীকালে বিজয় সরকারের মন্ত্রিসভায় কংগ্রেসের দুই বিধায়ক স্থান পান। সেই সঙ্গে বিদুথলাই চিরুথাইগল কাচ্চি (ভিসিকে), ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল), সিপিআই, সিপিআইএম–ও টিভিকের পাশে দাঁড়ায়। ভিসিকে এবং আইইউএমএলও মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব পায়।
ডিএমকের অভিযোগ, দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক ‘মিত্র’ কংগ্রেস নির্বাচনের আগে জোটের সুবিধা নিয়েছে, কিন্তু ফল প্রকাশের পর পরিস্থিতি বুঝে আচমকাই শিবির বদল করেছে। সবচেয়ে ক্ষোভের জায়গা, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ডিএমকের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনাই না কি করেনি কংগ্রেস। স্ট্যালিন শিবিরের অভিযোগ, এ কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বিষয় নয়, সরাসরি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘পিছন থেকে ছুরি মারা’র সমান। ডিএমকে সদর দফতর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের পরে কংগ্রেস ডিএমকের সঙ্গে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তা দলের কর্মী-সমর্থকদের ভাবাবেগে গভীর আঘাত করেছে। তাঁদের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ডিএমকে ৮ জুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে অংশ নেবে না। কারণ, ওই বৈঠকে কংগ্রেসের নেতৃত্বরা উপস্থিত থাকবে।’
স্ট্যালিনের দল আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এখন থেকে যেসব বৈঠকে কংগ্রেস থাকবে, সেখানে ডিএমকের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবে না। যদিও জাতীয় স্বার্থে বা জনকল্যাণমূলক কোনো ইস্যুতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্য শরিক দলগুলি যে অবস্থান নেবে, সে বিষয়ে ডিএমকে আগের মতোই নিজের কণ্ঠস্বর বজায় রাখবে। এ ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, ডিএমকের এহেন সিদ্ধান্ত কি কেবল সাময়িক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, না কি বিরোধী রাজনীতির বৃহত্তর পুনর্বিন্যাসের সূচনা? কারণ ডিএমকে শুধু ইন্ডিয়া জোটের সদস্যই নয়, জোট গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা বলেও নিজেদের দাবি করে এসেছে।
দলীয় বিবৃতিতে সে প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘নিট’ প্রশ্নফাঁস, আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর), ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন’, ‘ওয়াকফ আইন’ এবং ‘বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন’ (এফসিআরএ)-এর সংশোধনের মতো একাধিক জাতীয় ইস্যুতে ডিএমকে সংসদ, বিধানসভা, আদালত ও জনমঞ্চে ধারাবাহিকভাবে লড়াই করেছে। দলটির দাবি, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সূচনালগ্ন থেকেই তারা ছিল অন্যতম চালিকাশক্তি, এই ভূমিকা সম্পর্কে জোটের অন্যান্য শরিকরাও অবগত। ডিএমকের ক্ষোভ এতটাই তীব্র যে তার প্রভাব সংসদীয় রাজনীতিতেও পড়েছে। কংগ্রেস সদস্যদের পাশে বসতে আপত্তি জানিয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে চিঠি দিয়েছেন ডিএমকে নেত্রী ও সাংসদ কানিমোঝি করুণানিধি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি আসনবিন্যাস বদলের আবেদন জানান। সূত্রের খবর, লোকসভা সচিবালয় সে আবেদন নীতিগতভাবে মঞ্জুরও করেছে।
৮ জুনের বৈঠকে ডিএমকের প্রতিনিধিরা আদৌ উপস্থিত থাকবেন কি না, তা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই জল্পনা চলছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে স্ট্যালিনকে অবস্থান পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করা হয়েছিল বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। কংগ্রেসও বার্তা দিয়েছিল যে, কেরালায় সিপিএম ও কংগ্রেস একে অপরের বিরুদ্ধে লড়লেও দিল্লিতে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতিতে একসঙ্গে কাজ করে। তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমীকরণ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এ যুক্তি ডিএমকের অবস্থান বদলাতে পারেনি। ডিএমকের ‘বয়কট’ সিদ্ধান্ত বিরোধী জোটের জন্য বিশাল ধাক্কা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। লোকসভায় ডিএমকের সাংসদ সংখ্যা ২২। রাজ্যসভাতেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে আসন পুনর্বিন্যাসের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে ডিএমকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ফলে তাদের দূরত্ব ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সাংসদীয় শক্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
যদিও কংগ্রেস এখনই সম্পর্কের সব সেতু ভেঙে ফেলতে চাইছে না। তামিলনাড়ুর দায়িত্বপ্রাপ্ত কংগ্রেস নেতা গিরিশ চোডাঙ্কর জানিয়েছেন, ডিএমকে এখনো ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অংশ। জাতীয় স্তরে দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রেও কংগ্রেস আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ডিএমকের বর্তমান অবস্থান শুধু কংগ্রেস-বিরোধী ক্ষোভের ফল নয়, এর পিছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে। ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে, কংগ্রেসবিহীন বৃহত্তর আঞ্চলিক বিরোধী মঞ্চ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে স্ট্যালিনের দল। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের মতো দলগুলির উপস্থিতি থাকতে পারে বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে নতুন আরেকটি জল্পনাও মাথাচাড়া দিয়েছে। ডিএমকের অনুপস্থিতিতে অভিনেতা বিজয়ের দল টিভিকেকে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে বলে বিরোধী শিবিরের অন্দরে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি জোটের তরফে। অন্যদিকে, ডিএমকের সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার করে আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপি। পদ্মশিবিরের জাতীয় মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা দাবি করেছেন, ‘ইন্ডিয়া’ জোট সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। তাঁর দাবি, ‘ইন্ডিয়া জোট এখন মৃত ও সমাধিস্থ। কাগজে-কলমে বা টেলিভিশনের পর্দায় হয়তো তার অস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে অস্তিত্ব নেই।’ তিনি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস তার মিত্রদের সঙ্গে ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছে, বিভিন্ন রাজ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করা দলগুলি দিল্লিতে এসে কৃত্রিম ঐক্যের ছবি তুলে ধরছে।
রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ডিএমকে এবং কংগ্রেসের সম্পর্ক অতীতেও একাধিক বার ওঠানামার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ডিএমকে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। এবার উল্টো চিত্র দেখা গেল। কংগ্রেসই নির্বাচনের পরে স্ট্যালিন শিবিরের হাত ছেড়ে বিজয়ের দিকে ঝুঁকেছে। এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে ডিএমকের রাজনৈতিক অবস্থান কোন দিকে যাবে, তা নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে। অতীতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ‘এনডিএ’ সরকারের শরিক ছিল ডিএমকে। ফলে নতুন করে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো অপ্রত্যাশিত সমীকরণ তৈরি হয় কি না, সেদিকেও নজর রাখছেন পর্যবেক্ষকরা।
❤ Support Us






