Advertisement
  • দে । শ
  • মে ২৯, ২০২৬

কর্ণাটক আসলে একটি বার্তা, লোকসভা যুদ্ধের আগে নতুন কৌশল পরীক্ষা রাহুলের ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কর্ণাটক আসলে একটি বার্তা, লোকসভা যুদ্ধের আগে নতুন কৌশল পরীক্ষা রাহুলের ?

কর্ণাটকে নেতৃত্ব বদল — অর্থাৎ সিদ্ধারামাইয়ার পরিবর্তে ডি কে শিবকুমারকে মুখ্যমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত — গত বছরের নভেম্বর থেকেই আলোচনায় ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তনের পথ সুগম করেন রাহুল গান্ধি নিজে, এমনটাই জানিয়েছে কংগ্রেস সূত্র।
সূত্রের খবর, সোমবার ও মঙ্গলবার রাহুল গান্ধি আলাদাভাবে কথা বলেন সিদ্ধারামাইয়া এবং ডি কে শিবকুমারের সঙ্গে। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধি ভদ্রা, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপালও।
এরপর হয় প্রায় ৩৫ মিনিটের একান্ত বৈঠক, যেখানে রাহুল গান্ধি সিদ্ধারামাইয়াকে পদত্যাগে রাজি করান। তিনি যুক্তি দেন, সিদ্ধারামাইয়ার মতো কংগ্রেসের অন্যতম বড় ওবিসি মুখকে শুধু কর্ণাটক নয়, দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকেও নজর দিতে হবে।
এই ‘বড় ছবি’-র কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। তবে সিদ্ধারামাইয়ার বক্তব্য ছিল, কর্ণাটকে কংগ্রেসের পুনর্নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ভরসা তিনিই। তাঁর প্রস্তাব ছিল, ডি কে শিবকুমার ২০২৮ সালে নতুন সরকার গঠন করে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু রাহুল গান্ধি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন বলে সূত্রের দাবি।
কংগ্রেসের অন্দরের মতে, এই সিদ্ধান্তে রাহুল গান্ধির সেই রাজনৈতিক বাস্তববোধের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে, যা তিনি কেরলের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনেও দেখিয়েছিলেন।
কেরলে কংগ্রেস বড় জয় পেলেও মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ জট চলেছিল। মুখ্যমন্ত্রী পদে আলোচনায় ছিলেন ভিডি সাথীশন, কে সি ভেনুগোপাল এবং রমেশ চেন্নিথলা। প্রথমদিকে রাহুল গান্ধি ভেনুগোপালকেই সমর্থন করেছিলেন। গান্ধি পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং অধিকাংশ বিধায়কের সমর্থন থাকায় তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছিল।
কিন্তু পরে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সাধারণ ভোটার এবং গুরুত্বপূর্ণ শরিক ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের পছন্দ ভিডি সাথীশন। তখন রাহুল গান্ধি নিজের অবস্থান বদলান। গান্ধি ভাইবোন ভেনুগোপালের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও দেন। কর্ণাটকের মতো এখানেও সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল।
দুই ক্ষেত্রেই প্রিয়াঙ্কা গান্ধির নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। কংগ্রেসের অন্দরমহলের মতে, কর্ণাটক ও কেরলের উদাহরণ দেখাচ্ছে যে এখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব — অর্থাৎ খাড়গে, গান্ধি পরিবার এবং ভেনুগোপালের মতো বিশ্বস্ত নেতারা — আগের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত। পরিস্থিতি বদলালে তারা নিজেদের প্রাথমিক পরিকল্পনাও বদলাতে পিছপা হচ্ছে না।
২০২২ সালে রাজস্থানে কংগ্রেস সরকারের সময় অশোক গেহলট এবং তাঁর তরুণ ডেপুটি সচিন পাইলটের সংঘাতের সময় এমন দৃঢ়তা দেখা যায়নি।
তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধি চেয়েছিলেন সচিন পাইলটকে সামনে আনতে। কারণ অনেকের মতে, তিনি ছিলেন আরও গতিশীল নেতা, যিনি ২০২৩ সালের নির্বাচনের আগে সরকারবিরোধী হাওয়া ঠেকাতে পারতেন এবং গুজ্জর সম্প্রদায়ের ভোট টানতে সক্ষম ছিলেন।
কিন্তু গেহলট ছিলেন দলের বর্ষীয়ান এবং হাইকমান্ডের ঘনিষ্ঠ নেতা। তিনি সরে দাঁড়াতে অস্বীকার করেন। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে টানাপোড়েন চলে এবং পাইলট একদল বিধায়ক নিয়ে বিজেপি-শাসিত হরিয়ানায় চলে যান।
রাজস্থান ২০২২ এবং কর্ণাটক ২০২৬-এর মধ্যে মিল সহজেই চোখে পড়ে। তবে তখন কংগ্রেস সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছিল, যার ফলেই দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন গভীর হয় এবং ২০২৩ সালের নির্বাচনে ক্ষমতা হারাতে হয়।
একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ছত্তিশগড়েও। ২০১৮ সালের জয়ের পর ভূপেশ বাঘেল এবং টি এস সিং দেও-র মধ্যে ‘রোটেশনাল মুখ্যমন্ত্রী’ চুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যখনই দলীয় নেতৃত্ব মুখ্যমন্ত্রী বদলের চেষ্টা করেছে, তখনই বাঘেলের চাপ বেড়েছে এবং বিভাজন আরও গভীর হয়েছে।
বাঘেল প্রকাশ্যে এই রোটেশন তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এটি তাঁর সরকারকে অস্থির করার চক্রান্ত। এই দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত। ফলস্বরূপ, যে দল একসময় ৯০টির মধ্যে ৬৯টি আসন জিতেছিল, তারা পরের নির্বাচনে মাত্র ৩৫টিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
কর্ণাটকেও একই ছবি দেখা গিয়েছে। ২০২৩ সালের নির্বাচনের পর সিদ্ধারামাইয়া ও ডি কে শিবকুমারের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি সমঝোতার কথা শোনা গেলেও তা কখনও প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি দল। পরবর্তী আড়াই বছরে দুই নেতা এবং তাঁদের অনুগামীরা একে অপরকে কটাক্ষ করতেই থেকেছেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরেই মুখ্যমন্ত্রী বদলের নির্ধারিত সময়সীমা সামনে এনে ডি কে শিবকুমারের শিবির প্রকাশ্যে চাপ বাড়াতে শুরু করে। রাজস্থানে সচিন পাইলট বা ছত্তিশগড়ে সিং দেও-র মতোই এটি ছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার চেষ্টা।
তবে এবার পার্থক্য একটাই — কংগ্রেস নেতৃত্ব সেই বার্তা শুনেছে এবং দ্রুত পদক্ষেপ করেছে। যদিও এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। সিদ্ধারামাইয়া এবং ডি কে শিবকুমার — দু’জনেরই শক্তিশালী জনভিত্তি এবং বিধায়ক সমর্থন রয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, রাহুল গান্ধির নেতৃত্বে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরণ বদলেছে। তিনি এখন খাড়গের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কে সি ভেনুগোপালের তৈরি ফিডব্যাক ব্যবস্থার উপরও নির্ভর করছেন।
ফলে সিদ্ধান্ত নিতে সময় কম লাগছে এবং সেই সিদ্ধান্ত আরও কার্যকরও হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্রের মতে, এখন রাহুল গান্ধি বড় কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে খাড়গের সঙ্গে আলোচনা করলেও, সমান গুরুত্ব দেন নিজের রাজনৈতিক মূল্যায়নকে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধি ও সোনিয়া গান্ধির মতামতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, এখন কংগ্রেসের প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। তবে তার আগে দলকে আরও ১৬টি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!