- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ২, ২০২৬
একদিনের তাপপ্রবাহে ভারতে ৩,৪০০ মৃত্যু ! সরকারি হিসাবের বহু গুণ বেশি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে গরম, দাবি আন্তর্জাতিক গবেষণার
গরমে নাজেহাল দেশ। জুনের শুরুতেও উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পারদ ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা আরও বেশি। আবহবিদেরা সতর্ক করছেন, এ কেবল শুরু। কিন্তু তাপপ্রবাহের প্রকৃত ভয়াবহতা কি শুধু তাপমাত্রার পারদে ধরা পড়ে? নাকি তার থেকেও বড়ো বিপদ লুকিয়ে রয়েছে মৃত্যুর পরিসংখ্যানে?
২৬ মে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল হেলথ’ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ভারতে তাপজনিত মৃত্যুর সরকারি হিসাব নিয়ে। গবেষনায় দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় সরকার যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, তার সঙ্গে আসল পরিসংখ্যানের ফারাক বিস্ময়কর। দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি নথিতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন রিপোর্টে বছরে কয়েকশো থেকে হাজারখানেক মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হলেও নতুন গবেষণা বলছে, বাস্তব চিত্র তার বহু গুণ বেশি হতে পারে। গবেষকদের মতে, ভারতে তাপজনিত মৃত্যুর বড়ো অংশই কখনো ‘হিটস্ট্রোক’ হিসেবে নথিভুক্ত হয় না। হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্ট, কিডনির সমস্যা কিংবা অন্যান্য জটিলতার আড়ালে হারিয়ে যায় প্রকৃত কারণ।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর বা আইএমডি-র সংজ্ঞা অনুযায়ী, সমতল অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে এবং তা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি থাকলে তাকে তাপপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৬.৪ ডিগ্রি বা তারও বেশি বেড়ে গেলে তাকে ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পাহাড়ি এলাকায় এই সীমা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবার কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৪.৫ থেকে ৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলেও তাপপ্রবাহ ঘোষণা করা হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিল্লি-সহ উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের বহু অঞ্চল এরকম পরিস্থিতির মধ্যেই রয়েছে। কোথাও কোথাও দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রিরও উপরে উঠেছে। আবহবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই ধরনের চরম গরমের ঘটনা ক্রমশ আরও ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে। তাপপ্রবাহের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক নিয়ে ২০২৪ সালে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা হয়েছিল। বিশ্বের ১৪টি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতের ১০টি শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন, টানা দু–দিনের চরম তাপপ্রবাহে দৈনিক মৃত্যুহার গড়ে ১৪.৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। শুধু ওই ১০টি শহরেই বছরে প্রায় ১,১১৬ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছিল তাপপ্রবাহের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিল দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ, অশোকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ন্যাশনাল রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন ইন্ডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানও।
সে গবেষণাকে ভিত্তি করে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের ইন্ডিয়া এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট সেন্টারের গবেষক পীযূষ নারাং এবং অশোক গ্যাডগিল নতুন সমীক্ষাটি পরিচালনা করেন। তাঁরা ২০২০ সালের সিভিল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের জেলা-ভিত্তিক মৃত্যুর তথ্য এবং জনসংখ্যার পরিসংখ্যান ব্যবহার করে দেশের সমস্ত জেলার জন্য তাপপ্রবাহজনিত অতিরিক্ত মৃত্যুর সম্ভাব্য হিসাব তৈরি করেন। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলের শ্রেণিবিন্যাসও। গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘এক্সেস ডেথ’ বা অতিরিক্ত মৃত্যুর ধারণা। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে স্বাভাবিক অবস্থায় যত মানুষের মৃত্যুর কথা, তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেলে অতিরিক্ত অংশকে ‘এক্সেস ডেথ’ বলা হয়। জনস্বাস্থ্য গবেষণায় এ পদ্ধতিকে বেশি নির্ভরযোগ্য বলে ধরা হয়, কারণ এতে শুধুমাত্র সরাসরি নয়, পরোক্ষ মৃত্যুর ঘটনাও ধরা পড়ে।
