- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৯, ২০২৬
চটকলে ফের বাজবে সাইরেন ! ১০ জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যের বহু বন্ধ মিল খোলার নির্দেশ
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব আর আর্থিক সঙ্কটের পর অবশেষে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন রাজ্যের জুটশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার শ্রমিক। হুগলি, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমানের একাধিক বন্ধ চটকল আগামী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে খুলে যেতে পারে বলে শ্রম দফতর সূত্রে খবর। শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের উপস্থিতিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের পর এ সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। শ্রমিক সংগঠন ও মালিকপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর বন্ধ মিলগুলির ‘সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক’ তুলে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছনো গিয়েছে বলে দাবি প্রশাসনের।
শ্রম দফতর সূত্রের খবর, ইন্ডিয়া জুট মিল, হেস্টিংস জুট মিল, গোন্দলপাড়া জুট মিল, এম্পায়ার, লুমটেক্স, শক্তিগড় এবং হাওড়া জুট মিল-সহ একাধিক কারখানার মালিকপক্ষ ওই বৈঠকে অংশ নেয়। উপস্থিত ছিলেন শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং, জনস্বাস্থ্য কারিগরি ও শ্রম দফতরের প্রতিমন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্য, বিশেষ শ্রম কমিশনার আশিস সরকার এবং সংশ্লিষ্ট জেলার প্রশাসনিক আধিকারিকেরা। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রথমে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করা হবে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ১৬ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে উৎপাদনও শুরু হতে পারে। রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নটি সামনে এসেছে। শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রুগ্ন ও বন্ধ চটকলগুলিকে পুনরায় চালু করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। অতীতে জুটশিল্পের সংকট নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। সে প্রেক্ষিতেই একাধিক শিল্পমালিকের সঙ্গে বৈঠক করে সমাধানের পথ খোঁজার উদ্যোগ নেয় শ্রম দফতর।
রাজ্যের শিল্পাঞ্চলগুলিতে জুটমিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শ্রমিক পরিবারগুলির উপর। কাজ হারিয়ে বহু পরিবার মাসের পর মাস কার্যত চরম আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। বিশেষ করে হুগলির শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বন্ধ হয়ে যায় শ্রীরামপুরের ইন্ডিয়া জুট মিল। প্রায় দু–হাজার শ্রমিক সেখানে কর্মরত ছিলেন। কয়েক মাস ধরে বেতনহীন অবস্থায় সংসার চালাতে গিয়ে বহু শ্রমিককে ধারদেনা করতে হয়েছে। কেউ কেউ ভিন্রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন, আবার অনেকে অস্থায়ী কাজ করে কোনোমতে সংসারের হাল ধরেছেন। একই ছবি চন্দননগরের গোন্দলপাড়া জুট মিলে। প্রায় চার হাজার শ্রমিকের জীবিকা নির্ভর করত ওই কারখানার উপর। ভোটের আগে মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শ্রমিক মহল্লাগুলিতে কার্যত নেমে আসে দুর্দশা। বহু পরিবারে নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনা থেকে চিকিৎসা— সব ক্ষেত্রেই টান পড়ে। হেস্টিংস জুট মিলেও প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। ওয়েলিংটন জুট মিলে প্রায় ২২০০ শ্রমিক এবং ভদ্রেশ্বরের ভিক্টোরিয়া জুট মিলে প্রায় তিন হাজার শ্রমিকের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
রাজ্যে পালাবদলের পর, নতুন করে মিল খোলার খবরে স্বস্তি ফিরলেও শ্রমিকদের একাংশ এখনো সতর্ক। তাঁদের অভিজ্ঞতা বলছে, অতীতেও একাধিক বার চটকল খোলার ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই উৎপাদন থমকে গিয়েছে। ফলে কেবল গেট খোলাই নয়, বছরের বারো মাস উৎপাদন চালু রাখা এবং নিয়মিত কাজের নিশ্চয়তা পাওয়াই এখন তাঁদের প্রধান দাবি। শ্রমিকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এ ধরনের বন্ধ-খোলার চক্র চলছে। মিল যদি নিয়মিত চলে, তা হলে আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ অন্তত সুরক্ষিত হবে। অন্য এক শ্রমিক বলেন, ‘মিল খুলবে শুনে ভালো লাগছে। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন কতটা হবে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু নামমাত্র খোলার মধ্যে কোনো লাভ নেই।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়েও সরকারের উদ্যোগী হওয়া উচিত।
শ্রমিক সংগঠনগুলিও একই দাবি তুলেছে। ‘সিটু’-র রাজ্য কমিটির সদস্য হীরালাল সিংয়ের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে জুটমিল বন্ধ থাকায় হাজার হাজার শ্রমিক বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে গিয়েছেন। কেউ টোটো চালাচ্ছেন, কেউ নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছেন। তাঁর মতে, শুধু মিল খোলা নয়, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকে শ্রম দফতরের প্রতিমন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, জুটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর দাবি, মালিকপক্ষকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। শুধু মিল চালু করাই নয়, শ্রমিক আবাসন ও শ্রমিক মহল্লাগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পাঞ্চলগুলিতে পানীয় জল, নিকাশি এবং আবাসনের সমস্যাগুলির সমাধানের বিষয়েও মালিকদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে আশার আবহের মধ্যেও রয়ে গিয়েছে কিছু সংশয়। গোন্দলপাড়া জুট মিলের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বর্তমানে কারখানায় রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে ঠিকই, কিন্তু নতুন অর্ডার এখনো হাতে আসেনি। উৎপাদন কবে থেকে পুরোপুরি শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। বাজার পরিস্থিতি এবং অর্ডারের উপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে। এরই মধ্যে হাওড়ার বেলুড়ে অম্বিকা জুট মিলে নতুন করে শ্রমিক-মালিক সংঘাত পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। কাজের চাপ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে বিবাদের জেরে সেখানে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার শ্রমিকের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে। শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রত্যেককে আটটি করে লুম মেশিন চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। অন্যদিকে মালিকপক্ষের দাবি, পুরনো ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরেই ওই নিয়ম চালু রয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজ্যের জুটশিল্পে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনার ইঙ্গিত মিলছে। বন্ধ মিলগুলিতে আবার মেশিনের শব্দ শোনা যাবে কি না, কর্মহীন শ্রমিকেরা স্থায়ী ভাবে কাজে ফিরতে পারবেন কি না, তা এখন সময়ই বলবে। তবে আপাতত বহু দিন পর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক মহল্লাগুলিতে যে আশার আলো জ্বলেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বহু পরিবারের কাছে ১০ জুলাই তাই শুধু একটি তারিখ নয়, নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার দিন।
❤ Support Us






