Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ১১, ২০২৬

মণিপুরে উদ্ধার অপহৃত ৬ গ্রামবাসীর দেহ। জেএনআইএমএস মর্গে বিক্ষোভ, রাজ্যজুড়ে বন্‌ধের ডাক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মণিপুরে উদ্ধার অপহৃত ৬ গ্রামবাসীর দেহ। জেএনআইএমএস মর্গে বিক্ষোভ, রাজ্যজুড়ে বন্‌ধের ডাক

প্রায় এক মাসের উদ্বেগঅনিশ্চয়তা আর বন্দী-মুক্রিত অবসান হলো মর্মান্তিক পরিণতিতে। মণিপুরের কাংপোকপি জেলা থেকে অপহৃত ৬ নাগা যুবকের দেহ উদ্ধার ঘিরে ফের অগ্নিগর্ভ উত্তর-পূর্বের অশান্ত রাজ্য। বুধবার নিরাপত্তাবাহিনীর দীর্ঘ তল্লাশি অভিযানের পর টি দেহ উদ্ধার হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসতেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায়। বৃহস্পতিবার ভোরে দেহগুলি ইম্ফলের জওহরলাল নেহেরু ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (জেএনআইএমএস)-এর মর্গে আনা হলে, ক্ষোভে ফেটে পড়েন নিহতদের আত্মীয়স্বজন ও নাগা সংগঠনগুলির সদস্যরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে বাধ্য হয় পুলিশ।

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছেকড়া নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে দেহগুলি জেএনআইএমএস মর্গে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি শুরু হতেই খবর ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায়। অল্প সময়ের মধ্যেই শতাধিক মানুষনিহতদের পরিবারের সদস্য এবং নাগা সংগঠনগুলির প্রতিনিধিরা মর্গ চত্বরে জড়ো হন। তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টার বন্‌ধের ডাক দিয়েছে মণিপুরের নাগা সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি)। সংগঠনের দাবিঅপহৃত নাগা গ্রামবাসীদের হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

মণিপুর পুলিশের দাবিপ্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে টানা তল্লাশি চালানোর পর টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন মণিপুর পুলিশসিআরপিএফ এবং অসম রাইফেলসের প্রায় ৪৫০ জন সদস্য। তল্লাশি কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল স্নিফার ডগ, ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের দল। পুলিশের বক্তব্যউদ্ধার হওয়া দেহগুলি ১৩ মে অপহৃত  নাগা ব্যক্তিরই বলে মনে করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ঘটনার তদন্ত চলছে। এক শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিক জানিয়েছেনলেইলোন ভাইফেই  খারাম ভাইফেই গ্রামের মাঝামাঝি দুর্গম এলাকা থেকে দেহগুলি উদ্ধার হয়েছে। ওই অঞ্চলেই গত ১৩ মে একাধিক গ্রামবাসীকে অপহরণ করা হয়েছিল।

ঘটনার সূত্রপাত ১৩ মে। ওই দিন কাংপোকপি জেলায় থাডৌ সম্প্রদায়ের  জন নেতাকে হত্যা করা হয়। কুকি সংগঠনগুলির অভিযোগ ছিলওই হত্যার পিছনে নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির হাত রয়েছে। তার পরই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বিস্ফোরণের আকার নেয়। পাল্টাপাল্টি অপহরণের ঘটনা শুরু হয় বিভিন্ন এলাকায়। নাগা সূত্রের অভিযোগওই দিন কনসাখুল গ্রামের বহু বাসিন্দাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফেরা কয়েক জনও। নিখোঁজ ৬ জনের নাম প্রকাশ্যে এসেছে স্থানীয় সূত্রে। তাঁরা হলেন মানু থিউমাইকেনপিবৌদিলীপ থিউমাইফেনরিলুংবৌকালিওয়াংবৌ এবং ফেনরংউইবৌ। তাঁদের মধ্যে মানু থিউমাই  কেনপিবৌ পেশায় পাদরি ছিলেন। অপহরণের পর থেকেই তাঁদের খোঁজে মরিয়া হয়ে উঠেছিল নাগা সমাজের বিভিন্ন সংগঠন।

