- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ২৪, ২০২৬
আন্দোলিত রাজধানী, সংসদে অচলাবস্থা: বৈঠকে কাটল না জট, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অনড় সিজিপি। প্রশ্নফাঁসে কড়া আইনের পথে কেন্দ্র
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘিরে শুরু হওয়া জেন-জি আন্দোলন গতি বাড়াচ্ছে। তার অভিঘাত সরাসরি লেগেছে সংসদের অন্দরমহলে। ২০ জুলাই সিজিপি-র ‘সংসদ চলো’ অভিযানে পুলিশের লাঠিচার্জ বিক্ষোভের ঝাঁজ বাড়িয়েছে। দেশের নানা প্রান্তে শুরু হয়েছে সংহতি আন্দোলন। এ পরিস্থিতিতে শুরু থেকেই থমছে আছে বাদল অধিবেশনের স্বাভাবিক কাজকর্ম। শুক্রবারও লোকসভার অধিবেশন শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই যে দৃশ্য দেখা গেল, তাতে স্পষ্ট— নিট-সহ একাধিক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এখন শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিতর্ক নয়, তা পরিণত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক অস্বস্তির অন্যতম বড়ো কারণেও।
অধিবেশন শুরু হতেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগানে সরব হয়ে ওঠেন বিরোধী সাংসদেরা। ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ, টেবিল চাপড়ে প্রতিবাদ, লাগাতার স্লোগান— ক্রমশ অশান্ত হয়ে ওঠে লোকসভার পরিবেশ। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একাধিক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন স্পিকার। শেষ পর্যন্ত, সোমবার পর্যন্ত লোকসভার অধিবেশন মুলতুবি রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। রাজ্যসভাতেও একই চিত্র। ফলে প্রশ্নফাঁস-কাণ্ডে শুক্রবারও কার্যত অচল থাকল সংসদের দুই কক্ষ। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিট অনিয়ম নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করার আগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা দেওয়া উচিত। দলের নেতারা অভিযোগ করেছেন, দেশের শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে সরকারের আরও দায়বদ্ধ ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। সংসদের বাইরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত। সংসদ ভবনের সামনে বিরোধী দলগুলির বিক্ষোভ যেমন চলেছে, তেমনই যন্তর মন্তরে আন্দোলনের ঝাঁঝ আরও বেড়েছে। কয়েক দিন ধরে চলা ছাত্র-যুবদের অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সমাজের নানা স্তরের মানুষ। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ শুক্রবার দেশজুড়ে সংহতি কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য, শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে শুধু আশ্বাস নয়, দায়বদ্ধতারও প্রমাণ দিতে হবে কেন্দ্রকে।
এ আবহেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছিল কেন্দ্রীয় সরকার এবং আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা। দিল্লির ভিপি হাউসে প্রায় দু-ঘণ্টার বৈঠকে সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিং। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিত্ব করেন সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। দীর্ঘ আলোচনার পরও অবশ্য অচলাবস্থা কাটার কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। সূত্রের খবর, প্রশ্নফাঁস রুখতে ইতিমধ্যেই কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছে এবং আগামী দিনে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার বিস্তারিত রূপরেখা আন্দোলনকারীদের সামনে তুলে ধরে কেন্দ্র। পাশাপাশি আন্দোলনকারীরাও তাঁদের দাবিগুলি স্পষ্ট ভাষায় সরকারের সামনে রাখেন। আলোচনায় বেশ কয়েকটি বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও একটিমাত্র প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরেনি দুই পক্ষ— শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশ্নফাঁসের মতো নজিরবিহীন ঘটনার নৈতিক দায় এড়াতে পারেন না শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর পদত্যাগ ছাড়া আন্দোলন প্রত্যাহারের প্রশ্নই ওঠে না। অন্যদিকে কেন্দ্রও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। তবে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করতে শনিবার দুপুর পর্যন্ত সময় চেয়েছে সরকার।
বৈঠক শেষে আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সাংবাদিকদের বলেন, সরকার তাঁদের কয়েকটি দাবির সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। তাঁর কথায়, ‘আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা না দিলে আন্দোলন আরও বৃহত্তর আকার নেবে। সরকার সিদ্ধান্ত জানাতে আরও একদিন সময় চেয়েছে।’ সরকারি সূত্র অবশ্য দাবি করছে, আলোচনায় যথেষ্ট ইতিবাচক পরিবেশ ছিল। আন্দোলনকারীদের একাধিক দাবির বিষয়ে কেন্দ্র নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্নফাঁসের জেরে আত্মহত্যা করা পরীক্ষার্থীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তার মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি আত্মহত্যা করা পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাবেও নীতিগত সম্মতির ইঙ্গিত মিলেছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি।
