- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ১৮, ২০২৬
বিরোধী দলনেতা পদে বহাল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্তর্বর্তী হস্তক্ষেপে রাজি নয় হাই কোর্ট
বিধানসভার বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে চলা আইনি লড়াইয়ে আপাতত কোনো অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিল না কলকাতা হাই কোর্ট। ফলে স্পিকার রথীন্দ্র বসুর সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ই আপাতত বিরোধী দলনেতার পদে বহাল থাকবেন। মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও স্পষ্ট জানান, এই মুহূর্তে স্পিকারের সিদ্ধান্তে আদালত হস্তক্ষেপ করছে না। একই সঙ্গে তিনি নির্দেশ দেন, মামলার সমস্ত পক্ষকে হলফনামা জমা দিতে হবে। আগামী ২৮ জুলাই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর থেকেই দলের পরিষদীয় শাখায় তীব্র মতবিরোধ ও ভাঙনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। দলীয় নেতৃত্বের তরফে বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা তথা বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। সে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে দলের ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে বিরোধী দলনেতার পদ দাবি করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এরই মধ্যে ১ জুন ‘দলবিরোধী কার্যকলাপ’-এর অভিযোগে ঋতব্রতকে দল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেয় তৃণমূল নেতৃত্ব। এরপর প্রশ্ন ওঠে, বহিষ্কৃত একজন বিধায়ক কীভাবে বিরোধী দলনেতার পদে থাকতে পারেন। এ যুক্তিতেই কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের করেন তৃণমূল সাংসদ শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।
শোভনদেবের দাবি, দলের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মনোনয়ন দেন। সে সিদ্ধান্ত স্পিকারকে জানিয়ে ৯ মে চিঠিও পাঠানো হয়। অভিযোগ, স্পিকার ওই চিঠির ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ করেননি। অন্যদিকে, এ দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ঋতব্রত শিবির অভিযোগ তোলে, শোভনদেবের নাম সম্বলিত প্রথম চিঠিতে স্বাক্ষর জাল করা হয়েছিল। ঋতব্রতের সমর্থনে থাকা ৫৮ জন বিধায়ক স্পিকারের সামনে হাজির হয়ে দাবি করেন, তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল পরিষদীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁরা স্পিকারকে পৃথক চিঠি দিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন জানান। পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে পাঠানো বলে দাবি করা চিঠিতে স্বাক্ষর জাল হওয়ার অভিযোগও তোলেন।
পরবর্তীতে স্পিকার রথীন্দ্র বসু সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সমর্থনের ভিত্তিতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। একই সঙ্গে বিধানসভার সচিবের পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া চিঠিতে স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআরও দায়ের করা হয়। এদিন, মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও একাধিক প্রশ্ন তোলেন। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও কীভাবে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো, কেন দলীয় নেতৃত্বের পাঠানো প্রথম চিঠিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আদালত। স্পিকারের পক্ষের আইনজীবী আদালতে জানান, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই; বিধানসভার প্রচলিত নিয়ম অনুসারেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্য, প্রথম চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাতে কয়েকজনের স্বাক্ষর ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় চিঠির সময় ৫৮ জন বিধায়ক সশরীরে স্পিকারের সামনে উপস্থিত হয়ে ঋতব্রতের প্রতি সমর্থন জানান এবং নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেন। সে কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের মতামতকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঋতব্রতের পক্ষে আইনজীবী জয়দীপ কর আদালতে দাবি করেন, ৬ মে জমা দেওয়া প্রস্তাবপত্রে কোনো স্বাক্ষর ছিল না। তাই স্পিকার অতিরিক্ত নথি চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঋতব্রতের পক্ষে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, দলত্যাগবিরোধী আইন অনুযায়ী ‘বিদ্রোহী’ বিধায়কদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, শোভনদেবের পক্ষে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকার ও ঋতব্রতের যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, বিরোধী দলনেতা কে হবেন তা নির্ধারণ করার অধিকার রাজনৈতিক দলের, বিধায়ক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নয়। রাজনৈতিক দল এবং পরিষদীয় দল আলাদা সত্তা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়েও রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ দলীয় নেতৃত্ব যখন শোভনদেবকে মনোনীত করেছেন, তখন স্পিকারের দায়িত্ব ছিল সে সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করা। কিছু বিধায়ক পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করে দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন না। পাশাপাশি, দল থেকে বহিষ্কৃত কোনো ব্যক্তিকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আইনসঙ্গত নয় বলেও দাবি করেন তিনি। এ মামলায় অন্তর্বর্তী নির্দেশের আবেদন জানানো হলেও সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত রায়দান স্থগিত রেখেছিল। অবশেষে বৃহস্পতিবার হাই কোর্ট জানিয়ে দেয়, আপাতত কোনো অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হবে না। ফলে স্পিকারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ই বিরোধী দলনেতার পদে বহাল থাকবেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তের পর ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক সন্দীপন সাহা বলেন, ‘এটা আমাদের নৈতিক জয়। আমরা যা করেছি, সম্পূর্ণ আইন মেনেই করেছি।’ এখন হাই কোর্টের পরবর্তী শুনানির দিকে নজর রাজনৈতিক মহলের। ২৮ জুলাই আদালতে জমা পড়া হলফনামার ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী দিক নির্ধারিত হতে পারে।
❤ Support Us






