- দে । শ
- জুন ১, ২০২৬
জাতীয় শিক্ষানীতির জেরে ‘জিরো ইয়ার’, স্নাতকোত্তরে ভর্তি বন্ধ যাদবপুর-প্রেসিডেন্সিতে
রাজ্যের উচ্চশিক্ষায় এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সাক্ষী হতে চলেছে পড়ুয়া ও শিক্ষকসমাজ। এক দিকে বিভিন্ন বোর্ডের দ্বাদশ শ্রেণির ফলপ্রকাশের পর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্নাতক স্তরে ভর্তি প্রক্রিয়া জোরকদমে শুরু হয়েছে, অন্য দিকে স্নাতকোত্তর স্তরে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি–২০২০’ (এনইপি) কার্যকর হওয়ার ফলে চলতি শিক্ষাবর্ষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে কোনো নতুন ভর্তি হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষায়, এটি একটি ‘জিরো ইয়ার’ বা ‘শূন্য বর্ষ’। অর্থাৎ, এক বছরের জন্য কার্যত থমকে যাচ্ছে প্রচলিত স্নাতকোত্তর ভর্তি প্রক্রিয়া।
জাতীয় শিক্ষানীতির সুপারিশ অনুযায়ী রাজ্যের এই দুই ইউনিটারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যেই ৪ বছরের স্নাতক পাঠক্রম চালু হয়েছে। নতুন ৪+১ কাঠামোয় ৪ বছরের স্নাতক কোর্স সম্পূর্ণ করার পর এক বছরের স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে পড়ার সুযোগ থাকবে। কিন্তু রূপান্তরের মধ্যবর্তী সময়ে তৈরি হয়েছে বিশেষ পরিস্থিতি। যাদবপুর এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাখ্যা, বর্তমানে যাঁরা ৪ বছরের স্নাতক পাঠক্রমে পড়ছেন, তাঁরা এখনো চতুর্থ বর্ষে রয়েছেন। ২০২৩ সালে যাঁরা নতুন পাঠক্রমে ভর্তি হয়েছিলেন, তাঁদের স্নাতক ডিগ্রি সম্পূর্ণ হবে ২০২৭ সালে। ফলে এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোনো আন্তঃ ব্যাচ নেই, যারা স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হতে পারবে। সে কারণেই এবছর কলা ও বিজ্ঞান বিভাগের প্রচলিত মাস্টার্স কোর্সে নতুন করে ভর্তি নেওয়ার প্রক্রিয়া হচ্ছে না।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। সেখানে ৩ বছর পর কোর্স ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার বা ‘এগজিট অপশন’-এর সুযোগই নেই। ফলে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়ার সম্ভাব্য কোনো প্রার্থী এ বছর তৈরি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, জাতীয় শিক্ষানীতির ৪+১ কাঠামোর কারণে ডে এবং ইভনিং— দু–ধরনের মাস্টার্স কোর্সেই এ বছর ভর্তি বন্ধ রাখা হচ্ছে। বর্তমানে স্নাতক স্তরের চতুর্থ বর্ষে থাকা পড়ুয়ারা ২০২৭ সালে পাশ করবেন। তার পর থেকেই এক বছরের স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে সরাসরি ভর্তি নেওয়া শুরু হবে। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতকোত্তর ভর্তি আগের মতোই চলবে এবং জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিনহার মতে, এ পরিস্থিতি এড়ানো কার্যত অসম্ভব। তাঁর বক্তব্য, একই সঙ্গে এক বছরের এবং দু-বছরের স্নাতকোত্তর পাঠক্রম চালানো কোনো ইউনিটারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকসংখ্যা এবং পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত। উপরন্তু, রাজ্যের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখন ৪ বছরের স্নাতক পাঠক্রমের আওতায় চলে আসায় এ বছরের এ বিরতি বড়ো ধরনের সঙ্কট তৈরি করবে না বলেই তাঁর ধারণা।
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ছবি। যদিও সেখানে ৩ বছর পর কোর্স থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, বাস্তবে কোনো শিক্ষার্থীই তৃতীয় বর্ষের শেষে সেরকম আবেদন করেননি। ফলে সেখানেও স্নাতকোত্তরে ভর্তির মতো কোনো ব্যাচ তৈরি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেবজ্যোতি কোনার জানান, ৪ বছরের স্নাতক পাঠক্রম চালু থাকা বিভাগগুলিতে এ বছর কার্যত স্নাতকোত্তরের ‘জিরো ইয়ার’। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এক বছরের স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রেই যে ভর্তি বন্ধ হচ্ছে, তা নয়। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, মলিকিউলার বায়োটেকনোলজি, ভাইরোলজি এবং ইমিউনোলজির মতো কয়েকটি বিশেষায়িত আন্তঃবিষয়ক কোর্সে আগের মতোই ভর্তি চলবে। কারণ, এই বিষয়গুলির সঙ্গে সরাসরি কোনও স্নাতক স্তরের পাঠক্রম যুক্ত নেই। ফলে সেগুলি এখনও দু’বছরের মাস্টার্স কোর্স হিসেবেই পরিচালিত হবে।
যেখানে যাদবপুর ও প্রেসিডেন্সি সাময়িক বিরতির পথে হাঁটছে, সেখানে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৪ বছরের স্নাতক পাঠক্রম থেকে যাঁরা ৩ বছর পর ‘এগজ়িট অপশন’ গ্রহণ করবেন, তাঁদের জন্য ২ বছরের মাস্টার্স কোর্সে ভর্তির সুযোগ খোলা থাকবে। আগস্ট মাস থেকেই কলা, চারুকলা এবং ভিজ্যুয়াল আর্টসের বিভিন্ন স্নাতকোত্তর বিভাগে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হবে। উচ্চশিক্ষা মহলের একাংশের মতে, স্নাতকোত্তর স্তরে ‘জিরো ইয়ার’-এর এই সিদ্ধান্ত জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কয়েক বছরের মধ্যেই রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার কাঠামো আমূল বদলে যাবে। যাদবপুর ও প্রেসিডেন্সির এ বছরের সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনেরই স্পষ্ট পূর্বাভাস বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ।
