Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুলাই ৯, ২০২৬

ইন্দো-স্পেসিফিকে কৌশলগত অবস্থানে জোর দিল্লির ! পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারত-অস্ট্রেলিয়ার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইন্দো-স্পেসিফিকে কৌশলগত অবস্থানে জোর দিল্লির ! পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারত-অস্ট্রেলিয়ার

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েনজ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণের আবহে নিজেদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। অসামরিক পারমাণবিক শক্তিসামুদ্রিক নিরাপত্তাগুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদপ্রতিরক্ষা উদ্ভাবন  উদীয়মান প্রযুক্তির মতো একাধিক কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করতে বৃহস্পতিবার একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করল দুই দেশ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি  অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের বৈঠকের পরই সিদ্ধান্তগুলির কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করা হয়।

ইন্দোনেশিয়া সফর শেষে তিন দেশ সফরের দ্বিতীয় পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছেন মোদি। সেখানে আলবানিজের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তাপরিচ্ছন্ন শক্তির ভবিষ্যৎসন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। বৈঠকের শেষে প্রকাশ করা হয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত যৌথ ঘোষণাশক্তি সহযোগিতা নিয়ে পৃথক যৌথ বিবৃতি এবং সাইবার নিরাপত্তাগুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার রূপরেখা। তবে, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উঠে এসেছে অসামরিক পারমাণবিক শক্তি সংক্রান্ত চুক্তি। এর ফলে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ইউরেনিয়াম সরবরাহের পথ আরও সুগম হবে বলেই মত দিল্লির।

ভারতের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্মসূচির জন্য এ চুক্তিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বৃহস্পতিবার, যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ‘আজ আমরা পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। এর ফলে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে ইউরেনিয়াম সরবরাহের পথ খুলবে, পরিচ্ছন্ন শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে নতুন গতি আসবে।’ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে লক্ষ্য ভারত নির্ধারণ করেছেসে প্রেক্ষাপটেও এই চুক্তিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।  

শুধু জ্বালানি নয়গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ। বৈদ্যুতিক যানব্যাটারি প্রযুক্তিসেমিকন্ডাক্টর এবং নবীকরণযোগ্য শক্তি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় লিথিয়ামকোবাল্টনিকেল-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জোগান নিশ্চিত করতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া যৌথ ভাবে কাজ করবে। মোদি জানান, ‘অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিয়া পার্টনারশিপ অন সাইবারক্রিটিক্যাল টেকনোলজিস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইনস’ চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ক্রিটিক্যাল মিনারেলস করিডর’ গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ক্ষেত্রে সহযোগিতা আমাদের কৌশলগত নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্ন শক্তিতে রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলতে চলেছে। দুদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পগবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্ট-আপগুলির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তুলতে ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া ডিফেন্স ইনোভেশন করিডর’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিপ্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং গবেষণায় এ করিডর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যৌথ উপস্থিতি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতে ঘোষণা করা হয়েছে ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া মেরিটাইম সিকিউরিটি কলাবোরেশন রোডম্যাপ। জাহাজ নির্মাণজাহাজ মেরামতি  রক্ষণাবেক্ষণ ক্ষেত্রেও সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রসঙ্গে এদিন নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক শুধু দুই মহাসাগরের মিলনস্থল নয়। এটি ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মতো সমমনা গণতান্ত্রিক দেশগুলির অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।’ তাঁর মতেমুক্তউন্মুক্ত  নিয়মভিত্তিক ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তোলার লক্ষ্যেই দুই দেশ একযোগে কাজ করে চলেছে।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রশ্নেও অভিন্ন অবস্থানের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ কোনো একটি দেশের জন্য নয়সমগ্র মানবজাতির জন্যই গুরুতর চ্যালেঞ্জ। তাই এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই যৌথআমাদের সংকল্প অটুট আর সহযোগিতা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে।’ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান সংঘাত প্রসঙ্গেও দেশের অবস্থান স্পষ্ট করেন মোদি। পশ্চিম এশিয়ার নতুন করে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা প্রসঙ্গে  তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চলমান সংঘাতের সমাধান শুধুমাত্র সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই সম্ভব।’ শান্তিস্থিতিশীলতা, স্বাধীনতা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া একযোগে কাজ করবে বলেও জানান তিনি।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকা প্রস্তাবিত কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট’ বা সিইসিএ দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি নিয়েও আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ বৈঠকের পরে বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আজ যতটা গুরুত্বপূর্ণঅতীতে কখনো ছিল না।’ তাঁর মতেবাণিজ্যপ্রযুক্তিশক্তিনিরাপত্তা আর কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ধারাবাহিক ভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও সে গতি বজায় রাখতে উভয় দেশ বদ্ধপরিকর।

পর্যবেক্ষকদের মতেইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের আবহে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার নয়া চুক্তি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশমায়ানমার এবং চিনকে ঘিরে উদ্ভূত নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উদ্যোগ দিল্লির নজরে রয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের একাংশের অভিমত। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেজিং সফরের সময় চিন একটি নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। চায়না-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর’ (সিএমবিসি) নামে প্রস্তাবিত ই প্রকল্পের লক্ষ্য ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংকে মায়ানমারের মান্দালয়ইয়াঙ্গন এবং রাখাইন উপকূলের সঙ্গে যুক্ত করা। পরবর্তী পর্যায়ে সেই করিডরকে বাংলাদেশের কক্সবাজারচট্টগ্রাম এবং সম্ভাব্য ভাবে মংলা বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারণের ভাবনাও রয়েছে চিনের

বিশ্লেষকদের একাংশের মতেএই করিডর বাস্তবায়িত হলে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলে চিনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বেজিংয়ের দীর্ঘদিনের কৌশলগত লক্ষ্য— মলাক্কা প্রণালীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো— আংশিক ভাবে পূরণ হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। বর্তমানে চিনের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মলাক্কা প্রণালী হয়ে পরিচালিত হয়। ফলে বিকল্প স্থল ও সমুদ্রপথ গড়ে তোলাকে বেজিং বহু দিন ধরেই অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। মায়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরবাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর এবং বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তা শুধু বাণিজ্যিক নয়বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত গুরুত্বও অর্জন করতে পারে। বিশেষত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নিকটবর্তী সামুদ্রিক অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা মহলে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতাইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যৌথ নজরদারি বৃদ্ধিজাহাজ নির্মাণ ও মেরামত ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব এবং মুক্ত ও উন্মুক্ত নৌ-চলাচলের পক্ষে দুদেশের অবস্থানকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতেইন্দো-প্যাসিফিকে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার আবহে ভারত-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!