Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ৪, ২০২৬

বিমা-স্বাস্থ্যসুরক্ষা-বার্ধক্যভাতা, গিগ কর্মীদের জন্য বড়ো ঘোষণা কেন্দ্রের। ২২ জুনের মধ্যে তথ্য জমার নির্দেশ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিমা-স্বাস্থ্যসুরক্ষা-বার্ধক্যভাতা, গিগ কর্মীদের জন্য বড়ো ঘোষণা কেন্দ্রের। ২২ জুনের মধ্যে তথ্য জমার নির্দেশ

খাবার, ওষুধ, মুদিখানা কিংবা ই-কমার্স সংস্থার পণ্য— মোবাইলের পর্দায় কয়েকটি স্পর্শের পরেই যা পৌঁছে যাচ্ছে বাড়ির দরজায়, তার নেপথ্যে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ ডেলিভারি কর্মী। অর্থনীতির ভাষায় যাঁদের বলা হয় ‘গিগ ওয়ার্কার’। গত কয়েক বছরে দেশের কর্মসংস্থানের মানচিত্রে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার ঘটেছে এই ক্ষেত্রেই। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন এই কর্মীরা। সে পরিস্থিতি বদলাতেই বড়ো উদ্যোগের পথে কেন্দ্র। ‘গিগ’ ও ‘প্ল্যাটফর্ম’ কর্মীদের জন্য দুর্ঘটনা বিমা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, বার্ধক্যকালীন আর্থিক সুরক্ষা, এমনকি কম সুদে ঋণ ও পেনশন প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রক, অর্থমন্ত্রক এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মধ্যে ইতিমধ্যেই একাধিক স্তরে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় সূত্রের খবর। দ্রুত বর্ধনশীল এই কর্মীসমাজকে একটি সুসংহত সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে আনাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

সম্প্রতি ‘ফিকি’-র উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব তথা মহাপরিচালক (শ্রমকল্যাণ) অশুতোষ পেডনেকর জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মী রয়েছেন। আগামী দশকের শেষে এ সংখ্যা আড়াই কোটির গণ্ডি পেরিয়ে যেতে পারে। ফলে, এমন বৃহৎ কর্মীশ্রেণিকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা এখন আর শুধুমাত্র কল্যাণমূলক পদক্ষেপ নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও। সরকার ইতিমধ্যেই গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জন্য জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা বোর্ড গঠনের অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি একটি পৃথক সামাজিক সুরক্ষা তহবিলও তৈরি করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পের অর্থ জোগান দেওয়া হবে। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনা বিমা, স্বাস্থ্যবিমা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, বার্ধক্যকালীন সুরক্ষা, নগদ আর্থিক সাহায্য, শিক্ষাঋণ এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচের জন্য আর্থিক সহায়তার মতো একাধিক প্রকল্প নিয়ে ইতিমধ্যেই খসড়া স্তরের আলোচনা চলছে।

তবে শুধু সামাজিক সুরক্ষাই নয়, ‘গিগ’ কর্মীদের অন্যতম বড়ো সমস্যার দিকেও নজর দিয়েছে সরকার। ডেলিভারি কর্মীদের কাজের মূল ভরসা তাঁদের বাহন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্কুটার বা মোটরবাইক ছাড়া কাজ করা কার্যত অসম্ভব। কিন্তু বহু কর্মীই উচ্চ সুদের কারণে সহজে ঋণ পান না। সে পরিস্থিতিতে শ্রমমন্ত্রকের ‘ই-শ্রম’ পোর্টালে নথিভুক্ত ‘গিগ’ কর্মীদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধার রূপরেখা তৈরি হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থমন্ত্রক সূত্রের দাবি, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এমন একটি কাঠামো তৈরির কথা ভাবছে, যাতে ই-শ্রমে নিবন্ধিত ‘গিগ’ কর্মীরা কম সুদে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধের সুবিধাসহ দু-চাকার বাহন কেনার ঋণ পেতে পারেন। এর ফলে  কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনই তাঁদের আয়ও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে তাঁদের পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে ‘গিগ’ কর্মীদের নিয়ে একটি পৃথক স্ট্যাটাস রিপোর্ট তৈরির কাজ শুরু করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানও চলছে। অর্থমন্ত্রককে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে বলে সূত্রের খবর। উদ্দেশ্য একটাই— ‘গিগ’ অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক শ্রম কাঠামোর সঙ্গে আরও সুসংহতভাবে যুক্ত করা। পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘ই-শ্রম’ পোর্টাল। প্ল্যাটফর্ম সংস্থাগুলিকে আগামী ২২ জুনের মধ্যে কর্মীদের তথ্যভাণ্ডার ই-শ্রমের সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের লক্ষ্য, একটি সমন্বিত ডেটাবেস তৈরি করে প্রত্যেক ‘গিগ’ কর্মীকে একটি স্বীকৃত পরিচয়ের আওতায় আনা। এর ফলে কোন কর্মী কী ধরনের সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন, কতটা ব্যবহার করছেন এবং ভবিষ্যতে আর কী কী সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তার সমস্ত তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে।

ভবিষ্যতে একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কর্মীরা নিজেরাই তাঁদের প্রাপ্য সুবিধা, বিমা, আর্থিক সহায়তা বা পেনশন-সংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারবেন। আধার, ইউপিআই এবং ডিজিলকারের মতোই ই-শ্রমও শ্রমিক কল্যাণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পরিকাঠামো হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্র। রাজনৈতিক মহলেও ‘গিগ’ কর্মীদের বিষয়টি ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। গত কয়েক মাসে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে একাধিক বার ‘গিগ’ কর্মী, অটোচালক এবং রেলস্টেশনের কুলিদের সঙ্গে দেখা করতে দেখা গিয়েছে। কখনো তাঁদের সঙ্গে একত্রে খাবার খেয়েছেন, কখনো তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা শুনেছেন। সংসদেও বারবার অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি। সদ্য বিজেপিতে যোগ দেওয়া তৎকালীন ‘আপ’ সাংসদ রাঘব চাড্ডাও  রাজ্যসভায় ‘গিগ’ কর্মীদের অধিকার নিয়ে সরব হয়েছিলেন।

কেন্দ্রীয় সূত্রের দাবি, আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশনে যদি গিগ কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আবার প্রশ্ন ওঠে, তবে সরকার তাদের জন্য তৈরি হওয়া পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার বিস্তারিত রূপরেখা সংসদের সামনে তুলে ধরতে পারে। কারণ, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের শ্রমবাজারে গিগ অর্থনীতির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, গিগ অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। স্থায়ী চাকরির মতো সুবিধা না থাকলেও যদি স্বাস্থ্যবিমা, দুর্ঘটনা কভার, পেনশন এবং সহজ ঋণের সুযোগ তৈরি হয়, তবে এই ক্ষেত্রের লক্ষ লক্ষ কর্মীর আর্থিক নিরাপত্তা অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। সে কারণেই কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে দেশের শ্রমনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!