- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- আগস্ট ১৮, ২০২৬
শারীরিক অবস্থার অবনতি, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইমরান খানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ পাকিস্তানের শীর্ষ আদালতের
জেল থেকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগের আবহে মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইমরানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছে পাকিস্তানের শীর্ষ আদালত। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলবে। একই সঙ্গে ইমরানের শারীরিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সে বোর্ডে ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পাশাপাশি তাঁর বোন ডাক্তার আলিমা খানকেও রাখা হবে।
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে বন্দি ইমরান। একাধিক দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর থেকেই জেলবন্দি রয়েছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বার বার দাবি করেছে ইমরানের দল ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ’ (পিটিআই)। গত কয়েক মাসে ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে একের পর এক দাবি সামনে এসেছে। বিশেষ করে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, রক্তচাপের ওঠানামা আর প্রবল মানসিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তাঁর পরিবার ও দল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছেন ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা উপদেষ্টা জুলফিকার আলি বুখারি। তাঁর মতে, ‘এটি অত্যন্ত স্বাগত জানানোর মতো নির্দেশ। তবে আমরা চেয়েছিলাম, সিদ্ধান্তটি আরও আগে নেওয়া হোক। তা হলে তাঁর চোখ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের এতটা অবনতি হতো না।’
ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। এর আগে একাধিকবার তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি, তাঁকে কার্যত একঘরে করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে আদিয়ালা জেলের সামনে প্রবল বিক্ষোভও হয়। অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে পরিবার বা দলের কাউকে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না ইমরানের সঙ্গে। সে সময়ও সুপ্রিম নির্দেশে তাঁর সাথে দেখা করতে পান তাঁর বোন ও আইনজীবী। সাক্ষাতের পর উজমা জেলের পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি ছিল, ইমরানকে অত্যন্ত খারাপ পরিবেশে রাখা হয়েছে এবং সেই বন্দিদশা তাঁর কাছে ‘মানসিক নির্যাতন’-এর সমান। নিজের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে দায়ী করেছেন ইমরান, বলেও জানিয়েছিলেন উজমা। যদিও এ অভিযোগের কোনো সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, নতুন করে বিতর্ক সামনে আসতেই, সোমবারই আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, চিকিৎসার পরে তাঁর দৃষ্টিশক্তির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। এমনকি তা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে বলেও জানানো হয়েছিল। কিন্তু সে দাবিতে সন্তুষ্ট নয় ইমরানের পরিবার এবং ‘পিটিআই’। মাস ছয়েক আগে ইমরানের আইনজীবী দাবি করেছিলেন, জেলে থাকাকালীন তাঁর ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যেই আদালতে জমা পড়া চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি ঘিরেও নতুন করে উদ্বেগ ছড়ায়। ওই রিপোর্টে ইমরানের রক্তচাপের ওঠানামা, হৃদ্স্পন্দনে অস্বাভাবিকতা আর প্রবল মানসিক চাপের কথা উঠে এসেছে।
যদিও, ইমরানের সাম্প্রতিক মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি। তবে পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সমাজমাধ্যমে সে রিপোর্টের কিছু তথ্য তুলে ধরে পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আগামী তিন মাস ইমরানের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কিছু সমস্যা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। আলভি আরও জানান, একাধিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে ইমরানের চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, রিপোর্টে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো ইমরানের প্রবল উদ্বেগ ও মানসিক চাপ, হৃদ্স্পন্দনের সমস্যা এবং উচ্চ রক্তচাপ। রিপোর্টে অনিদ্রার কথা সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও ইমরান যে ধরনের ওষুধ খাচ্ছেন, তা থেকে ঘুমের সমস্যার ইঙ্গিত মিলছে বলেও দাবি করেছেন আলভি।
এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দিন ধরেই ইমরানকে জেল থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের দাবি জানিয়ে আসছিল তাঁর পরিবার ও ‘পিটিআই’।মঙ্গলবার সে দাবিতেই সিলমোহর দিয়েছে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। ‘পিটিআই’-এর মুখপাত্র নঈম হায়দার পাঞ্জুথা জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইমরানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁকে সেখানে রাখা হবে। দলের তরফে আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জুলফিকার বুখারি বলেন, শুধু হাসপাতালে স্থানান্তর করলেই হবে না। চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ইমরানকে হাসপাতালে রাখা উচিত।
উল্লেখ্য, পাকিস্তান ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দীর্ঘ কারাবাস আর তাঁর বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলি পাকিস্তানের রাজনীতিতে বহু দিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রে। ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হয়। রাষ্ট্রীয় উপহার সংক্রান্ত মামলা থেকে বেআইনি ভাবে বিয়ে— বিভিন্ন অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। যদিও কয়েকটি মামলায় তাঁর সাজা স্থগিত বা বাতিল হয়েছে, বেশ কিছু মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলছে। ইমরান অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁকে রাজনৈতিক ভাবে নিষ্ক্রিয় করতেই একের পর এক মামলা করা হয়েছে।
২০১৮ সালে ইমরানের নেতৃত্বেই পাকিস্তানে ক্ষমতায় এসেছিল ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ’ বা ‘পিটিআই। এখনো দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশে দলটির উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ‘পিটিআই’-এর নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়। ফলে দলের প্রার্থীদের নির্দল হিসেবে ভোটে লড়তে হয়েছিল। ইমরানের জেল-জীবন নিয়ে পাকিস্তানের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত-সহ বিভিন্ন দেশের একাধিক প্রাক্তন ও বর্তমান ক্রিকেটার তাঁর কারাবাসের পরিস্থিতি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছিলেন। বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী—ইমরানের দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর এ বার তাঁর শারীরিক অবস্থাই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর হাসপাতালেই আপাতত তাঁর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যপরীক্ষার দিকে তাকিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহল।
❤ Support Us