এই পদ্ধতি ব্যবহার করেই গবেষকরা দুটি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন— এক দিনের তাপপ্রবাহ এবং টানা ৫ দিনের তাপপ্রবাহ। তাঁদের হিসাব বলছে, একটি মাত্র চরম গরমের দিনই সারা দেশে প্রায় ৩,৪০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আর টানা ৫ দিনের তাপপ্রবাহে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩০,০০০-এ পৌঁছতে পারে। গবেষণাপত্রে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, এ সংখ্যা দেশের সরকারি রিপোর্টে উল্লিখিত বার্ষিক তাপজনিত মৃত্যুর হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। সরকারি তথ্যের দিকে তাকালে এ ফারাক আরও স্পষ্ট হয়। সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সারা দেশে তাপজনিত কারণে মোট ৩,৭৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ ৫ বছরে মোট মৃত্যু যত, গবেষণাটি বলছে মাত্র একটি দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহেই তার বহু গুণ বেশি মানুষ প্রাণ হারাতে পারেন।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০ বছরে সারা দেশে হিটস্ট্রোকে মৃত্যু হয়েছে ২০,৬১৫ জনের। অন্যদিকে ‘হিটওয়াচ’ নামে একটি অলাভজনক সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে জুনের মধ্যে ১৭টি রাজ্যে হিটস্ট্রোকে ৭৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অথচ ওই একই সময়ের জন্য লোকসভায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দেওয়া হিসাব ছিল মাত্র ৩৬০। এই অসঙ্গতিই গবেষকদের উদ্বেগের মূল কারণ। হিটওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী অধিকর্তা অপেক্ষিতা বর্ষ্ণীর মতে, ভারতে তাপজনিত মৃত্যু দীর্ঘদিন ধরেই ‘ক্রনিকালি আন্ডাররিপোর্টেড’ বা ধারাবাহিক ভাবে কম নথিভুক্ত হয়ে আসছে। বহু ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে হিটস্ট্রোক লেখা হয় না। তার বদলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, কিডনির সমস্যা কিংবা অন্য কোনও জটিলতা উল্লেখ করা হয়। ফলে তাপপ্রবাহের প্রকৃত মানবিক মূল্য অদৃশ্য থেকে যায়।
তাঁর মতে, নতুন গবেষণাটি সেই অদৃশ্য বাস্তবকে দৃশ্যমান করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। তবে এ হিসাবও সম্পূর্ণ নয়। কারণ গবেষণাটি মূলত ‘ড্রাই বাল্ব’ তাপমাত্রার উপর নির্ভর করেছে এবং ৯৭তম পার্সেন্টাইলের সীমা ব্যবহার করেছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে উচ্চ আর্দ্রতার কারণে তুলনামূলক কম তাপমাত্রাতেও যে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার অনেকটাই এই হিসাবের বাইরে থেকে যেতে পারে। গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ভয়াবহ বৈষম্যের ছবিও উঠে এসেছে। ৫ দিনের তাপপ্রবাহে একা উত্তরপ্রদেশেই প্রায় ৮,০৫৬ অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। বিহারে সে সংখ্যা ৩,৬১৫। মধ্যপ্রদেশে ২,৯৬৪। রাজস্থানে ২,৬৬৪ এবং গুজরাটে ২,৩৫৪।
দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ এই ৫ রাজ্যে বাস করলেও সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর ৬০ শতাংশেরও বেশি এখানেই ঘটতে পারে। গবেষকরা এই পরিস্থিতিকে ‘গভীর এবং উদ্বেগজনক পরিবেশগত অবিচার’ বলে বর্ণনা করেছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি। সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ৫টি রাজ্য দেশের অতিরিক্ত মৃত্যুর ৬৬ শতাংশের জন্য দায়ী হলেও ভারতের মোট জিডিপিতে তাদের অবদান মাত্র ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ যেসব রাজ্যের অভিযোজনমূলক পরিকাঠামো গড়ে তোলার আর্থিক ক্ষমতা সবচেয়ে কম, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।
জেলা ভিত্তিক বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। পাঁচ দিনের তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে আমেদাবাদে— প্রায় ৩০৭। তার পরে রয়েছে জয়পুর (২৬৫) এবং সুরত (২৬১)। প্রয়াগরাজ, পটনা, লখনউ, কানপুর নগর, আজমগড়, আগ্রা এবং বেরেলির মতো জেলাগুলিতেও সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১৮০-র বেশি হতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ যে ১০০টি জেলায় বাস করেন, সেই জেলাগুলিই সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর ৪৪ শতাংশের জন্য দায়ী হতে পারে।
গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক তথ্যগুলি সরাসরি নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা প্রয়োজন। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জাতীয় কর্মসূচির আওতায় যে অর্থ বরাদ্দ হয়, তা শুধু জনসংখ্যা বা প্রশাসনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে নয়, বরং তাপপ্রবাহজনিত ঝুঁকি ও আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে বণ্টন করা উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহকে আর মৌসুমি অস্বস্তি বা আবহাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটি ক্রমশ জনস্বাস্থ্যের গভীর সংকটে পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। সে কারণেই মৃত্যুর নির্ভুল হিসাব রাখা, উন্নত তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জেলা স্তরে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে প্রস্তুত রাখা এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলার জন্য পৃথক নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
গরম শুধু অস্বস্তির কারণ নয়, প্রাণঘাতীও হতে পারে। প্রবল তাপ, অস্বাভাবিক উষ্ণ রাত, উচ্চ আর্দ্রতা এই সব কিছুর সম্মিলিত প্রভাব মানুষের শরীরের উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে প্রবীণ, শিশু, দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তি, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক এবং খোলা আকাশের নীচে কাজ করা মানুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এখনো পর্যন্ত তাপপ্রবাহকে কেন্দ্র সরকার জাতীয় স্তরে ঘোষিত দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে এই বিপদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাজ্যগুলির হাতে অর্থ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিধিও সীমিত। গবেষকদের মতে, যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতের গ্রীষ্মে নীরব বিপর্যয়ের মূল্য আরও অনেক বেশি প্রাণহানির মাধ্যমে দিতে হতে পারে ভারতকে।
❤ Support Us






