Advertisement
  • এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
  • আগস্ট ২৮, ২০২৫

মরক্কোর মরুভূমিতে ‘পাঙ্ক রক’ ডাইনোসর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মরক্কোর মরুভূমিতে ‘পাঙ্ক রক’ ডাইনোসর

ডাইনোসরের ‘দেশে’ নতুন অতিথির আগমন। কাঁটার পাহাড় যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গলা জুড়ে মিটার-লম্বা কাঁটা, পিঠ থেকে লেজ অবধি বর্মে মোড়া, মরক্কোর বুক চিরে এমনই এক অজানা ও অদ্ভুত দর্শন ডাইনোসরের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এই প্রজাতির নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্পাইকোমেল্লাস আফের’। বয়স? প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন বছর। বয়সে এটি যে শুধু প্রাচীন, তাই নয়—এটি হল বিশ্বে এখনও পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন ‘অ্যান্কইলোসর’। এই প্রজাতি তার মজবুত বর্ম ও দেহজুড়ে হাড়ের পাত ও কাঁটাযুক্ত গঠন দিয়ে বিখ্যাত। আফ্রিকা মহাদেশে এই প্রথম এমন বর্মযুক্ত কোনো ডাইনোসরের খোঁজ মিলল।

ঠিক যেন কাঁটার রাজপুত্র সে। শরীরজুড়ে কাঁটা আর বর্ম। কাঁটা শুধু পিঠে বা লেজে নয়, তার গলাতেও ছিল মিটার-লম্বা হাড়ের তৈরি কলার, যেখান থেকে বেরিয়ে ছিল বিশাল বড়ো বড়ো কাঁটা—কোনোটির দৈর্ঘ্য ৮৭ সেন্টিমিটার, অর্থাৎ প্রায় ৩ ফুট! তার উপরে প্রতিটি পাঁজরে ছিল ৩-৪টি করে কাঁটা, এবং নিতম্বের উপরেও ছিল বর্মে ঢাকা। গবেষকদের ভাষায়, এই ‘স্পাইকোমেল্লাস’-এর শরীরে এত কাঁটা ছিল যে, দেখে মনে হত, এ যেন হেঁটে বেড়ানো একটি বিশাল কাঁটাওয়ালা গিরগিটি।

গবেষণার অন্যতম নেতৃত্বে থাকা ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহ্যামের অধ্যাপক রিচার্ড বাটলার জানিয়েছেন, ‘আমি জীবনে বহু বর্মযুক্ত ডাইনোসর নিয়ে কাজ করেছি, কিন্তু এমন আগে দেখিনি। ‘স্পাইকোমেল্লাস’ দেখতে ছিল ‘পাঙ্ক রকার’-দের মতো। যেমন ১৯৭০-এর দশকের পাঙ্ক সংগীতশিল্পীদের চুলে ও গায়ে থাকত খাড়া, কাঁটাযুক্ত অলংকার, ঠিক তেমনই।’ লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপিকা স্যুসানাহ মেইডমেন্ট জানিয়েছেন, জীবাশ্মটি প্রথম দেখেই তাঁর চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। গলা থেকে শুরু করে পাঁজর, পিঠ, নিতম্ব, এমনকি লেজ—প্রত্যেকটি অংশই ছিল কাঁটা, বর্ম, আর জটিল গঠনে ঢাকা। এমন গঠন কোনো জীবিত বা বিলুপ্ত প্রাণীর মধ্যে আগে কখনো দেখা যায়নি। কিছু কাঁটা একে অপরের সঙ্গে মিশে এমন যৌগিক কাঠামো তৈরি করেছে যে, কিছু ছিল অশ্বক্ষুরাকৃতির পাতের মতো, আবার কিছু এমন ছিল যার পরিচয় আজও আমাদের অজানা স্পষ্ট নয়। অভিভূত মেইডমেন্ট বলেছেন, ‘এক সময় তো মনে হচ্ছিল, যেন প্রাচীন কোনো মহৎ শিল্পকর্মের দিকে তাকিয়ে আছি।’

