- দে । শ
- জুন ১৫, ২০২৬
মেঘহীন আকাশ, উধাও বৃষ্টি ! মৌসুমি বায়ুর ছন্দপতনে উদ্বিগ্ন দেশ, বর্ষার ঘাটতি ৬৪ শতাংশ
আচমকাই গতি হারিয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমিবায়ু। জুনের মাঝামাঝি সময়ে যখন দেশের বিস্তীর্ণ অংশে টানা বৃষ্টির প্রত্যাশা থাকে, তখন উল্টে উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়ছে অন্য ছবি। মধ্য, পূর্ব এবং উপদ্বীপীয় ভারতের বিশাল অংশ জুড়ে মেঘের দেখা নেই। বর্ষার চেনা মেঘমালার বদলে আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার। জাতীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি)-র সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ৪ জুন থেকে ১৫ জুনের মধ্যে সারা দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৬৪ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে।
আইএমডি-র তথ্য অনুযায়ী, জুনের দুই-সপ্তাহে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৫৩.৭ মিলিমিটার হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে হয়েছে মাত্র ১৯.২ মিলিমিটার। ফলে মৌসুমির শুরুর পরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয়েছে উদ্বেগের আবহ। বৃষ্টিপাতের বিচ্যুতি-মানচিত্রে মধ্য, দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল হলুদ এবং লাল রঙে চিহ্নিত হয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় কম থেকে অত্যন্ত কম বৃষ্টিপাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রবিবার ইনস্যাট-৩ডিএস উপগ্রহের তোলা ছবিতেও সে উদ্বেগ আরও স্পষ্ট। সক্রিয় মৌসুমির সময় যে বিস্তৃত মেঘবলয় সাধারণত আরব সাগর থেকে মধ্য ভারত হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে, এ বার তার দেখা মিলছে না। বরং মেঘের ঘনত্ব বেশি রয়েছে হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং গঙ্গা সমভূমির উত্তরাংশে। আবহাওয়াবিদদের মতে, আরব সাগর শাখার মৌসুমিবায়ু এ মুহূর্তে দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, মৌসুমি কি তবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? আবহাওয়াবিদদের অবশ্য বক্তব্য, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটি স্থায়ী নয়। তাঁদের মতে, সমস্যার উৎস সমুদ্রে নয়, বরং আকাশের অনেক উপরে। সাধারণত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমিবায়ুর শক্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় উচ্চস্তরের পূর্বালী জেট বায়ুপ্রবাহ। এই বায়ুপ্রবাহই উপমহাদেশের উপর উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুকে ঊর্ধ্বমুখী হতে সাহায্য করে, যার ফলে তৈরি হয় বজ্রগর্ভ মেঘ ও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিস্থিতি। কিন্তু এ বার পরিস্থিতি ভিন্ন। আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ, ‘পশ্চিমী জেট স্ট্রিম’ নামে পরিচিত উচ্চ বায়ুমণ্ডলের দ্রুতগামী বায়ুপ্রবাহ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই দক্ষিণে সরে এসেছে। তার জেরেই দুর্বল হয়ে পড়েছে ‘পূর্বালী জে’ট।
এই দুই বায়ুপ্রবাহের সংঘাতের ফলে মৌসুমির স্বাভাবিক সঞ্চালন ব্যাহত হচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পূর্বালী জেট উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুকে ঊর্ধ্বমুখী হতে সাহায্য করে। তার ফলে তৈরি হয় বজ্রগর্ভ মেঘ, বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি বজায় রয়েছে। ওই অঞ্চলের শুষ্ক ও উষ্ণ বায়ু মৌসুমি বায়ুর আর্দ্র স্রোতকে বাধা দিচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতের হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলে সক্রিয় পশ্চিমি ঝঞ্ঝাও মৌসুমি বায়ুর অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।ফলে আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা সত্ত্বেও জলীয় বাষ্প দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে মেঘ তৈরি করতে পারছে না।
বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া বৃষ্টিবাহী আবহাওয়াও স্থলভাগের গভীরে ঢুকতে পারছে না। আবহাওয়াবিদদের মতে, এটি এক ধরনের ‘মৌসুমি বিরতি’ বা ‘মনসুন পজ়’, যার নেপথ্যে রয়েছে উচ্চ বায়ুমণ্ডলের জটিল গতিবিদ্যা পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে মধ্য ভারত, পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ উপদ্বীপের বিভিন্ন রাজ্যে। কর্নাটক, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র সহ মধ্য ভারতের কিছু অংশে মৌসুমির অগ্রগতি হলেও প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত হয়নি। বেশ কিছু এলাকায় ইতিমধ্যেই দীর্ঘায়িত শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দিতে শুরু করেছে। এখনো পর্যন্ত কেরালা, তামিলনাড়ু, গোয়া এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে মৌসুমি বায়ু সম্পূর্ণভাবে প্রবেশ করেছে। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং বিহারের কিছু অংশে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করলেও মধ্য ও উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বর্ষা এখনো পৌঁছয়নি।
দেশে মৌসুমির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। এ বছর রাজ্যে বর্ষার প্রবেশ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কিছুটা দেরিতে হয়েছে। যদিও এখন প্রায় গোটা রাজ্যই মৌসুমি বায়ুর আওতায় চলে এসেছে, তবু প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাতের দেখা মিলছে না। চলতি মাসের প্রথম ১৪ দিনে কলকাতাসহ রাজ্যের একাধিক জেলায় বৃষ্টির ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা হবিবুর রহমান বিশ্বাস জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকা ও সংলগ্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দক্ষিণবঙ্গের অধিকাংশ জেলায় এখনই টানা বর্ষণের সম্ভাবনা কম। যেখানে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হচ্ছে, মূলত সেখানেই বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আপাতত আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
মধ্য ভারত, উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং সংলগ্ন অঞ্চলের কৃষিকাজ মূলত বৃষ্টিনির্ভর। বিস্তীর্ণ অঞ্চলই দেশের ‘রেইন-ফেড’ কৃষি বলয়। কৃষিকাজ থেকে জলসম্পদ; দেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে বর্ষা, জুনের এই অস্বাভাবিক বিরতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পড়তে পারে খরিফ চাষ, জলাধারের সঞ্চিত জল আর গ্রামীণ অর্থনীতির উপর।যদিও আবহাওয়া দফতর এখনই আশাহত হতে নারাজ। পূর্বাভাস বলছে, ২০ জুনের পর উচ্চস্তরের পূর্বালী জেট শক্তিশালী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া বৃষ্টিবাহী ব্যবস্থা আবার সক্রিয় হয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। তাতে মৌসুমিবায়ু নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে। জুনের দ্বিতীয়ার্ধে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে পারে। ফলে আপাতত অপেক্ষাই ভরসা।
❤ Support Us








