- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬
৭ সেপ্টেম্বর ‘পিএসসি ভবন’ অভিযানের ডাক ! দ্রুত ফল প্রকাশ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গতি বাড়ানোর দাবি চাকরিপ্রার্থীদের
দীর্ঘ প্রস্তুতির পর পরীক্ষা হয়েছে। উত্তরপত্রের মূল্যায়নও এগিয়েছে। কোথাও চূড়ান্ত উত্তরও প্রকাশিত। কিন্তু ফল প্রকাশ হয়নি। ফল প্রকাশ হলেও নিয়োগ পত্র হাতে পাওয়ার অপেক্ষাও দীর্ঘ। সরকার আসে সরকার যায়, সরকারি দফতরে বাড়ে শূন্যপদ, কিন্তু বাংলার চাকরিপ্রার্থীদের অপেক্ষা শেষ হয় নয়। পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আওতাধীন সমস্ত চাকরির পরীক্ষার দ্রুত ফল প্রকাশ ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় গতি আনার দাবিতে এবার কলকাতার ‘পিএসসি ভবন’ অভিযানের ডাক দিয়েছেন চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় ‘পিএসসি ভবন’-এর সামনে জমায়েতের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। কর্মসূচির প্রচারে দ্রুত ফল প্রকাশ করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার দাবিই সামনে রাখা হয়েছে।
ঘটনাচক্রে, তার ঠিক আগেই কলকাতার রাজপথে নেমেছিলেন রাজ্য পুলিশের চাকরিপ্রার্থীরা। সোমবার, ৩১ আগস্ট, কয়েক হাজার প্রার্থী শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মিছিল করেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রায় শেষ ধাপ পেরিয়েও চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয়নি। ‘এ বার পুজোয় উর্দি চাই’— এ দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলনকারীরা দ্রুত ফল প্রকাশ এবং পুজোর আগেই নিয়োগ শেষ করার দাবি তোলেন। এ পরিস্থিতিতে ৭ সেপ্টেম্বরের ‘পিএসসি অভিযান’-কে শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছেন না আন্দোলনকারীদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, একের পর এক পরীক্ষা নেওয়া হলেও ফল প্রকাশ, পরবর্তী ধাপ ও নিয়োগ— গোটা প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। ফলে পরীক্ষার্থীদের বয়স, চাকরির সুযোগ আর প্রস্তুতির সময়— সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
‘পিএসসি’-র সাম্প্রতিক ফলাফল-তালিকা খতিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগপ্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ধাপ পেরিয়েছে। তবে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত দুটি বড়ো পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা বিশেষ ভাবে নজরে পড়ছে। প্রথমত, ‘ডব্লিউবিসিএস (এক্সিকিউটিভ) পরীক্ষা ২০২’৪-এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে গত ১৪ জুন পরীক্ষা নেয় ‘পিএসসি’। ২৪ জুন মডেল উত্তর প্রকাশের পর আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে ২৭ আগস্ট চূড়ান্ত উত্তরসূচিও প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষা থেকে উত্তরসূচি প্রকাশ— প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলি পেরিয়ে গেলেও ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ হয়নি দ্বিতীয়ত, ‘ক্লার্কশিপ পরীক্ষা (পার্ট-২)-২০২৩’। এই পরীক্ষার প্রথম পর্ব হয়েছিল ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৭ নভেম্বর। তার ফল প্রকাশ করে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর ৮৯,৮২১ জনকে দ্বিতীয় পর্বের জন্য যোগ্য ঘোষণা করেছিল কমিশন। পরে দ্বিতীয় পর্বের লিখিত পরীক্ষা হয় ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫। কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগের সরকারি ঘোষণা এখনো নেই। ফলে কয়েক মাস ধরে অপেক্ষায় রয়েছেন বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী।
