- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ১, ২০২৬
‘নিট’ পুনঃপরীক্ষা সিবিটি পদ্ধতিতে নয়, আর্জি খারিজ শীর্ষ আদালতে। ২১ জুন পরীক্ষা কলম-কাগজে
‘নিট-ইউজি’ পরীক্ষা ঘিরে বিতর্কের আগুন এখনো নিভে যায়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে এ বছরের জাতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর পুনঃপরীক্ষা কী ভাবে হবে, তা নিয়ে নতুন করে আইনি টানাপড়েন শুরু হয়েছিল। সে আবহেই সোমবার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। ২১ জুন নির্ধারিত নিট-ইউজি পুনঃপরীক্ষা কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষা (সিবিটি) পদ্ধতিতে নেওয়ার আর্জি খারিজ করে দিল দেশের শীর্ষ আদালত। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, এই মুহূর্তে পরীক্ষার পদ্ধতি বদল করা বাস্তবসম্মত নয়। উপরন্তু, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) ইতিমধ্যেই একাধিক সমস্যার চাপে রয়েছে।
গত ৩ মে সারা দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘নিট-ইউজি’ পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হওয়ার অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১২ মে পরীক্ষা বাতিল করে দেয় এনটিএ। তার পরই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্ত এখনো চলছে। এর মধ্যেই পুনঃপরীক্ষার দিন ধার্য হয়েছে ২১ জুন।এই পরিস্থিতিতে আরজেডি সাংসদ সুধাকর সিংহ-সহ কয়েক জন আবেদনকারী সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁদের দাবি ছিল, পুনঃপরীক্ষা আর প্রচলিত কলম-কাগজ পদ্ধতিতে না নিয়ে কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে আয়োজন করা হোক। আবেদনকারীদের বক্তব্য, সিবিটি পদ্ধতিতে পরীক্ষা হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অনিয়মের সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে।
সোমবার বিচারপতি পি এস নরসিমহা এবং বিচারপতি অরবিন্দ কুমারের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। শুনানির শুরুতেই আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী সত্যম সিংহ রাজপুত জানান, তাঁদের অন্যান্য দাবি নিয়ে এ মুহূর্তে তাঁরা জোর দিচ্ছেন না। শুধুমাত্র পুনঃপরীক্ষা সিবিটি পদ্ধতিতে নেওয়ার আবেদনটিই আদালতের বিবেচনার জন্য তুলে ধরা হচ্ছে। আদালত সে যুক্তিতে সাড়া দেয়নি। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘পুনঃপরীক্ষা সিবিটি পদ্ধতিতে আয়োজনের প্রশ্নই ওঠে না। এনটিএ ইতিমধ্যেই অনেক সমস্যার মুখে রয়েছে। পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, আবার নতুন করে আয়োজন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বড়ো পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।’
আদালত আরও জানায়, এ ধরনের দাবি নিয়ে অতীতেও একাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল, সেগুলিও খারিজ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের আইনজীবী যখন আবারও জোর দিয়ে বলেন যে, পুনঃপরীক্ষা শারীরিক পরীক্ষাকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে, সেটিকে কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষায় রূপান্তর করা উচিত, তখন বিচারপতি নরসিমহা তাঁকে এনটিএ-র উপর বর্তমান প্রশাসনিক চাপের বিষয়টি বোঝার পরামর্শ দেন। এ দিন বেঞ্চ আবেদনটির চূড়ান্ত শুনানির দিন ধার্য করেছে আগামী ২৭ জুলাই। তবে আদালতের বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ২১ জুনের পুনঃপরীক্ষা আগের মতোই ‘পেন-অ্যান্ড-পেপার’ পদ্ধতিতেই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।
‘নিট বিতর্কে’ এর আগে গত ২৯ মে সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিল। আদালত জানিয়েছিল, দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর আশা-আকাঙ্ক্ষাকে হতাশ করা উচিত নয়। একই সঙ্গে শীর্ষ আদালত বলেছিল, মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষাকে ঘিরে যে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বারবার সামনে আসছে, তার স্থায়ী সমাধান হবে না যত দিন না প্রকৃত দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানিয়েছিলেন, পরীক্ষার্থীদের উদ্বেগ নিয়ে কেন্দ্র সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাঁর দাবি ছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও পরিস্থিতির উপর সরাসরি নজর রাখছেন, যাতে পুনঃপরীক্ষা পরিচালনায় কোনো ত্রুটি না থাকে। তিনি আরও জানান, ২১ জুনের পুনঃপরীক্ষাকে সুরক্ষিত ও স্বচ্ছ করতে একাধিক নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে ‘নিট’ সংক্রান্ত একগুচ্ছ মামলার শুনানি চলছে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় এনটিএ-র কাঠামোগত সংস্কার অথবা সংস্থাটির পরিবর্তে আরও শক্তিশালী ও স্বশাসিত পরীক্ষামূলক সংস্থা গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। কেন্দ্র সরকার, এনটিএ এবং সিবিআইকে এ বিষয়ে জবাবও তলব করেছে আদালত। মামলায় জমা দেওয়া একটি হলফনামায় এনটিএ জানিয়েছে, কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী বছর থেকে নিট-ইউজি সম্পূর্ণ কম্পিউটার-ভিত্তিক পদ্ধতিতে আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এ বছরের পুনঃপরীক্ষা পুরনো পদ্ধতিতেই হলেও ভবিষ্যতে দেশের বৃহত্তম মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার রূপ বদলাতে চলেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালেও ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সে বার সুপ্রিম কোর্ট পরীক্ষা বাতিল করতে অস্বীকার করলেও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে একাধিক নির্দেশ দিয়েছিল এবং কোন পরিস্থিতিতে কোন সর্বভারতীয় পরীক্ষা বাতিল করা যেতে পারে, তারও কিছু নীতিগত মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু এ বছরের ঘটনাপ্রবাহ দেখে গত ২৫ মে আদালত আক্ষেপ করে জানিয়েছিল, আগের অভিজ্ঞতা থেকে এনটিএ যে যথেষ্ট শিক্ষা নেয়নি, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ফলে ২১ জুনের পুনঃপরীক্ষা যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নজরদারি। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই পরীক্ষার উপর। আর সে কারণেই প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে পরীক্ষার পদ্ধতি, সব কিছুই এখন জাতীয় স্তরের আলোচনার কেন্দ্রে। সুপ্রিম কোর্টের সোমবারের পর্যবেক্ষণ অবশ্য স্পষ্ট করে দিল, অন্তত এ বারের পুনঃপরীক্ষায় আর কোনো পরীক্ষণ বা নতুন ব্যবস্থা নয়; নির্ধারিত দিনেই, নির্ধারিত পদ্ধতিতেই পরীক্ষা হবে।
❤ Support Us