কিন্তু সমস্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে একটিই প্রশ্ন— ধর্মেন্দ্র প্রধানের ভবিষ্যৎ। সরকারের বক্তব্য, প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করা হবে। কিন্তু শুধুমাত্র বিরোধীদের দাবির মুখে কোনো মন্ত্রীকে সরানো হবে না। আর এই অবস্থানই আলোচনার পথকে কঠিন করে তুলেছে।ফলে শুক্রবার সংসদে যে রাজনৈতিক সংঘাতের ছবি দেখা গেল, তার প্রতিফলন ছিল আলোচনার টেবিলেও। এক দিকে সরকারের অনমনীয় অবস্থান, অন্য দিকে আন্দোলনকারীদের আপসহীন মনোভাব— দুইয়ের টানাপোড়েনে শনিবারের বৈঠক এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে সম্প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়ে দিলেন, দেশের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধ কোনো ভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দিয়ে তিনি বলেছেন, যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও আপস করা হবে না এবং এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই নেওয়া হবে ‘সবচেয়ে কঠোর’ ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রীর সে বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের তরফেও বড়ো সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত সামনে আসে। সরকারি সূত্রের খবর, ‘Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Act, 2024’-এ একগুচ্ছ সংশোধনী আনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে এমন কঠোর আইন তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের সাহস কেউ না দেখায়।
সূত্রের দাবি, নতুন সংশোধনীতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের জন্য শাস্তির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। বর্তমানে যেখানে সাধারণ ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে, সেখানে সংশোধিত আইনে জেলের মেয়াদ বেড়ে পাঁচ থেকে দশ বছর হতে পারে। একই সঙ্গে জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত করার কথাও ভাবা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সংগঠিত প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত আরও দ্রুত এবং কার্যকর করতে বিশেষ তদন্ত কাঠামো তৈরির পাশাপাশি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থাও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি মহলের বক্তব্য, এত দিন প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতারি হলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতো। তার ফলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যেত না। নতুন আইনি কাঠামোর লক্ষ্য সেই সমস্যারই সমাধান করা। একই সঙ্গে পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা, প্রযুক্তি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বেসরকারি সংস্থাগুলির জবাবদিহিও আরও কঠোর করার পরিকল্পনা রয়েছে। অপরাধের তথ্য গোপন করা বা নিরাপত্তায় গাফিলতির ক্ষেত্রেও বাড়তে পারে শাস্তির মাত্রা।
আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকার লিখিতভাবে জানিয়েছে যে অহিংস প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি পুনর্বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি নিট প্রশ্নফাঁসের জেরে আত্মহত্যা বা চরম মানসিক বিপর্যয়ের শিকার পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। যদিও এই আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আন্দোলনকারীদের একাংশ এখনো সংশয়ে। ওয়াংচুক অনশন ভাঙলেও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এখন দিল্লির যন্তর মন্তর। সেখানে প্রতিদিনই বাড়ছে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা। ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, প্রাক্তন পরীক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। শুক্রবার দেশজুড়ে সংহতি দিবস পালনের ডাক দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। সংগঠনের বক্তব্য, দিল্লিতে সোমবারের বিক্ষোভে যাঁরা পুলিশি বলপ্রয়োগের শিকার হয়েছেন, তাঁদের প্রতি সংহতি জানাতেই এই কর্মসূচি।
আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনার বিরুদ্ধে কেবল আইনের কঠোরতা যথেষ্ট নয়। পরীক্ষা পরিচালনার পুরো ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং দায়বদ্ধ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। তাঁদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের আস্থা একবার ভেঙে গেলে শুধু আইন করেই তা ফিরিয়ে আনা যায় না; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতারও। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারও চাইছে, আন্দোলনের তীব্রতা আর না বাড়ুক। তাই এক দিকে আইন কঠোর করার বার্তা, অন্য দিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপ— এই দুই পথেই এগোতে চাইছে নয়াদিল্লি। তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের প্রশ্নে সরকার এখনও অবস্থান না বদলানোয় আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
❤ Support Us





