- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ২৭, ২০২৬
নির্ভুল ভোটার তালিকার স্বার্থে জরুরি এসআইআর, তবে নাগরিকত্ব নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা কমিশনের নয় । পর্যবেক্ষণ দেশের শীর্ষ আদালতের
বিশেষ সংক্ষিপ্ত পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলি-র বেঞ্চ জানিয়ে দিল, বৈধ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির জন্য এসআইআর একটি বৈধ ও সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া। তবে একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে, কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই; সেই সিদ্ধান্ত নেবেন নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সরকারি কর্তৃপক্ষ।
এই মামলায় মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের উপর বিচারপতিরা মত দেন। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের এসআইআর পরিচালনা করার ক্ষমতা রয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, এসআইআরের উদ্দেশ্য বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত কি না। তৃতীয়ত, এই প্রক্রিয়া জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ও সংশ্লিষ্ট নিয়মাবলির বিরোধী কি না। এবং চতুর্থত, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ভোটারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট নথি বা তথ্য চাওয়ার ক্ষমতা রাখে কি না।
আদালত জানায়, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর করার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। যদিও এই প্রক্রিয়া সাধারণ ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি থেকে আলাদা, তবুও একে বেআইনি বলা যায় না। আইন নিজেই নির্বাচন কমিশনকে যে কোনও সময় বিশেষ পুনর্বিবেচনা করার অধিকার দিয়েছে এবং কী ভাবে সেই কাজ করা হবে, তার স্বাধীনতাও দিয়েছে। ফলে শুধুমাত্র সাধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পুরোপুরি মিল না থাকায় এসআইআরকে অসাংবিধানিক বলা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্ট আরও জানিয়েছে, সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে যে সাংবিধানিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এসআইআর সেই দায়িত্ব পালনেরই অংশ। এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হল অবাধ, সুষ্ঠু এবং নির্ভুল নির্বাচন নিশ্চিত করা। আদালতের মতে, ভোটার তালিকা সঠিক রাখা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
রায়ে বলা হয়েছে, প্রথম নজরে কোনও প্রক্রিয়া বাদ দেওয়া বা সীমাবদ্ধ করার মতো মনে হলেও, যদি সেখানে যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে, তবে সেটিকে সংবিধানসম্মত ভাবে কার্যকর করা সম্ভব। এসআইআরের ক্ষেত্রেও ভোটারদের অধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেই মত আদালতের।
সুপ্রিম কোর্ট এ-ও স্পষ্ট করেছে যে, ভোটার তালিকায় নাম থাকা মানেই কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে ভবিষ্যতে আর প্রশ্ন তোলা যাবে না—এমন কথা আদালত কখনও বলেনি। ভোটার তালিকায় নাম থাকলে নাগরিকত্বের একটি প্রাথমিক স্বীকৃতি অবশ্যই থাকে, কিন্তু প্রয়োজনে আইন মেনে সেই বিষয় যাচাই করা যেতে পারে। তবে সেই যাচাই অবশ্যই ন্যায্য, স্বচ্ছ ও আইনসম্মত পদ্ধতিতে হতে হবে।
আদালত জানিয়েছে, এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াও আইনের সীমার মধ্যেই রয়েছে। ভোটারদের নোটিস দেওয়া, শুনানির সুযোগ রাখা এবং পুনরায় আবেদন করার অধিকার বজায় রাখা হয়েছে। যদি কারও নাম ভুলবশত বাদ পড়ে যায়, তবে তিনি ফের আবেদন করতে পারবেন এবং নির্বাচন কমিশনকে সেই আবেদন আইন অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে।
নথিপত্র যাচাইয়ের প্রসঙ্গেও নির্বাচন কমিশনের পাশে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের মতে, নির্দিষ্ট নথি চাওয়া বেআইনি নয়, বরং সঠিক ও একরকম যাচাই নিশ্চিত করার জন্য তা প্রয়োজনীয়। কমিশন এমন নথিই চেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে থাকার কথা। পাশাপাশি আগের তুলনায় এ বার আরও বেশি ধরনের নথি গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও আদালত উল্লেখ করেছে। তাই এই প্রক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃত ভাবে মানুষকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ বলা ঠিক হবে না।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা তৈরির সময় নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারলেও, সেই ক্ষমতা শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় নাম রাখা বা বাদ দেওয়ার প্রশ্ন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেই কাউকে বিদেশি নাগরিক ঘোষণা করা যাবে না। নাগরিকত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নয়, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সরকারি কর্তৃপক্ষ।
❤ Support Us


