- দে । শ
- জুন ৩, ২০২৬
ভারতের উপর ফের অতিরিক্ত শুল্ক-প্রস্তাব আমেরিকার, তীব্র আপত্তি দিল্লির
ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে যখন বহুল প্রতীক্ষিত বাণিজ্য চুক্তির খসড়া নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা চলছে, ঠিক সে সময়েই নতুন বাণিজ্যিক চাপের ইঙ্গিত দিল আমেরিকা। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ভারত-সহ ৫৪টি দেশের উপর অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিল মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর (ইউএসটিআর)। যদিও দিল্লির দাবি, অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের বিষয় চলমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনার পরিসরের মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
বুধবার প্রকাশিত ‘ইউএসটিআর’-এর প্রস্তাব ঘিরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কারণ, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ভারতের রফতানিকারকদের উপর নতুন আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন মার্কিন বাজারই ভারতের বৃহত্তম রফতানি গন্তব্য। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ট্রেড অ্যাক্ট, ১৯৭৪-এর ধারা ৩০১ অনুযায়ী শুরু হওয়া তদন্তে দেখা গিয়েছে, ভারত, চিন, জাপান, ব্রিটেন, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া এবং সৌদি আরব-সহ ৫৪টি দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার জন্য কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। সে কারণেই ওই দেশগুলির পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ‘আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের অনেকেই এখনো জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি বন্ধ করতে ব্যর্থ। এর ফলে মার্কিন শ্রমিকদের অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি আর মেনে নেওয়া হবে না।’ আমেরিকার অবস্থানের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে দিল্লি। কেন্দ্রীয় সরকারের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘ইউএসটিআর’-এর প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী ২২ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষ জনশুনানিতে অংশগ্রহণের আবেদন করতে পারবে। ৬ জুলাই পর্যন্ত লিখিত মতামত জমা দেওয়া যাবে। তার পর ৭ জুলাই হবে জনশুনানি। শুনানি এবং প্রাপ্ত মতামত বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মার্কিন প্রশাসন।
বাণিজ্য মন্ত্রকের বক্তব্য, মার্কিন ‘ধারা ৩০১’-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। পাশাপাশি চলমান ভারত-আমেরিকা কাঠামোগত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা এগোচ্ছে। ফলে এ মুহূর্তে প্রস্তাবিত শুল্ককে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। তবে, বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আমেরিকার এই পদক্ষেপকে শুধুমাত্র শ্রম-সংক্রান্ত উদ্বেগের নিরিখে দেখা যাবে না। এর মধ্যে বৃহত্তর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টির কৌশলও কাজ করছে। ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, ‘ইউএসটিআর’-এর তদন্তের মূল প্রশ্ন ছিল ভারত নিজস্ব রফতানিতে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করছে কি না, তা নয়; বরং ভারত অন্য দেশ থেকে আসা এমন পণ্যের আমদানি রোধ করছে কি না। ফলে এ সিদ্ধান্ত আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে। তাঁর বক্তব্য, ‘ধারা ৩০১-এর তদন্ত এবং ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি; দুটিকে আলাদা ভাবে দেখা উচিত। প্রস্তাবিত শুল্ক বৃহত্তর আলোচনায় চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।’
উল্লেখযোগ্যভাবে, ভারত একা নয়। একই তালিকায় রয়েছে চিন, জাপান, ব্রিটেন, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ। অন্য দিকে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, ইকুয়েডর ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম, অর্থাৎ ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব করা হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য দফতরের দাবি, ওই দেশগুলি অন্তত নীতিগত ভাবে জোরপূর্বক শ্রম-নির্ভর পণ্যের আমদানি রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আমেরিকার নতুন পদক্ষেপের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় আরোপিত একাধিক শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। তার পর থেকেই বিকল্প আইনি কাঠামো খুঁজছিল ট্রাম্প প্রশাসন। সে প্রেক্ষাপটে নয়া নিয়মকে সামনে আনা হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। ‘ধারা ৩০১’ মার্কিন প্রশাসনের হাতে অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র। এ আইনের আওতায় শুধু শুল্ক আরোপ নয়, প্রয়োজনে বাণিজ্যিক সুবিধা প্রত্যাহার, পরিষেবা খাতে প্রবেশাধিকার সীমিত করা বা অন্যান্য প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব । মার্কিন আদালতও সাধারণত এই ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেয়। নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে চলা হলে শুল্কের হার কত হবে, তার উপর কার্যত কোনো নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা নেই।
এদিকে ‘ইউএসটিআর’-এর প্রতিবেদনে ভারতের বিরুদ্ধে আরও একটি সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিনের জোরপূর্বক শ্রম-নির্ভর তুলা সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি মধ্যবর্তী কেন্দ্র হিসেবে ভারত কাজ করছে। যদিও নয়াদিল্লি এখনো এই নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে পৃথক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ফলে, এ কথা স্পষ্ট, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নয়া শুল্ক-প্রস্তাব নতুন করে দু-দেশের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
❤ Support Us