ফল প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা পরীক্ষাগুলির তালিকায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা রয়েছে— খাদ্য দফতরের ‘সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষা’। এই পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৩ সালে। ৪৮০টি শূন্যপদের জন্য আয়োজিত ওই লিখিত পরীক্ষা হয় ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৭ মার্চ। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে উত্তরপত্রের সংশোধন ও উত্তরসূচি সংক্রান্ত প্রক্রিয়াও হয়। এ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস/অনিয়মের অভিযোগে মামলা হয়েছিল। কলকাতা হাই কোর্টে দাখিল হওয়া মামলায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহার করে উত্তর লেখার অভিযোগ উঠেছিল। এ পর্যন্ত কমিশনের তরফে ওই লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের কোনো বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়নি। অর্থাৎ পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার প্রায় আড়াই বছর পরেও ফলের অপেক্ষায় রয়েছেন পরীক্ষার্থীরা।
এখানেই শেষ নয়। ‘পিএসসি’-র ফলাফল-আর্কাইভে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পুরনো নিয়োগপ্রক্রিয়ার ফল, সুপারিশ আর সংশোধিত তালিকা প্রকাশিত হলেও পরীক্ষার্থীদের একাংশের প্রশ্ন— নতুন পরীক্ষাগুলির ফল প্রকাশে সে গতি কোথায়? রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল, দুর্নীতির অভিযোগ, আইনি জটিলতা এসবের ভুক্তভোগী কেন বাংলার তরুণ প্রজন্ম হবে, এ প্রশ্নও উঠছে। তবে রাজ্যে নতুন সরকারের আমলে ‘পিএসসি’-র নিয়োগব্যবস্থাতেও সংস্কারের উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। আগস্টের শুরুতেই অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক অনিল বর্মাকে পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। বোর্ডের পদেও একাধিক নতুন মুখ। সরকারের তরফে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত ব্যবস্থা এবং সময়বদ্ধতার উপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘পিএসসি’-র পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা, বার্ষিক পরীক্ষার ক্যালেন্ডার মেনে নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেওয়া এবং নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
তবে সংস্কারের ঘোষণার পাশাপাশি পুরনো জট কাটানোই এখন নতুন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা। কারণ এক দিকে ১৭,৭১৪টি শূন্যপদে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে এবং আরও ৮,০০৮টি পদে নিয়োগের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে, অন্যদিকে, পুরনো পরীক্ষার ফল এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়। ফলে নতুন নিয়োগের দরজা খোলার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং নিয়োগ সম্পূর্ণ করতে পারলেই ‘পিএসসি-সংস্কার’-এর বাস্তব সাফল্য প্রমাণিত হবে, এমনটাই মনে করছেন চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ। ‘পিএসসি ভবন অভিযান’-এর আবহে তাই নতুন প্রশাসনের কাছে শুধু নতুন বিজ্ঞপ্তি নয়, পুরনো পরীক্ষার জট কাটানোর দাবিও সমান জোরে উঠতে চলেছে।
এদিকে, ‘এসএসসি’ জটিলতা যেমন শেশ্বহ হবার নাম নিচ্ছে না, তেমনই পুলিশ নিয়োগের দেরিও ক্ষোভের পরিধি বাড়াচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রায় ১২ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল। লিখিত পরীক্ষা হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরে। তার পরে শারীরিক মাপজোক ও শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা ও ইন্টারভিউয়ের ধাপও সম্পন্ন হয়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সাক্ষাৎকার শেষ হলেও চূড়ান্ত ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। এ নিয়োগকে ঘিরে অবশ্য আইনি জটিলতাও রয়েছে। ‘ইডব্লিউএস’ সংরক্ষণ সংক্রান্ত মামলায় কলকাতা হাই কোর্ট ১৯ আগস্ট নির্দেশ দিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে কনস্টেবল নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা যাবে না। ১১ সেপ্টেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানি রয়েছে। ফলে চাকরিপ্রার্থীদের দাবির সঙ্গে আদালতের নির্দেশেরও সরাসরি যোগ তৈরি হয়েছে।