এদিকে, স্নাতকোত্তর স্তরে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যেই স্নাতক স্তরে ভর্তি নিয়ে ব্যস্ত রাজ্যের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই কলা এবং বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক স্তরের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কলা বিভাগে বাংলা, ইংরেজি, তুলনামূলক সাহিত্য, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা, দর্শন, সংস্কৃত এবং অর্থনীতি নিয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ভূতত্ত্ববিদ্যা, গণিত এবং ভূগোলে ভর্তি নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবেদনকারীদের নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের নম্বরের পাশাপাশি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত প্রবেশিকা পরীক্ষার ফলও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
যদিও কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বোর্ড পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতেই মেধাতালিকা প্রস্তুত হবে। অনলাইনে আবেদন জানানোর শেষ দিন ৫ জুন। আবেদনমূল্য জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৬ জুন। সংরক্ষিত শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য প্রবেশিকা ফি ১০০ টাকা এবং অসংরক্ষিতদের জন্য ২০০ টাকা ধার্য করা হয়েছে। কলা বিভাগের প্রবেশিকা ২৫ জুন থেকে ৩ জুলাইয়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হবে। সম্ভাব্য মেধাতালিকা প্রকাশের দিন ১৫ জুলাই। অন্য দিকে বিজ্ঞান বিভাগের বিভিন্ন বিষয়ের প্রবেশিকা অনুষ্ঠিত হবে জুন মাসের নির্দিষ্ট দিনে এবং মেধাতালিকা প্রকাশিত হবে ৮ জুলাই।
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়েও এ বছর স্নাতক স্তরে ভর্তির জন্য পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল জয়েন্ট এন্ট্রান্স এগজ়ামিনেশন বোর্ড এ বার আর পিইউবিডিইটি পরীক্ষা নিচ্ছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ব্যবস্থায় ভর্তি প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। অর্থনীতি, জীবনবিজ্ঞান, রসায়ন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং পরিসংখ্যান বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, দর্শন, সমাজবিদ্যা, পারফর্মিং আর্টস, বায়োটেকনোলজি, ভূগোল, জিয়োলজি, গণিত এবং পদার্থবিদ্যার মতো বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তি নেওয়া হবে। প্রবেশিকার অ্যাডমিট কার্ড প্রকাশ হবে ৬ জুন। পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১২ থেকে ১৪ জুনের মধ্যে। সম্ভাব্য মেধাতালিকা প্রকাশিত হবে ২৪ জুন। প্রবেশিকা ছাড়া যে বিষয়গুলিতে ভর্তি হবে, সেগুলির মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে ৯ জুন।
অন্য দিকে, রাজ্যের ৪৬০টি সরকারি, সরকার-পোষিত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতক স্তরের ভর্তির জন্য অভিন্ন কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। গত ১৮ মে থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। আগ্রহী পড়ুয়ারা ‘বাংলার উচ্চশিক্ষা’ পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে পারছেন। এ বছর একজন শিক্ষার্থী সর্বাধিক ২৫টি বিষয়ে আবেদন করতে পারবেন এবং তার জন্য কোনও আবেদনমূল্য দিতে হবে না। দেশের যে কোনো বোর্ড থেকে দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন।
উচ্চশিক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, মেধাতালিকা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে ‘বেস্ট অফ ফোর’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। নম্বর সমান হলে নির্দিষ্ট ‘টাইব্রেকার’ নিয়মও কার্যকর থাকবে। কলেজে সরাসরি যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সমস্ত তথ্য এসএমএস ও ই-মেলের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে। ভর্তি সংক্রান্ত অর্থও শুধুমাত্র অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমেই জমা করা যাবে। ১ জুন আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হবে। ৯ জুন প্রকাশিত হবে কলেজ ও বিষয়ভিত্তিক মেধাতালিকা। তার পর ধাপে ধাপে ভর্তি ও আপগ্রেডেশন প্রক্রিয়া চলবে। ৬ জুলাই থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। প্রথম দফার ভর্তি শেষ হলে শুরু হবে মপ-আপ রাউন্ড। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে ভর্তি প্রক্রিয়া। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে নথি যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
❤ Support Us