অন্যদিকেঘটনার জেরে নাগা সংগঠনগুলিও সেনাপতি জেলায় ২৮ জন কুকি গ্রামবাসীকে আটক করে বলে অভিযোগ। পরে ১৫ মে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে ১৪ জন করে জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়। নাগারা ২৮ জন কুকির মধ্যে ১৪ জনকে ছেড়ে দেয়। একই ভাবে কুকি গোষ্ঠীগুলিও ১৪ জন নাগাকে মুক্তি দেয়। কিন্তু নিখোঁজ ৬ নাগা যুবকের কোনো খোঁজ না মেলায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। পরবর্তী সময়ে নাগা সংগঠনগুলি আরও ১৪ জন কুকি ব্যক্তিকে নিজেদের হেফাজতে রেখে দেয়। তাদের দাবি ছিলঅপহৃত নাগা ব্যক্তিদের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে না। যদিও, কুকি সংগঠনগুলি বারবার দাবি করেছে যেতাদের হাতে কোনো জিম্মি নেই এবং নিখোঁজ ৬ জনের অবস্থান সম্পর্কেও তারা কিছু জানে না।

রকম জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার সেনাপতি জেলায় আটক ১৪ জন কুকিকে মুক্তি দেয় নাগা সংগঠনগুলি। ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল জানায়মণিপুর সরকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার বিষয়ে নির্দিষ্ট আশ্বাস দেওয়ার পর মানবিক কারণেই  সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে আশার আলো নিভে গেল মাত্র এক দিনের মধ্যে এ ঘটনা গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং। তিনি বলেন, ‘মণিপুর সরকার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করছে। কোনো ধরনের বর্বরতা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সরকার নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িততাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেনঘটনার তদন্তভার জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-র হাতে রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে দেহগুলি জেএনআইএমএসে পৌঁছনোর পর এনআইএ-র একটি দলও সেখানে যায়

তবে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন লিয়াংমাই নাগা কাউন্সিল’-এর সভাপতি টিমোথি উইজুনামে। তাঁর অভিযোগ, ‘দেহগুলি উদ্ধার করে এখানে আনতে প্রশাসনের ২৮ দিন সময় লেগেছে। এত দীর্ঘ দেরি অত্যন্ত হতাশাজনক।’ পাশাপাশি তিনি দাবি করেনকোথা থেকে দেহগুলি উদ্ধার করা হয়েছে কিংবা উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত তথ্য পরিবারগুলিকে জানানো হয়নি। এদিকে, দেহ উদ্ধারের খবর সামনে আসতেই নতুন করে অশান্ত হয়ে ওঠে মণিপুর। বুধবার রাতেই সেনাপতি জেলার লিয়াংমাই তাফৌ এলাকায় নাগা পিপলস ফ্রন্টের মণিপুর শাখার কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। দুষ্কৃতীরা আসবাবপত্রে আগুন ধরিয়ে দেয় বলেও অভিযোগ। একই রাতে কারং এলাকার একটি স্কুলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি ট্রাকেও আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, প্রায় এক মাস ধরে চলা জিম্মি-সঙ্কটের এই রক্তাক্ত পরিণতি মণিপুরে নতুন করে জাতিগত উত্তেজনাকে উসকে দিল। নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসভূখণ্ড-সংক্রান্ত বিরোধ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সক্রিয় উপস্থিতির মধ্যে যুবকদের মৃত্যুর ঘটনা রাজ্যের শান্তি প্রক্রিয়ার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তদন্ত এগোলে অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছেসে প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। তবে আপাতত শোকক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার আবহেই দিন কাটছে মণিপুরের পাহাড়ি জনপদগুলিতে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!