Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ১৮, ২০২৬

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের ?

ভারতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বর্তমান পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসিই আপাতত বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট । ফাঁসির পরিবর্তে প্রাণঘাতী ইনজেকশন, গুলি, ইলেকট্রোকিউশন বা গ্যাস চেম্বারের মতো তুলনামূলকভাবে কম যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়ে করা একটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছে বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ ।

আবেদনকারী আইনজীবী ঋষি মালহোত্রা দাবি করেছিলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে এমন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত, যাতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির যতটা সম্ভব কম শারীরিক যন্ত্রণা হয় এবং তাঁর মানবিক মর্যাদাও বজায় থাকে । তিনি ফাঁসিকে ‘অমানবিক, নিষ্ঠুর ও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক’ বলে উল্লেখ করে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণের আবেদন জানান ।

মালহোত্রার আবেদনে প্রাণঘাতী ইনজেকশন, গুলি, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে মৃত্যু এবং গ্যাস চেম্বারের মতো পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয় । তাঁর দাবি ছিল, এসব পদ্ধতিতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব ।

আবেদনকারী ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৫৪(৫)-এর অধীনে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার দাবি জানান । পাশাপাশি, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে একজন ব্যক্তির ‘মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুর অধিকার’কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদনও করা হয় ।

আবেদনে দাবি করা হয়, ফাঁসির পর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে — প্রায় ৪০ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগার কথাও উল্লেখ করা হয় । অন্যদিকে, গুলি বা প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মতো পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াটি প্রায় পাঁচ মিনিটে সম্পন্ন হতে পারে বলে আবেদনকারী যুক্তি দেন ।

আবেদনকারী জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবের কথাও তুলে ধরেন । সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে তা যেন সম্ভবপর সর্বনিম্ন যন্ত্রণা সৃষ্টি করে, সেই নীতির উল্লেখ রয়েছে বলে তিনি আদালতকে জানান ।

ফাঁসির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের তিনটি রায়কে পুনর্বিবেচনার জন্য বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর আবেদনও করা হয়েছিল । কিন্তু বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ জানায়, সেই রায়গুলি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর মতো পর্যাপ্ত কারণ বর্তমানে নেই ।

ফলে আপাতত ভারতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রচলিত পদ্ধতি হিসেবে ফাঁসিই বহাল থাকছে । তবে আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে — এই রায়কে ভবিষ্যতের জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না । নতুন ও শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক বা অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ যদি সামনে আসে এবং তাতে প্রমাণিত হয় যে আগের সিদ্ধান্তের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পরবর্তী গবেষণায় বদলে গেছে, তাহলে ভবিষ্যতে বিষয়টি আবার সাংবিধানিকভাবে পরীক্ষা করা যেতে পারে ।

সুপ্রিম কোর্ট আরও জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিকল্প পদ্ধতিগুলি নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে পারে । সেই কমিটি বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন পদ্ধতির কার্যকারিতা, যন্ত্রণা এবং মানবিক মর্যাদার বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করতে পারে ।

মামলার শুনানির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল আর. ভেঙ্কটরামানি জানিয়েছিলেন, সরকার ইতিমধ্যেই এই বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে ।

২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি পরিবর্তনে কেন্দ্রের অনীহা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল । এমনকি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফাঁসি অথবা প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মধ্যে একটি পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে ।

কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তার হলফনামায় জানায়, বাস্তবে এমন ব্যবস্থা চালু করা ‘বাস্তবসম্মতভাবে সম্ভব নয়’।

এতে আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করে। শুনানির সময় বেঞ্চ মৌখিকভাবে মন্তব্য করেছিল, “সমস্যা হলো, সরকার পরিবর্তন করতে চাইছে না ।” আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছিল, ফাঁসি অত্যন্ত পুরনো একটি পদ্ধতি এবং সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি ও প্রযুক্তিরও পরিবর্তন হয়েছে ।

কেন্দ্রের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী সোনিয়া মাথুর যুক্তি দেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়টি মূলত একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সরকারের ।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে এই মুহূর্তে ভারতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে ফাঁসি পদ্ধতিই বহাল থাকছে। তবে আদালত ভবিষ্যতের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি ।

যদি ভবিষ্যতে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক বা বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায় যে ফাঁসির তুলনায় অন্য কোনো পদ্ধতি কম যন্ত্রণাদায়ক এবং বেশি মানবিক, তাহলে বিষয়টি আবার আদালতের সামনে সাংবিধানিক পরীক্ষার জন্য আসতে পারে ।

অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্ট আপাতত ফাঁসি বাতিল করেনি, কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আরও মানবিক ও কম যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতি নিয়ে ভবিষ্যতে পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেনি ।

সুপ্রিম কোর্ট ২২ জানুয়ারি শুনানি শেষ করে রায় সংরক্ষণ করেছিল । পরবর্তী রায়ে আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে বর্তমান সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো সাংবিধানিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে না ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!