আবিস্কৃত এই ডাইনোসরের কাঁটাগুলি এতটাই বড়ো, ভারী ও জটিল যে, প্রশ্ন উঠছে—এগুলি আদৌ আত্মরক্ষার জন্য ছিল তো? এত ওজন, এত বিশ্রী গঠন, শরীর ঘোরানো বা শত্রুকে আঘাত করার সময় তো বরং বিপত্তি হতে পারত। গবেষকরা তাই ভাবছেন, এগুলি হয়তো প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে নয়, বরং ছিল প্রদর্শনের জন্য। ঠিক যেমন হরিণ তার শিং বা ময়ূর তার লেজ দিয়ে সঙ্গীকে আকর্ষণ করে। অর্থাৎ এই ‘পাঙ্ক রক’ ডাইনোসর সম্ভবত নিজের কাঁটা দেখিয়েই সঙ্গীদের আকর্ষণ করত, নৃত্য করত, ভয় দেখাত প্রতিদ্বন্দ্বীকে কিংবা নিজের আধিপত্য জাহির করত।

বিজ্ঞানীদের চমকপ্রদ এ আবিষ্কার শুধু একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান নয়, বরং ‘অ্যান্কইলোসর ডাইনোসরদের বিবর্তনের তত্ত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এ পর্যন্ত ধারণা ছিল, এই প্রজাতির ডাইনোসররা ক্রিটেশিয়াস যুগে (১৪৫-৬৬ মিলিয়ন বছর আগে), যখন পৃথিবীতে ভয়ানক শিকারি ডাইনোসর যেমন টি.রেক্স ঘুরে বেড়াত। তখন তাদের শরীরে ধীরে ধীরে বর্ম গঠন করেছিল নিজেদের রক্ষা করার জন্য। সে বর্মের গঠন ছিল অপেক্ষাকৃত সরল এবং কার্যকরী। কিন্তু ‘স্পাইকোমেল্লাস’ তো এসেছে তার অনেক আগেই—জুরাসিক যুগে, যখন এ ধরনের শিকারি ডাইনোসরের দেখা মেলেনি। অথচ এই ডাইনোসরের শরীরে বর্মের বহর তুলনাহীন। পরবর্তী প্রজাতির তুলনায়‘স্পাইকোমেল্লাস’-এর বর্ম আরো বেশি জটিল, বেশি শৈল্পিক, বিপুল। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এ বর্মের ব্যবহার তখন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা —প্রতিযোগিতা, প্রেম, আধিপত্য, অথবা সম্মান দেখানোর প্রতীক হিসেবেই হয়তো ছিল এই বিশাল কাঁটার ব্যবহার।

এই ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কারের নেপথ্যে রয়েছেন মরক্কোর এক কৃষক। ২০২৩ সালে বন্যার ধাক্কায় কিছু অদ্ভুত হাড় বেরিয়ে আসতে দেখেন তিনি। পরে সেটি পৌঁছে যায় গবেষকদের হাতে। গবেষকরা তখন মরক্কোর বৌলেমেন শহরের কাছে গিয়ে ওই জায়গা খনন করে আরো কিছু নমুনা সংগ্রহ করেন। মরক্কোর ইউনিভার্সিটি সিদি মোহাম্মদ বেন আবদেল্লাহ-র অধ্যাপক দ্রিস ওয়ারহাচে বলেন, ‘এই আবিষ্কার শুধুই এক ডাইনোসরকে আবিষ্কার নয়, বরং মরক্কো এবং সমগ্র আফ্রিকার বিজ্ঞান গবেষণায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।’ তিনি জানান, এ অঞ্চলে আরো অনেক অজানা ডাইনোসর লুকিয়ে রয়েছে, যা হয়তো ভবিষ্যতে বিজ্ঞানকে আরো বিস্মিত করবে। তবে এই আশার মাঝেও রয়েছে উদ্বেগ। গবেষকরা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ‘স্পাইকোমেল্লাস’-এর জীবাশ্মের কিছু অংশ ইউরোপে বিক্রি হতে দেখা গিয়েছে, যা হয়তো একই প্রাণীর দেহাংশ। সে কারণে গবেষণার স্থানটি আপাতত গোপন রাখা হয়েছে, যাতে আরো বিস্তৃত গবেষণা চালানো যায় এবং ভবিষ্যতে আর কোনো দুষ্কর্ম না ঘটে। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য ডাইনোসরটির খুলি উদ্ধার করা। সেটি উদ্ধার হলে জানা যাবে তার শ্রবণক্ষমতা, মস্তিষ্কের গঠন, খাদ্যাভ্যাস, এমনকি চোখ বা চোয়ালের কাঠামোও। রহস্যময় প্রাণীর জীবনের নানা দিকের পর্দা উন্মোচিত হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!