- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ৪, ২০২৬
বাংলায় শিল্পে নতুন গতি! ২,১০০ কোটি নতুন বিনিয়োগের ইঙ্গিত, টাটা-আদানি নিয়েও বড়ো পরিকল্পনা সরকারের
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে একের পর এক বড়ো ঘোষণা সামনে আসছে। নিউ টাউনে প্রস্তাবিত ‘আদানি হেল্থ সিটি’ নিয়ে আলোচনার পর এবার আরও ২,১০০ কোটি টাকার নতুন শিল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে টাটা গোষ্ঠীকে পশ্চিমবঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট ও ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার আহ্বান জানানোর ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। সরকারের দাবি, শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে, নতুন শিল্পনীতির মাধ্যমে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই একাধিক প্রকল্পের রূপরেখা চূড়ান্ত হবে এবং রাজ্যে বিনিয়োগের নতুন পর্ব শুরু হবে।
শুক্রবার নিউ টাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে নবনির্বাচিত বিধায়কদের ‘ওরিয়েন্টেশন’ কর্মসূচির মাঝে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যে খুব শীঘ্রই দুটি বড়ো শিল্প প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে চলেছে। সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাও। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উৎসাহ প্রকাশ করেন তিনিও। মুখ্যমন্ত্রীর জানান, একটি প্রকল্পে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হোসিয়ারি শিল্প গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। অন্য প্রকল্পে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি আধুনিক ইস্পাত কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। দুই প্রকল্প মিলিয়ে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২১০০ কোটি টাকা।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, হোসিয়ারি শিল্পটি শ্রমনিবিড় হওয়ায় বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে ইস্পাত কারখানা চালু হলে দীর্ঘদিন ধরে ভারী শিল্পে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে নতুন শিল্পায়নের পরিবেশ তৈরি হবে। তবে শুধু এই দুই প্রকল্পেই থেমে থাকতে চাইছে না সরকার। শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই আরও কয়েকটি বৃহৎ বিনিয়োগের প্রস্তাব সামনে আনা হবে। তার আগে শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। রাজ্যে বিনিয়োগ টানার উদ্দেশ্যে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ের নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই ‘ক্যাবিনেট সাব-কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিই পশ্চিমবঙ্গের নতুন শিল্পনীতির খসড়া তৈরি করছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, আগামী সেপ্টেম্বরেই নতুন সরকারের প্রথম শিল্প সম্মেলন বা ‘বিজনেস সামিট’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সে মঞ্চ থেকেই প্রকাশ্যে আসতে পারে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি। দেশ-বিদেশের শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গকে নতুন করে শিল্পের মানচিত্রে তুলে ধরাই সরকারের লক্ষ্য বলে নবান্ন সূত্রে খবর।
বাংলায় শিল্প প্রসঙ্গ উঠতেই স্বাভাবিক ভাবেই ফিরে আসে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের স্মৃতি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতে কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে বহু কৃষক শিল্পের স্বার্থে জমি দিতে আগ্রহী। যদিও টাটা গোষ্ঠীকে সিঙ্গুরেই জমি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তিনি জানান। তবে সরকারের লক্ষ্য যে টাটা গোষ্ঠীকে ফের বাংলায় শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করা, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই পশ্চিমবঙ্গে একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট এবং একটি ডেটা সেন্টার গড়ে তুলুক টাটা গোষ্ঠী।’ খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে টাটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হবে বলেও জানান তিনি।
বর্তমানে টাটা গোষ্ঠী অসমের মোরিগাঁও জেলার জাগিরোডে প্রায় ২৭,১২০ কোটি টাকা বিনিয়োগে দেশের অন্যতম বৃহৎ সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং (ওএসএটি) কারখানা নির্মাণ করছে। কেন্দ্রের ‘সেমিকন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের আওতায় অনুমোদিত এই কারখানা চালু হলে বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন চিপ প্যাকেজিংয়ের ক্ষমতা তৈরি হবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রায় ২৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে। নবান্নের আশা, একই ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প বাংলাতেও গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শিল্পায়নের লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি সক্রিয় হয়েছে বিজেপির সাংগঠনিক নেতৃত্বও। সম্প্রতি রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বিনিয়োগ টানতে মুম্বই সফরে গিয়েছেন। সেখানে দেশের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর একাধিক বৈঠক হয়েছে। শমীকের দাবি, গত কয়েক দশকে বিভিন্ন কারণে বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়া বহু শিল্পপতি নতুন পরিস্থিতিতে ফের পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁর কথায়, অতীতের মতো রাজনৈতিক সুপারিশ বা প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হবে না। এখন সরাসরি রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।
শিল্পের পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোতেও পুঁজি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নবান্ন সূত্রে খবর, নিউ টাউনে প্রায় এক হাজার শয্যার ‘আদানি হেল্থ সিটি’ গড়ে তোলার বিষয়ে আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আদানি গোষ্ঠীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর করণ আদানির বৈঠকেও এই প্রকল্প নিয়ে প্রাথমিক স্তরের আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যনগরীতে এক হাজার শয্যার অত্যাধুনিক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের পাশাপাশি মেডিক্যাল কলেজ, গবেষণাগার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, বায়োমেডিক্যাল গবেষণা কেন্দ্র এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। হাসপাতালের অর্ধেক শয্যায় সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থাও রাখা হবে বলে জানা গিয়েছে।
এ প্রকল্পে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘মেয়ো ক্লিনিক’ কৌশলগত সহযোগী হিসেবে যুক্ত থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক মানের ক্লিনিক্যাল প্রোটোকল, হাসপাতাল পরিচালনা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং চিকিৎসা গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। ফলে, রাজনৈতিক পালাবদলের পর শিল্পে-স্বাস্থ্যে নতুন গতি আনার প্রশ্নে সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন শিল্প মহলের একাংশ। আদানি গোষ্ঠীর স্বাস্থ্য প্রকল্প, ২১০০ কোটি টাকার নতুন শিল্প বিনিয়োগ, সম্ভাব্য নতুন শিল্পনীতি এবং টাটা গোষ্ঠীকে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলায় আনতে উদ্যোগ— সব মিলিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে সরকার যে শিল্প ও কর্মসংস্থানকেই অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছে, সে বার্তাই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
❤ Support Us