নিয়োগ বোর্ডও গত কয়েক মাসে একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ করেছে। সংশোধিত ‘ওবিসি’ তালিকা নিয়ে বিজ্ঞপ্তি, শ্রেণি পরিবর্তন বা সংশোধনের জন্য বিশেষ সুযোগ, সংশোধিত শূন্যপদের তালিকা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রার্থীদের নিয়ে নোটিস জারি হয়েছে। কিন্তু প্রার্থীদের বক্তব্য, নোটিসের পর নোটিসে অপেক্ষার অবসান হয় না। তাঁদের চাওয়া দ্রুত নিয়োগ। সোমবারের পুলিশ চাকরিপ্রার্থীদের মিছিল দীর্ঘ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এদিন প্রায় ৪ হাজার প্রার্থী শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মিছিল করেন বলে সংবাদসূত্রে দাবি। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও মিছিল হয়। তিন ঘণ্টারও বেশি সময় মধ্য কলকাতার একাধিক রাস্তায় যান চলাচলে প্রভাব পড়ে। পুজোর আগে নিয়োগ না হলে তাঁদের একাংশ আরও বৃহৎ আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তাঁরা। এ আন্দোলনের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ‘পিএসসি ভবন অভিযান’ কর্মসূচি সামনে আসায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় গতি ফেরাতে এ বার কি আরও বড়ো ধরনের চাপ তৈরি হতে চলেছে? সাম্প্রতিক ঝাড়খণ্ডের চাকরিপ্রার্থীদের যে আন্দোলন, তা কি বাংলাতেও প্রভাব বিস্তার করছে?
অন্যদিকে, রাজ্য সরকার, ‘পিএসসি’ ইতিমধ্যেই নিয়োগে গতি আনার একাধিক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। আগস্টের মাঝামাঝি ‘পিএসসি’ জানিয়েছে, ৫৪টি সরকারি দফতরে গ্রুপ এ, বি, সি মিলিয়ে মোট ১৭,৭১৪টি শূন্যপদে নিয়োগপ্রক্রিয়া চলবে। এর পাশাপাশি আরও ৮,০০৮টি শূন্যপদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে বলে ‘পিএসসি’-র তরফে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ২৫ হাজারেরও বেশি শূন্যপদে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগোনোর কথা। রাজ্য সরকারের তরফে নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকার কথা বলা হয়েছে। নিয়োগকারী সংস্থাগুলিকে স্বাধীন ভাবে পরীক্ষা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ‘পিএসসি’-র পরিকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি বার্ষিক পরীক্ষার ক্যালেন্ডার মেনে নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেওয়ার উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন আইএএস অনিল বর্মাকে সংস্থার চেয়ারম্যান করায় নতুন প্রশাসনের কাছে নিয়োগব্যবস্থাকে দ্রুত এবং স্বচ্ছ করার প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।
নতুন শূন্যপদের ঘোষণা, নতুন বিজ্ঞপ্তি কিংবা ভবিষ্যতের পরীক্ষার ক্যালেন্ডার— চাকরিপ্রার্থীদের কাছে অবশ্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু সব কিছুর আগে রয়েছে পুরনো পরীক্ষার ফল। কারণ নতুন নিয়োগের দরজা খোলার পাশাপাশি পুরনো পরীক্ষার দরজা বন্ধ না হলে কর্মসংস্থানের অপেক্ষা ক্রমেই দীর্ঘ হবে। ফলে ৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির মূল সুরও কার্যত এক— নতুন নিয়োগে ক্ষেত্রে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে প্রক্রিয়া চালাতে হবে, তার আগে অবিলম্বে পুরনো পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে নিয়োগ করতে হবে। এখন দেখার, চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের মুখে কমিশন কী বার্তা দেয়। ফল প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা হয় কি না, না কি ফের আশ্বাসেই থেমে যায় এ আন্দোলন!
❤ Support Us





